ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। দেশের জনস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা, নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা, ব্যক্তি ও পরিবারের সচেতনতা, রাষ্ট্র ও সিটি করপোরেশনগুলোর ভূমিকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটির দায়িত্ব, ভারতের কলকাতার উদাহরণ, হাসপাতালগুলোয় কভিডের মতো ডেঙ্গু ইউনিট, জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা ও অন্যান্য প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম
নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে বলে মনে করেন?
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করবে। তবে সরকার সবাইকে রাষ্ট্রের খরচে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবে এটা সংবিধানে বলা হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা যেন সহজলভ্য হয় সেটির ব্যবস্থা রাষ্ট্র করবে, যেন জনগণ সেখান থেকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে রাষ্ট্র কি স্বাস্থ্যসেবার জন্য দায়বদ্ধ নয়? বস্তুত স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি বিষয়, তা যদি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে অনেকে নিতে পারবে না। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা নেবে। যাদের নেই, তারা নিতে পারবে না। তাই পৃথিবীর প্রায় সব দেশে রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাংলাদেশেও সরকারিভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। তবে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্বাস্থ্য খাতে সরকার এ বছর ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে, এটা কিন্তু একেবারে কম টাকা নয়। আমরা বলছি যে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ এ টাকার তিন গুণ বাড়ানো দরকার। সেটি ঠিক আছে, কিন্তু বর্তমানে বরাদ্দকৃত অর্থও কম নয়। এটি যদি ঠিকভাবে খরচ করা হতো, তাহলে জনগণ এখনকার চেয়ে কমপক্ষে তিন গুণ সুবিধা পেত। তাহলে যে সিস্টেম রয়েছে সেটি ঠিকমতো কার্যকর করা প্রয়োজন। এখন ডেঙ্গুর মৌসুম চলছে, ২০১৯ সালে বড় আউটব্রেকের পর প্রতি বছরই ডেঙ্গু আক্রমণ করেছে, সে ধারাবাহিকতায় এ বছর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহামারী আকার ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে দুটো প্রসঙ্গ আসে। প্রথমত, ডেঙ্গুর নিয়ন্ত্রণ ও দ্বিতীয়ত, রোগ হয়ে গেলে তার ব্যবস্থাপনা। এখন নিয়ন্ত্রণের জায়গায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়নি। ২০০০ সালের আগে থেকে আমাদের এখানে ডেঙ্গুর বিস্তার হয়েছে। এটি তাহলে আমাদের দেশে কমপক্ষে তিন দশকের পুরনো রোগ। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু আমাদের দায়িত্বশীলরা এটি প্রতিরোধে ঠিকমতো ভূমিকা রাখতে পারেননি। এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল কারা? এখানে ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি, সিটি করপোরেশন ও রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে। এদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কেউ যদি গাফিলতি করে, তাহলে এটি নির্মূল করা সম্ভব না। আসলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের কোনো রোডম্যাপ নেই। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কাজ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকে ভাইরোলজিস্ট, এন্টোমলজিস্ট ও পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞের সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে এবং সে অনুযায়ী সারা বছর ধরে কাজ করতে হবে। না হলে অর্থ খরচ হবে, কিন্তু কাজ হবে না।
স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলুন।
আগে যেমনটা বলা হয়েছে, রাষ্ট্র যদি চিকিৎসাসেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিত, তাহলে সবাই স্বাস্থ্যসেবা পেত না। এজন্য রাষ্ট্রের এখানে হস্তক্ষেপ দরকার আছে। রাষ্ট্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হলে তা একটি কাঠামোর মধ্যে দাঁড়ায়। তাই সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের চেষ্টা করে। এর বাইরে বেসরকারি খাত রয়েছে। অনেক দেশে আমাদের মতো এত বড় আকারে বেসরকারি খাত নেই। যুক্তরাজ্যে এতদিন ছিল না, এখন সেখানে কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত গড়ে উঠছে। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় স্বাস্থ্যসেবার পুরোটাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যসেবার মান ভালো। আবার যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবার পুরোটাই বেসরকারি খাতে, রাষ্ট্রের সেখানে ভূমিকা কম। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোকে সবচেয়ে বাজে সাব্যস্ত করা হয়, এটা কোনো ভালো কাঠামো নয়। যুক্তরাষ্ট্র নাগরিকপ্রতি স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় ১৩ হাজার ডলার ব্যয় করে। আর আমাদের মাথাপিছু আয়ই হচ্ছে ৩ হাজার ডলারের কাছাকাছি। তার মানে, আমাদের মাথাপিছু আয়ের প্রায় তিন গুণ তারা একজন নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবার পেছনে ব্যয় করে। কিন্তু এ স্বাস্থ্যসেবায়ও তারা সন্তুষ্ট নয় এবং সবাই স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। আর আমরা স্বাস্থ্যের পেছনে মাথাপিছু মাত্র ৫৪ ডলার ব্যয় করি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আমাদের মাথাপিছু ৮৮ ডলার খরচ করা উচিত।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতিতে পাঁচ ধরনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছিলেন।
ডেঙ্গু আমাদের এখানে আছে, যদি আমরা সুচিন্তিত রোডম্যাপের আলোকে কাজ না করি, ডেঙ্গু থেকে যাবে। এটি এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে তিন মাস পর ডেঙ্গু চলে যাবে আর পাঁচ কিংবা দশ বছর পর আসবে এমনটি নয়। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এটি প্রায় প্রতি বছরই থাকবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা দেখা দিলে সব পক্ষই দায়বদ্ধ। আমরা পলিথিনের মোড়কে খাবার খাচ্ছি, প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার করছি, এসব রাস্তাঘাটে যেকোনো জায়গায় না ফেলে বিনে ফেলা উচিত। পরিবার ও কমিউনিটি পরিমণ্ডলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা দরকার। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা তো আমাদের বাড়ির ভেতর ঢুকতে পারবেন না। তারা রাস্তাঘাট, কমন প্লেস এসব পরিষ্কার করবেন। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতে শিক্ষার্থীদের কাজে লাগানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েরও উদ্যোগ প্রয়োজন। পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো একটি থানায় গেলে দেখা যাবে, ২০-৩০ বছরের পুরনো গাড়ি পড়ে আছে। গাড়ির ভেতর পানি জমছে, সেখানে এডিস মশার লার্ভা থাকতে পারে। সরকারি-বেসরকারি বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কনস্ট্রাকশন সাইটে পানি জমছে, সেখানে এডিস মশা জন্মাতে পারে। এগুলো তো কমিউনিটির লোকজন দেখতে পারবেন না, এগুলো সরকার দেখবে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সর্বমহল যদি এগিয়ে না আসে, তাহলে কিন্তু সম্ভব নয়। সবার এগিয়ে আসার বিষয়টি সরকার ও সিটি করপোরেশন সমন্বয় করবে। কিন্তু এটি করা যাচ্ছে না কেন? কারণ আমাদের সেই মানসিকতা নেই যে এ কাজগুলো করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার কথা বললাম, তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। তবে কেন? ডেঙ্গুতে তো প্রশাসনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ব্যাংকার, শিক্ষক সবাই মারা যাচ্ছেন। এ সমস্যা তো সবার, সেহেতু সবার এগিয়ে আসা দরকার।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতার উদাহরণ দেয়া হয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে। আমাদের দেশে এটি কেন সম্ভব হলো না?
কলকাতা বা সিঙ্গাপুর পরিকল্পিতভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করেছে। এটি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা তাদের ছিল। আমাদের কি আদৌ সে রকম পরিকল্পনা রয়েছে? ডেঙ্গুর মৌসুম এল—আমরা তখন মিটিং করলাম। কিন্তু এই মিটিংয়ের ফলাফল কী? এ বছর যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি, তা মোকাবেলায় আমাকে তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা আমি করলাম। কিন্তু দুই মাস পর প্রাকৃতিক কারণেই ডেঙ্গু থাকবে না। এখন অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরে যদি আত্মতৃপ্তি জন্মে যে ডেঙ্গু নেই। আবার আসবে মে মাসের শেষের দিকে বা জুনে, তখন দেখা যাবে। তখন যিনি ক্ষমতায় থাকবেন বা ওই পদে কিংবা দায়িত্বে থাকবেন তিনি সেটা করবেন। তাহলে তো হলো না। নিশ্চয়ই ভারত বা সিঙ্গাপুর সেটা করছে না। তারা আমাদের থেকে ব্যতিক্রম। তারা মানসিকভাবেই প্রস্তুত যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করবে। এ মানসিকতা থেকেই তারা একটা পলিসি করেছে। এবং সে পলিসিটা সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করেছে। ফলে তাদের ওখানে ডেঙ্গু নেই। আর আমাদের এখানে এ সবগুলোরই অভাব আছে। আমাদের হয়তো পলিসি তৈরি করা হয়, কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন হয় না। তবে ডেঙ্গু নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পলিসি তৈরি করা হয়েছে সেটা দেখতে পাই না। ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য একটা গাইডলাইন তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেটাকে বেজ ধরে একটা ন্যাশনাল গাইডলাইন তৈরি করা যেতে পারে।
দেশের হাসপাতালগুলোয় কেন করোনার মতো ডেঙ্গু ইউনিট চালু করা গেল না?
হাসপাতাল হচ্ছে মোটর গ্যারেজের মতো। মোটর গ্যারেজে আমরা কখন গাড়ি পাঠাই? যখন গাড়িটা অ্যাকসিডেন্ট করেছে বা গাড়িটা বিকল হয়ে গেছে, অর্থাৎ যখন এটাকে সার্ভিসিং করাতে হবে। হাসপাতালও তাই। হাসপাতাল তো কোনো বিনোদন কেন্দ্র নয়। হাসপাতালে আমরা যাই যখন শরীরে কোনো সমস্যা দেখা দেয়। আমরা স্বাস্থ্য রিকভারির জন্য হাসপাতালে যাই। তাহলে স্বাস্থ্য গঠন হয় কোথায়? স্বাস্থ্য গঠন হয় হাসপাতালের বাইরে। আমরা যেখানে বসবাস করছি সেখানে বড় সময় থাকি, ওয়ার্ক স্টেশনে বড় সময় থাকি, রাস্তাঘাটে থাকি, মার্কেটে থাকি। এই তো মানুষের ২৪ ঘণ্টা সময়ের ডিস্ট্রিবিউশন। তার মানে, আমরা যে পরিমণ্ডলে যখন থাকছি সেই জায়গাটা যদি স্বাস্থ্যকর হয় এবং আমি যদি স্বাস্থ্যকর আচরণ করতে পারি তাহলে আমার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। আমি আমার স্বাস্থ্য প্রডিউস করি। আমি যদি আনহেলদি খাবার খাই তাহলে অসুস্থ হব। আমি যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ না করি, অসুস্থ হব। অর্থাৎ খাবার ও পরিবেশের কারণে স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে। পরিবেশ, খাবার, লাইফস্টাইল সব ঠিক থাকার পরও নানা কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। তখন তা থেকে রিকভারির জন্য আমরা হাসপাতালে যাই। ডেঙ্গু তিন মাসের অসুখ। কিন্তু কভিড মহামারী ছিল দুই বছরব্যাপী। ফলে কভিডের জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ডেঙ্গুর জন্য তা নেয়া কঠিন। কারণ বাজেট হয়ে গেছে জুনে। তখন ডেঙ্গু এতটা ভয়াবহ হয়নি। ফলে হাসপাতালের বরাদ্দ না বাড়লে তাদের সক্ষমতা তো বাড়বে না। একদিকে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে অন্যদিকে হাসপাতালে স্বাভাবিক সময়ের মতোই অন্যান্য রোগীও আছে। বাজেটে কিছু থোক বরাদ্দ রাখা হয় জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যয় করার জন্য। তবে এখন ডেঙ্গুর যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে এ অপ্রতুল বরাদ্দ দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সরকারের রেগুলার যে ম্যাকানিজম সেই ম্যাকানিজমে যেভাবে অর্থ খরচ করতে হয়—সাপোজ, আপনি কিছু কেনাকাটা করবেন, সেটার জন্য একটা ব্যবস্থা আছে। সেটার জন্য আপনার টেন্ডার দিতে হবে। টেন্ডারে যারা অংশগ্রহণ করবে সেটাকে যাচাই-বাছাই করতে হবে। তার আগে সরকারি অনেক প্রসেস আছে। সেটার অনুমোদন নিতে হবে বিভিন্ন দপ্তরে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে তো জরুরিভাবে সামাল দেয়া যায় না। আমার জিনিসটা দরকার আজকেই, আজ আমার স্যালাইন কিনতে হবে। এখন যদি ওই প্রক্রিয়া মেনে চলি তাহলে তো ছয় মাস লেগে যাবে। তিন মাস পর তো ডেঙ্গুর মৌসুমই থাকবে না। তাই জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় একটা ফ্লেক্সিবল ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ধরুন, বড় জলোচ্ছ্বাস হলো। জলোচ্ছ্বাসের পর সম্পদ নষ্ট হলো। স্বাস্থ্য কেন্দ্র ভেঙে গেল, ওষুধ নেই, লোকজন আহত হয়েছে। এ রকম তো ঘটে। তখন স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য অর্থ লাগবে। জরুরি পরিস্থিতিতে হয়তো স্বাস্থ্য কেন্দ্র মেরামত করাও লাগবে। এখন টেন্ডার দিয়ে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই বছর লেগে গেলে মানুষ তো সার্ভিস পাবে না। যদি বড় একটা ভূমিকম্প হয়, ভূমিকম্প হলে কী শুধু বিল্ডিং বা ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্ত হবে? সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষ। কিছু মানুষ তাৎক্ষণিক মারা যাবে। কিছু মানুষের মাথা ভাঙবে, পা ভাঙবে, শরীর ভাঙবে, নানা ধরনের ক্ষতি হবে। তাদের যদি সরকারি সেবা দিতে হয়, তখন বাজেটের জন্য জুনের অপেক্ষা করতে হয়, তা কি সম্ভব? সম্ভব নয়। এর জন্য একটা ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রোগ্রাম থাকা অতিপ্রয়োজন।
এখন যেহেতু আমাদের স্বাস্থ্য খাতে পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কাজ চলছে যা ২০২৪ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। এ পরিকল্পনায় ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রোগ্রাম নামে একটা অপারেশন প্ল্যান তৈরি করা হোক।
ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে কেন জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা হচ্ছে না? জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করলে সরকারের দায়িত্ব কী হবে?
এখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে বিশ্বে একটি ভুল বার্তা যাবে যে বাংলাদেশ ডেঙ্গু মোকাবেলায় ব্যর্থ। বিদেশী নাগরিকরা আমাদের দেশে আসবেন না, আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। আমাদের দেশ থেকে বিদেশে যেতে ভিসা রেস্ট্রিকশন দেবে। আমরা তখনই জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করতে পারব, যখন জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে আমাদের লাভ হবে। এখানে শুধু ডেঙ্গু পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে হবে না, এর সঙ্গে আমাদের দেশের ইমেজ, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব দিকে খেয়াল রেখে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করতে হবে।
জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে আমরা যদি ক্ষতির সম্মুখীন হই, তাহলে তো জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে লাভ নেই। এক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করেও যদি ডেঙ্গু মোকাবেলায় কাজ করতে পারি তাহলে তো আর আমাদের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার প্রয়োজন নেই। কারণ জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা ব্যয়বহুল একটি বিষয়।
আমি যেটা বোঝাতে চাচ্ছি, জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে যদি আমরা লাভবান হতে পারতাম বা যদি বিদেশী সহানুভূতি পাওয়া যেত, তাহলে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার দিকে আমরা এগোতে পারতাম। ভূমিকম্প বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু ডেঙ্গুর জন্য জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করলে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হবে। সুতরাং আমাদের জটিলতার দিকে গিয়ে লাভ নেই। আমাদের এখনকার কাজ হচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি, সিটি করপোরেশন ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রয়াসে ডেঙ্গু মোকাবেলা করে এ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো।










