বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বরে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অক্টোবরে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত মাসে তা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশে। তিন বছর ধরে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে দেশের মানুষ। সব ধরনের পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক চাপ আরো বেড়েছে। যদিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত দুই অর্থবছর সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমাতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদহারও সর্বোচ্চ ৯ থেকে বেড়ে এখন ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেশ কয়েকটি পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার কিংবা কমানো হয়েছে। ভোক্তা অধিকার দিয়ে বাজারে নিয়মিত অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগে বাজারে তেমন প্রভাব পড়ছে না। বাজার ব্যবস্থাপনার অন্য সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত না করে শুধু গুটিকয়েক উদ্যোগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দরকার সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা। আর সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করতে সরকারকে সব পণ্যের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। উৎপাদন ও আমদানি বাড়িয়ে বাজারে পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে সরকারের কোনো লক্ষণীয় পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অন্যথায় বাজার ব্যবস্থায় সরকারের সাফল্য অধরাই থেকে যাবে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর সবার প্রত্যাশা ছিল ভোগ্যপণ্যের দাম কমবে। বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। সিন্ডিকেট ভাঙবে। যদিও জনগণের সে প্রত্যাশা পূরণের কোনো লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের স্বীকৃত চাঁদাবাজরা পালিয়ে গেছে। কিন্তু নতুন চাঁদাবাজের জন্ম হয়েছে। বাজার সিন্ডিকেট এখনো ভাঙেনি। সরকার এক্ষেত্রে কঠোর হতে পারেনি। যার কারণে পণ্যের দাম এখনো না কমে বরং বাড়ছে। সরকার এ ব্যাপারে কঠোর না হলে রোজার মাস কেন্দ্র করে পণ্যবাজার আরো বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। এতে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়বে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন দুই দেশেই নিয়ন্ত্রণে। দুই বছর আগে অর্থনৈতিকভাবে নজিরবিহীন দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি ছিল শ্রীলংকা। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতির হার ঠেকেছিল প্রায় ৭০ শতাংশে। ডলার সংকটের কারণে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করা দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ঋণাত্মক পর্যায়ে আছে তিন মাস ধরে। গত সেপ্টেম্বরের পর থেকে এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নয়, মূল্যসংকোচনের ধারায় রয়েছে দেশটি। অর্থাৎ শ্রীলংকার বাজারে পণ্যের দাম না বেড়ে উল্টো কমছে। সর্বশেষ নভেম্বরে এসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ১০ শতাংশ। এদিকে কয়েক বছর ধরে চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা না ফিরলেও চলতি বছরে এসে অর্থনৈতিকভাবে বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশটি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় সাফল্যের দেখা পেয়েছে পাকিস্তানও। নভেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা সাড়ে ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের এপ্রিলে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশও।
বাংলাদেশের বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশে পণ্য আমদানিতে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানিকে নিবন্ধন দিয়েছিল। ফলে গুটিকয়েক ব্যক্তি বা কোম্পানির হাতে পণ্য আমদানি জিম্মি হয়ে পড়েছিল। আমদানি বাজার তাদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো। বিগত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে কিছু কোম্পানি আমদানি থেকে বিরত থাকে। ফলে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্ট হয়। আমদানি ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে হলে ছোট-বড় সব ধরনের কোম্পানিকে আমদানি নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়িয়ে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আবার কোনো ধরনের প্রভাব ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই যেন ছোট-বড় সব আমদানিকারক পণ্য আমদানি ও বিপণন করতে পারে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়লে আমদানির পরিমাণ বাড়বে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। পণ্যের দাম কমলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে।
উৎপাদন ও মজুদের সঠিক পরিসংখ্যান সঠিক সময়ে প্রকাশের উদ্যোগ নিতে হবে। যেকোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অনেক। আমদানি ও উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে উদ্যোগ নিতে হবে। বাজার তদারকি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে আংশিকভাবে গৃহীত কোনো উদ্যোগই বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজে আসবে না। সমন্বিতভাবে বাজার ব্যবস্থাপনায় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। উৎপাদন ও আমদানি বাড়িয়ে সরকারি উদ্যোগ পণ্যের মজুদ বাড়াতে হবে। যখন পণ্যের সরকারি মজুদ কম থাকে তখন বাজারে অসাধু ব্যবসায়ী, দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী ও অবৈধ মজুদদাররা বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। বাজারে যখনই পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে তখনই সরকারি মজুদ থেকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (টিসিবি) সরকারি সংস্থার মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। আর যখন সরকারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকবে তখন কৃত্রিম মজুদকারীরাও পণ্য মজুদ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। এজন্য সরকারি মজুদ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সর্বোপরি পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদন ও আমদানি বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ কাজ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সম্মিলিতভাবে করতে হবে। সর্বোপরি বাজার ব্যবস্থাপনায় যেসব অনিয়ম ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।










