দেশে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। দেশে চিকিৎসার পরিসর বা অবকাঠামো বাড়লেও চিকিৎসাসেবার মান বাড়েনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন খাতে সাফল্য অর্জিত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা তৈরি করতে পারেনি সরকার। এ কারণে বিত্তবানরা চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন বিদেশে। দরিদ্র শ্রেণী বাধ্য হয়ে দেশে চিকিৎসা নিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। 

বাংলাদেশ ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হবে। উন্নত দেশে পরিণত হতে হলে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। দেশের স্বাস্থ্য খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ও টেকসই স্বাস্থ্য খাত গঠনে অ্যাক্রেডিটেশনের আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপের বিকল্প নেই।

অ্যাক্রেডিটেশনের মূল লক্ষ্য চিকিৎসাসেবার সব মান নিশ্চিত করা। প্রতিটি পরীক্ষা, রোগীর সুরক্ষা, হাসপাতাল বা রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের অবকাঠামো, জনবলের দক্ষতা থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয় নিখুঁতভাবে দেখা হয়। দেশের হাসপাতালগুলোর মানোন্নয়নে অ্যাক্রেডিটেশন বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। এর মাধ্যমে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার গুণগত মান উন্নয়নে ঘটবে। ফলে রোগীর মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। তা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসে ও স্বাস্থ্যবীমা গঠনেও সহায়তা করবে।

গতকালের বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, স্বাস্থ্যসেবার জন্য অ্যাক্রেডিটেশন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানই এর জন্য আগ্রহী হয় না। কেননা এতে অনেক খরচ করতে হয়। অ্যাক্রেডিটেশন না থাকলে বিদেশী রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিতে আগ্রহী হন না। কেননা চিকিৎসার পর বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর কাগজপত্র তাদের দেশের স্বাস্থ্যবীমা প্রতিষ্ঠানগুলো আমলে নিতে চায় না। এতে তাদের বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়।

দেশে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রায় ১০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অ্যাক্রেডিটেশন রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু দেশে সরকারির তুলনায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বড়। সারা দেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬৪০ (ইউনিয়ন পর্যায় বাদে)। আর অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে ৫ হাজার ৩০টি, রোগ নির্ণয় কেন্দ্র বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১০ হাজারের বেশি এবং ব্লাড ব্যাংক ১৯২টি। দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল বিবেচনায় অ্যাক্রেডিটেশনের সংখ্যা খুবই নগণ্য। দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা ও আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নে অ্যাক্রেডিটেশনের প্রয়োজন।

দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। দেশের কিছু হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার ব্যয়ও অত্যধিক। এ কারণে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ চিকিৎসা নিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিদেশে যাচ্ছে। দেশের বাইরে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। যা স্বাস্থ্য অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য এ বিদেশনির্ভরতা নিঃসন্দেহে দেশ ও জনগণের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এসবই দেশের জনগণ, দেশের স্বাস্থ্য অর্থনীতি তথা সামগ্রিক অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার জন্যও ক্ষতিকর।

চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা মানুষের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। শারীরিক অসুস্থতা যেমন মানসিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করে, তেমনি মানসিক অসুস্থতাও শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ দুটির যেকোনো একটির অসুস্থতায় মানুষের উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। যার প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং সুস্থতা নিশ্চিত হলে জাতীয়ভাবে শ্রমঘণ্টা বৃদ্ধি পায়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবে এর সুফল প্রতিফলিত হয়।

বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ কভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচি, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, কালাজ্বর নির্মূলসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে পোলিও ও ধনুষ্টংকারমুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যু, নবজাতকের মৃত্যুহার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পেরও উন্নয়ন ঘটেছে। নিজ দেশের ওষুধ শিল্পের চাহিদা মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৫২টি দেশে ওষুধ রফতানি করছে।

তার পরও সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান করতে পারছে না। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও রয়েছে নানা অনিয়ম। যথাযথ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে বেসরকারি খাত থেকে উচ্চমূল্য প্রদান করেও দেশের জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হতে হচ্ছে প্রতারিত। ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খাতে সরকারের বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। বরাদ্দ দেয়া অর্থও অদক্ষতার কারণে খরচ করতে পারে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা পেতে হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে। দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে। সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা করাতে গিয়ে বহু মানুষ আবার দরিদ্র হয়ে পড়ার কারণে। স্বাস্থ্য খাতের ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। এ খাতের পদ্ধতিগত ও ব্যবস্থাপনাজনিত উন্নয়ন দরকার। তারা বলছেন, উন্নয়নের হাতিয়ার হতে পারে স্বাস্থ্য—এ চিন্তা বা দর্শন কোথাও দেখা যায় না। স্বাস্থ্যকে বাণিজ্যমুখী করে ফেলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলেও মনে করেন তারা। 

বর্তমানে চিকিৎসা পর্যটন, বীমা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতার মতো বিভিন্ন বাজার শক্তিশালী হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবার মানের চাহিদাও বেড়েছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান নিশ্চয়তার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অ্যাক্রেডিটেশন নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এটি অন্যতম উপকরণ, যা সেবার মান নিশ্চিতেও কাজ করবে বলে আশা করা যায়। 

দেশে স্বাস্থ্য খাতে অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উভয় স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে অ্যাক্রেডিটেশনের আইনে বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।