আমাদের জীবনের প্রতিটি কার্যক্রমই কোনো না কোনো পণ্য বা সেবার ওপর নির্ভরশীল। বয়স, রুচিবোধ, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক শ্রেণী, পেশাগত বৈশিষ্ট্য ছাড়াও নানা কারণে আমাদের কাছে বিভিন্ন পণ্য বা সেবার উপযোগিতা তৈরি হয়। সুতরাং আমরা একটি বিরাট পণ্যপ্রবাহের মধ্য দিয়ে চলেছি। আর এসব বিষয়কে একত্রে দেখলেই ‘ভোক্তা অধিকার’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। ভোক্তা অধিকার বিষয়টি বৈশ্বিক হলেও বাংলাদেশে এর চর্চা অল্প দিনের।

বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থায় ভোক্তা অধিকারবিরোধী অপকর্মগুলো আড়ালে হলেও বহুদিন ধরে চলে আসছে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—মূল্য নির্ধারণ করা থাকলেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বা সেবা বিক্রয় করা বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করা, ভেজালমিশ্রিত পণ্য বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করা, খাদ্যপণ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যহানিকর কোনো নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণ ঘটানো, পরিমাণ ও পরিমাপগত কারচুপি করা, মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্য বিক্রয় করা যা প্রাণঘাতী হতে পারে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পণ্য বা সেবার মূল্যমানের তালিকা প্রকাশ না করা ইত্যাদি। এসব অপচেষ্টা প্রতিহত করার জন্যই বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ প্রচলন করা হয়।

ভোক্তা অধিকার বিষয়ক আইনের প্রচলন এবং তার প্রয়োগ দৃশ্যমান হলেও বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় সেটির চর্চা বেশ অপ্রতুল। সুতরাং না বুঝে মানহীন পণ্য বা সেবা গ্রহণের ঝুঁকিতে থাকে অনেক মানুষ। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় যেমন থাকে না যথেষ্ট বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা, তেমন আছে ভোক্তা অধিকার নিয়ে সাধারণের মধ্যে সচেতনতার অভাব। অর্থাৎ ভোক্তা অধিকার বিষয়টি যে আমাদের দেশে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে তেমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না। অন্যদিকে আমাদের যাপিত জীবন যেহেতু বিভিন্ন সাধারণ এবং জরুরি পণ্য ও সেবার ওপর নির্ভর করে, কাজেই ভোক্তা অধিকার বিষয়টিকে বাজারসংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই আরো গুরুত্বসহকারে নেয়া উচিত, যাতে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ভোক্তা অধিকার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমান সময়ে এসে প্রচলিত বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন ‘অনলাইন’ বাজার ব্যবস্থার সঙ্গেও। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ই-কমার্স নিয়ে কাজ করছে এমন ব্যবসায়ের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। এফ-কমার্সের দিকে দেখলে দেখা যাবে, আনুমানিক তিন লাখ ফেসবুক পেজ থেকে খুচরা এবং পাইকারি ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বর্তমানে। এছাড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ডিজিটাল প্লাটফর্মে ভোক্তার সংখ্যা হবে সম্ভাব্য চার কোটির বেশি। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে ভোক্তা অধিকারের ধারণাটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, যার ফলে সরকার ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা, ২০২১ প্রণয়ন করেছে। অর্থাৎ, ডিজিটাল কমার্স কেন্দ্র করে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা যে আমাদের দেশে কিছুটা অগ্রগতি সাধন করেছে সেটি বলা যেতেই পারে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় জনবহুল। এখানকার বাজার ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বহুমুখী। প্রতিদিন এ প্রক্রিয়ায় যেমন যুক্ত হচ্ছে নতুন ভোক্তা তেমন যুক্ত হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ের ধারণা। কাজেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা সচল রাখা এবং ভোক্তা অধিকারের মতো বিষয়কে একই সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে চাকরির বাজারে বড় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের উপায় হিসেবে অনেক মানুষ ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ ও যুবক। সুতরাং ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলা যেতে পারে, এ দেশের উদ্যোক্তারা একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মধ্যে অবস্থান করছে। অতএব যেসব উদ্যোক্তা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান তাদের অসদুপায় অবলম্বন করা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইঁদুর দৌড়ে নামতে হচ্ছে প্রতিদিন। তাতে করে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভীষণভাবে।

সামগ্রিকভাবে বলা যেতে পারে, ভোক্তা অধিকার এবং এ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার মুখোমুখি অবস্থান করছে। যেখানে ভোক্তা ও উদ্যোক্তা উভয় পক্ষেরই রয়েছে অধিকার, নৈতিকতা এবং সমৃদ্ধির প্রসঙ্গ। ভোক্তার অধিকার যেমন নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নিশ্চিত করাটা জরুরি তেমন নীতিমালা মেনে ব্যবসা পরিচালনা করা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করাটাও সমান জরুরি। একই সঙ্গে পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয়ে যারা সঠিক পন্থায় নীতিমালা অবলম্বন করেন না সেসব কথিত উদ্যোক্তার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষগুলোকে কঠোরতম অবস্থানে যাওয়াটাও সব পক্ষের জন্য প্রত্যাশিত।

একদিকে যেমন ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা দরকার অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে যেসব উদ্যোক্তা নতুন নতুন পণ্য বা সেবা উদ্ভাবন এবং বিপণনের চেষ্টা করে চলেছেন তাদের ব্যবসায়িক তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণপূর্বক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর রেয়াত করা, বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, বাণিজ্যিক স্থানগুলোয় বিশেষ সুবিধা দেয়া, লাইসেন্স অনুমোদন এবং নবায়ন সহজতর করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি একটি সাম্যাবস্থানে রাখা সম্ভব হবে।

ভোক্তা অধিকারকে দেশের প্রচলিত আইন ও নীতিমালা দিয়ে সুরক্ষা দেয়ার বিষয়টিকে যেমন সাধুবাদ জানাতে হবে তেমনিভাবে একজন ভোক্তাকেও তার অধিকার নিয়ে সচেতন হয়ে উঠতে হবে। চাহিদার জায়গাটি বিবেচনায় রেখে একজন ভোক্তার পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে, যাতে সে উপলব্ধি করতে পারে কোন পণ্য বা সেবাটি তার জন্য আসলেই প্রযোজ্য। সেক্ষেত্রে যেকোনো প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপনের ক্ষত্রেও একজন সচেতন ভোক্তার নিপুণ বিবেচনা প্রত্যাশিত। অন্যদিকে একজন আদর্শ উদ্যোক্তাকেও বিজ্ঞাপন প্রচার, পণ্য ও সেবাসংক্রান্ত তথ্য প্রদানে শঠতা পরিহার করে বাজারে অবস্থান করে নিতে হবে।

বাংলাদেশ যেহেতু একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, সেহেতু এখানে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার প্রচুর ভোক্তা রয়েছে। কাজেই ভোক্তা অধিকারকে এখানে সামান্যতম খর্ব করার সুযোগ নেই। তথাপি এখানে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, যার অন্যতম গুরুতর দিকটি হচ্ছে বেকারত্ব। সংগত কারণেই আমাদের দেশে আত্মকর্মসংস্থানে ব্যবসাকে বেছে নেয়াটা একটি বহুল প্রচলিত উপায়। অতএব এখানে ভোক্তা ও উদ্যোক্তা উভয় পক্ষই একটি সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে যান এবং যার ব্যত্যয় কখনই ঘটবে না।

সুস্থ জীবন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আমাদের সবার কাম্য, যা আমাদের জাতি হিসেবে এক ধাপ এগিয়ে দেবে যেকোনো ক্ষেত্রে। কাজেই বাজার ব্যবস্থায় সব পক্ষেরই উচিত একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠা। বাজারে অবস্থান করা বিভিন্ন পক্ষগুলোর মধ্যে এ সমন্বয় সাধন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। কাজেই এখানে সমস্যা যেমন তৈরি হবে তেমন সমাধানের পথে আমাদের সবাকেই এগিয়ে আসতে হবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং সুষম অর্থনীতির ধারাকে বজায় রাখতে আইন প্রণয়নকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ নানাভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিচ্ছে এবং তাতে অনেকেই উপকৃত হচ্ছে। তবে বাজার ব্যবস্থা যেহেতু একটি চলমান বিষয় কাজেই এ-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে গুরুত্ব দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিকারের দিকটিতে গুরুত্ব দেয়াটাও এখন সমান জরুরি হয়ে পড়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাকে টেকসই করতে বিস্তর সচেতনতা যেমন তৈরি করা যেতে পারে তেমন এ-বিষয়ক সমস্যাগুলোর প্রতিকারে প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানেও জোর দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো স্তরেই ভোক্তা অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা নেই। উচ্চ শিক্ষায় বিশেষায়িত কিছু বিষয়, যেমন ব্যবসায় প্রশাসন, আইন ও প্রযুক্তিগত বিদ্যায় কিছুটা অধ্যয়ন করানো হলেও তা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী যথেষ্ট না। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব স্তরের কারিকুলামে ভোক্তা অধিকার এবং ব্যবসায় উদ্যোগের নৈতিক বিষয়াবলিকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিকারের পথ মসৃণ হবে। ভোক্তা অধিকার এবং ব্যবসায়িক নৈতিকতা সাধারণ শিক্ষার অংশ হলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা একটি সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনধারার পথে এগিয়ে যাব, যা জাতিগতভাবে আমাদের উৎকর্ষ সাধন করবে।

 

মোফরাদ হোসেন: প্রভাষক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ

রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া