গোলমেলে দশায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে নিরীক্ষার অন্ত নেই। শিশুশিক্ষাকে স্মার্ট বানাতে ক’দিন পরপর এনসিটিবির নেতৃত্বে নতুন নতুন প্রকল্প গৃহীত হয়। নতুন করে অর্থ বরাদ্দ হয়। নতুন মুখের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়। আনকোড়া পুস্তক রচয়িতা তৈরি হয়। পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নতুন নতুন ফর্মুলা আরোপ করা হয়। নানা উন্নত দেশের শিক্ষা কারিকুলাম ও পদ্ধতির প্রতিফলন ঘটানোর প্রাণান্ত চেষ্টা চলে। নতুন পদ্ধতির কারিকুলাম সিলেবাসে লেখা বই চাপিয়ে দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের ওপর। কিছুদিন না যেতেই বিরূপ ফল ফলতে থাকে। দেশজুড়ে শুরু হয় অস্বস্তি। অভিভাবকদের প্রতিবাদ করতে হয় পথে নেমে। শিক্ষকরা গলদ্ঘর্ম হয়ে দারুণ অস্বস্তিতে ভোগেন। এক সময় পিছু হটতে হয় মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির। আবার ভাবতে থাকেন নতুন প্রকল্প নিয়ে।

এমন বাস্তবতায় আমাদের দেশের শিক্ষানীতি যদি উন্নত বিশ্বের কারিকুলামের অনুকরণে চলতে চায় তবে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে বেশি। কারণ দুই অঞ্চলের বাস্তবতা আলাদা। আমাদের দেশের সার্বিক উন্নয়নে মেধাবী জনশক্তির কর্মভূমিকা প্রয়োজন। ফলে জ্ঞানচর্চাকে উপেক্ষা করে বাজার অর্থনীতির চাহিদা পূরণের উপযোগী জনশক্তি উৎপাদন করলে উপরিকাঠামোর চাহিদা পূরণ হয়তো সম্ভব হবে কিন্তু ভিত্তিভূমি নড়বড়ে থেকে যাবে, যা কাম্য ভবিষ্যৎ নির্মাণ কঠিন করে তুলবে।

স্কুলশিক্ষা যেদিন অবজেক্টিভ প্রশ্ন আর বৃত্ত ভরাটে আটকে গিয়েছিল তখন থেকে জ্ঞানচর্চার জায়গাটি উপেক্ষিত হতে থাকে। চূড়ান্ত সংকট তৈরি হয় জিপিএ ৫ ইত্যাদির প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর। এ সংকটকে আরো শক্তিশালী করে ফেলল উচ্চাভিলাষী সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির ভেতরে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করানোর পর থেকে। এসব নিরীক্ষার বাইপ্রডাক্ট হিসেবে বাড়বাড়ন্ত হলো কোচিং বাণিজ্য আর গাইড ব্যবসা। শিক্ষার্থী আটকে গেল কোচিংয়ের পরীক্ষা প্রস্তুতিতে। মুখস্থ করতে থাকল গাইড বই। 

সিলেবাস আর লেখককে নতুনত্ব এনে নিম্ন মাধ্যমিকের বই শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিয়ে মহাগোলযোগের সৃষ্টি করা হয়েছিল। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বোধে আঘাত লাগে এসব বইয়ের বক্তব্য ও বিন্যাসে। আবারো পিছু হটতে হয় এনসিটিবিকে। সরকারি অর্থের অপচয় ঘটিয়ে উঠিয়ে নিতে হয় কোনো কোনো বই বা অনেক অধ্যায়। অধুনা চেষ্টা করা হলো পরীক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কার করা। চিন্তাটি প্রথম বিচারে স্মার্টই মনে হয়েছে। তবে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে এ পদ্ধতিতে উন্নত বিশ্বের আদলে যে ধরনের শিক্ষা উপকরণ প্রয়োজন তার জোগান দেয়া এ দেশের একটি অংশের অভিভাবকদের সাধ্যে কুলোবে না। 

উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সাধারণ নাগরিকের পড়াশোনার ধারা জীবন-জীবিকার প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে। তবে জ্ঞানচর্চার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। পাঠক্রমগুলো এ রকম যে নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষাক্রম শেষ হয়। পাঠক্রমের বিন্যাস এমন যে, অনেক কিছু সাধারণভাবে জানার অবকাশ থাকে তবে সীমিত সময়ে গভীরভাবে চর্চার সুযোগ থাকে না। এসব দেশে সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়তে আসে না। ইন্টারমিডিয়েট সমপর্যায় পর্যন্ত পড়ার পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ঠিক হয়ে যায় মেধা অনুযায়ী কে কোন ট্রেডকোর্স বা ডিপ্লোমা সম্পাদন করবে। ভবিষ্যতে যারা নানা গবেষণায় যুক্ত থাকবে তারাই চিন্তা করে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। উন্নত দেশ হওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী তারা। তাই নিজ দেশের মেধাবীদের পাশাপাশি নানা দেশের মেধাবীদের জায়গা করে দেয়।  অথবা বলা যায় আত্মীকরণ করে নেয়। তাই নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে এসব মেধা প্রয়োগ করে। 

গত শতকের সত্তর ও আশির দশকেও এ দেশে পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ার প্রবণতা ছিল। বিকালে-সন্ধ্যায় স্কুল-কলেজে পড়া ছেলেমেয়েরা লাইব্রেরিতে এসে পড়াশুনা করত। বই ধার নিত। বন্ধুদের মধ্যে পড়ার একটি প্রতিযোগিতা ছিল। এখনকার প্রজন্মের কাছে এসব অচেনা হয়ে গেছে। ভালো গ্রেড পাওয়ার জন্য শুধু শিক্ষার্থী নয় অভিভাবকরাও ছুটেছেন কোচিং সেন্টারগুলোয়। এভাবে শিশু শিক্ষার্থী পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, আর প্রশ্নব্যাংক তৈরিতে পুরো দিনমান কাটাতে থাকে আর হারিয়ে ফেলে শৈশব—আত্মবিকাশের নানা সোনালি পথ। সুকুমার রায় পড়া হয় না। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন অচেনা থেকে যান। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানার কৌতূহল তৈরি হয় না। এমন এক কিশোর শিক্ষার্থীকে মননশীল বই পড়ায় ফিরিয়ে আনা কঠিন। এ ধারায় বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও পরীক্ষার প্রস্তুতিটাকেই জানল একান্ত আরাধ্য। শিক্ষার্থী হওয়ার পথ বন্ধ করে ওদের নিবিষ্ট পরীক্ষার্থী বানিয়ে ফেললাম। আমি কাছে থেকে দেখেছি, এ ভুল শিক্ষানীতির কাঠামোতে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েরা যখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন তখন এদের অনেকেরই জ্ঞানচর্চার জায়গাটি সংকীর্ণ থাকে, যা স্বস্তি এবং অস্বস্তিতে ফেলে শিক্ষার্থীদের। স্বস্তি খুঁজে পায় সেই শিক্ষার্থীরা যারা স্বল্প পুঁজিতে পরীক্ষার নদী পাড়ি দেয়ায় সরল পথ পেয়ে যায় শিক্ষকের কাছ থেকে। আর অস্বস্তিতে পড়ে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী, যারা কিছু জানার আগ্রহে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে পা রেখেছিল। 

দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সভ্যতা না জানলে দেশপ্রেম জন্ম নেয় না। এতদিন দেশের প্রতি মমত্ববোধহীন দোআঁশলা ছিল ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েরা। সঠিক জ্ঞানচর্চার অভাবে এখন সাধারণ ধারার ছেলেমেয়েদের অধিকাংশের দশা একই রকম হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি বড় রকমের স্বার্থপরতা নিজেদের অজান্তেই মনে জায়গা করে নিচ্ছে। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে চলমান সিলেবাসে ইতিহাস ও ঐতিহ্য পাঠ দারুণভাবে সংক্ষিপ্ত করে ফেলা হয়েছে।

আমার মনে হয়, অবারিত জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বড় হলে আত্মকেন্দ্রিকতা ও দেশাত্মবোধহীন সংকীর্ণতা জায়গা করে নিতে পারত না। আমি খুব আশঙ্কার সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠপদ্ধতি নিরীক্ষা করছি। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণেচ্ছু বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উচ্চমানসম্পন্ন কথিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন পদ্ধতি এবং শিক্ষা কার্যক্রম জাতীয় স্বার্থে খুব একটা কাজে লাগার কথা নয়। মাল্টিন্যাশনাল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কিছুটা কাজে লাগতে পারে। আর ক্রেডিট ট্রান্সফার করে বিদেশে চলে যাওয়ার পথ সুগম হতে পারে। কারণ তিন মাস বা ছয় মাসের সেমিস্টারে কয়েকটি কোর্স ও সংশ্লিষ্ট নানা পরীক্ষা সামাল দিতে গিয়ে হ্যান্ডআউট বা নির্ধারিত কয়েকটি স্লাইড মুখস্থ করা ছাড়া জ্ঞানচর্চার কার্যত আর কোনো সুযোগ বা সময় থাকে না। 

আমার সব সময় মনে হয় সূচনাটি ভালো হচ্ছে না বলে উপসংহারে এসেও হতাশ হতে হচ্ছে। সার্টিফিকেট পেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতিক্রম করা আর জ্ঞানচর্চায় আলোকিত হওয়া এক কথা নয়। আমাদের দেশের শিক্ষানীতি যারা প্রণয়ন করেন এবং শিক্ষা কার্যক্রম যারা পরিচালনা করেন তাদের কাছে বিনীত প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, তারা বাংলাদেশের মতো একটি দেশ—যে দেশ উন্নয়নশীল অতঃপর উন্নত দেশে পৌঁছার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে, সে দেশের শিক্ষা পরিচালনার বিদেশী মডেল না নিজ দেশের বাস্তবতা মেনে শিক্ষাক্রম তৈরি করা উচিত? আমলাতন্ত্রের বিবেচনায় বন্দি না রেখে জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত মেধাবী প্রজন্মকে বেড়ে ওঠার পথ তৈরি করে দেয়া উচিত। বড় বড় রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে শিক্ষা উন্নয়ন সম্ভব নয়। নানা পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে যারা যুক্ত, নিবেদিত তাদেরই যুক্ত করতে হবে নীতি প্রণয়ন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায়, যা প্রায়ই এ দেশে হয়ে ওঠে না। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক বিবেচনা সক্রিয় থাকায় যোগ্য মানুষদের আলোতেই আনা হয় না। লাগসই জ্ঞান অর্জনে যেখানে শিক্ষা-গবেষণায় যুক্ত মেধাবী মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়া উচিত, সেখানে আমলাতন্ত্রের কর্মকর্তারাই শিক্ষা উন্নয়নের জন্য বিদেশ ভ্রমণ করেন বেশি। যে জ্ঞান প্রয়োগিক ক্ষেত্রে যুক্ত করার সুযোগ থাকে না। বরং চেয়ারের ক্ষমতা বেশি থাকলে নব্য বিশেষজ্ঞ হয়ে এমন সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন যা দেখে শিক্ষা গবেষকরা চমকে ওঠেন। 

এমন বাস্তব অবস্থার মধ্য দিয়ে এ দেশে তৈরি হয় শিক্ষানীতির আরক। ফলাফলের বিস্ফোরণে আনন্দে উদ্বেল থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্বাক্ষরতার হার কত ভাগ বাড়ল তা বলে সরকারের উচ্চতম পর্যায় থেকে স্বস্তি প্রকাশ করা হয়। আর এসব ভ্রান্তির বিষাক্ত নির্যাস থেকে জ্ঞানচর্চা বিচ্ছিন্ন প্রজন্ম তৈরি হতে থাকে। এদের হাতে দেশের সার্বিক উন্নতি গতি পেতে পারে না। একটি বড় বিভ্রান্তি কাজ করছে দেশের ক্ষমতাবানদের মধ্যে। আমরা বৈজ্ঞানিক উন্নতি ঘটিয়ে বা বিজ্ঞান ও বাণিজ্যচর্চা বাড়িয়ে দেশকে উন্নত দেশের দিকে নিয়ে যেতে চাই। সাধারণ দৃষ্টিতে তা মহৎ চাওয়া। কিন্তু এ কথা সবাই মানবেন, সাধারণ ও মানবিক জ্ঞান অর্জন ছাড়া কোনো জ্ঞানের ভিত্তিই শক্ত কাঠামোতে দাঁড়াতে পারে না। এখনো যদি দেশের নীতিনির্ধারক  এসব বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারেন তবে উন্নয়নশীল দেশের পথযাত্রা কাঙ্ক্ষিত গতি পাবে কেমন করে!

ড. একেএম শাহনাওয়াজ: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়