লিবিয়া থেকে ২ মে আটটি মরদেহের বাক্স ঢাকা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছে। বাক্সগুলো যখন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেছে, তখন স্বজনদের বিলাপ ঢাকা বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালের আশপাশ ভারী করে তুলেছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়েছে, ‘তিউনিসিয়ার উপকূলে নৌকাডুবিতে নিহত আট যুবকের মরদেহ ঢাকায়’। শিরোনাম দেখে মনে হবে, তারা যেন তিউনিসিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন! কিংবা ইউরোপে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। কিন্তু সংবাদের অন্দরমহলে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, বাক্সের ভেতরের যেসব মৃত মানুষ ফিরেছে তারা জীবনযুদ্ধের পুলসিরাত পার হতে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর পাশাখেলায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে। স্বপ্নের নিকটাত্মীয় হতে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে আত্মীয়তা করে মরদেহ হয়ে দেশে ফিরেছে। এ বাক্সের ভেতরের আটটি মরদেহ আমাদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমাদের দৃশ্যমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের তলায় পিষ্ট হওয়া অদৃশ্যমান ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, অবৈধ অভিবাসনের কারণ, ধরন ও প্রকৃতি এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ক্রমান্বয়ে মরদেহ হয়ে ফিরে আসার করুণ গল্প। তাই এ আট মরদেহ শুধু মরদেহের আটটি সংখ্যা নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের অগোচরীভূত করুণ বাস্তবতার একটি বিলাপমুখর ছাপচিত্র।
সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কিছু অভিবাসনপ্রত্যাশী ইউরোপের উদ্দেশে সমুদ্রপথে যাত্রা করেন এবং যাত্রাপথে নৌকাটি তিউনিসিয়ার উপকূলে ডুবে যায়। নৌকাটিতে চালকসহ মোট ৫২ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর ৪৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয় এবং নয়জন প্রাণ হারান। নয়জনের মধ্যে আটজনই বাংলাদেশী এবং তাদের মরদেহ লিবিয়া থেকে বিমানযোগে দেশে আনা হয়।’ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বরং বলা যায়, এটা একটি নিয়মিত ঘটনা। কেননা কিছুদিন পর পরই বিরতি দিয়ে আমরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মরদেহ হয়ে যাওয়ার খবর পাই এবং এ মরদেহের মিছিলে বাংলাদেশের মানুষও ক্রমবর্ধমান হারে শামিল হয়। সংবাদপত্রে এ-সংক্রান্ত খবর প্রকাশ ও প্রচার হয় কিন্তু আমাদের সবকিছু ‘গা-সওয়া’ হয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণ এসব সংবাদ তেমন কোনো সংবেদনশীলতা আমাদের মধ্যে তৈরি করে না। ফলে এসব মরদেহের খবর বাংলাদেশের পথেঘাটে, রাস্তা-ম্যানহোলে, ট্রেনে-বাসে কিংবা গরম বা ঠাণ্ডায় মরে মরদেহ হয়ে যাওয়ার নিত্য খবরের সঙ্গে গড়পড়তা মরদেহের পাশে শুয়ে থাকা ‘অন্য মরদেহ’ ছাড়া তেমন বিশেষ কোনো আবেগ, বেদনা ও সংবেদনশীলতা আমাদের মধ্যে তৈরি করে না। তাই এসব ঘটনাও খানিকটা ‘মামুলি’ ঘটনার মর্যাদা পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, ‘বিভিন্ন দেশের উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টাকালে শুধু গত বছরই তিন হাজারেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এ অঞ্চলের।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ কেন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমায়। খুবই সংক্ষেপে সংবাদপত্রের কলামের কলেবরে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। তবে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সমাজের বিদ্যমান আয়বৈষম্য, অর্থনৈতিক অসমতা, ক্রমবর্ধমান সামাজিক স্তরবিন্যাস, অসম ক্ষমতার সম্পর্ক এবং ইউরোপের উন্নত জীবনের হাতছানি প্রভৃতি কারণেই এ দেশের তরুণ-যুবকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে পাড়ি দেয়ার সংকল্প নিয়ে বেড়ে ওঠে। আর্থিক অক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং মামা-চাচা-দুলাভাইয়ের বৈধ/অবৈধ সহযোগিতার অভাবে সবার পক্ষে বৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দেয়া সম্ভব হয় না। ফলে অবৈধপথে, তুলনামূলক অল্প খরচে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব তরুণ-যুবক ইউরোপে পাড়ি জমায়। আমাদের অনেকেই জানি যে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে মানব পাচারের সহজতর পথ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে লিবিয়া। বিশেষ করে মানব পাচারকারীরা ইতালি যাওয়ার জন্য লিবিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। মোটাদাগে আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো থেকে মানব পাচারকারীরা বিভিন্নভাবে নানা বৈধ-অবৈধ পথে লিবিয়ায় লোক এনে জড়ো করে এবং তাদের নৌকাযোগে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। লিবিয়ার এসব আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মানব পাচারকারীরাও একটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে। তারা নানা বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের হাতে তুলে দেয়, যারা তাদের ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। তবে বিষয়টি একেবারেই এত সরল নয়। বিভিন্ন সময় জানা গেছে, লিবিয়ায় গিয়ে বেশির ভাগ লোককে জিম্মি করা হয়। জিম্মি করে তাদের পরিবারের কাছ থেকে দফায় দফায় অর্থ আদায় করা হয়। অর্থ আদায়ের পর নৌকাযোগে ইউরোপে পাড়ি দেয়ার ব্যবস্থা করে মানব পাচারকারীরা। নৌকায় পাড়ি দিতে গিয়ে কখনো কখনো ভূমধ্যসাগরে তারা নিখোঁজ হয় কিংবা নৌকা ডুবে মৃত্যুবরণ করেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২১ লাখ মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে এবং এর মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিবাসনপ্রত্যাশী ভূমধ্যসাগরেই ডুবে মারা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪ সালে অবৈধভাবে সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৪৫৫ মানুষ। তাদের মধ্যে মারা যায় ২ হাজার ৫৩৮ জন। ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ পাড়ি দেয় ১০ লাখ ৩২ হাজার ৪০৮ জন, মারা যায় ৩ হাজার ৭৭১ জন। ২০১৬ সালে পাড়ি দেয় ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫২ জন, মারা যায় ৫ হাজার ৯৬ জন। ২০১৭ সালে ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৩৯ জন পাড়ি দেয়, পথে মারা যায় ৩ হাজার ১৩৯ জন। ২০১৮ সালে পাড়ি দেয় ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৭২ জন, মারা যান ২ হাজার ২৭০ জন। ২০১৯ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৬৩ জন পাড়ি দেয়, মারা যায় ১ হাজার ৩৩৫ জন। অভিবাসন সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওএম) আরেক তথ্যে জানা যায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩ সালের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নয় বছরে ইউরোপে প্রবেশ করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫২ হাজার ৬৭ অভিবাসনপ্রত্যাশীর। এভাবে সাগরপথ পাড়ি দিতে গিয়ে এ সময়ে যে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হচ্ছে বাংলাদেশী তরুণ ও যুবক। এক পরিসংখ্যানে দেখায় যায়, ২০২১ সালে পাড়ি দিয়েছেন ১২ হাজার ৪৮ জন। ২০২২ সালে সমুদ্রপথে ইতালি প্রবেশের চেষ্টা করেছেন ১৪ হাজার ৯৭১ জন বাংলাদেশী এবং ২০২৩ সালে পাড়ি দিয়েছেন ১২ হাজার ৭৭৪ জন। অর্থাৎ অবৈধ পথে বাংলাদেশের তরুণ-যুবকরা নিয়মিতভাবে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও অবৈধপথে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছেন। তেমনিভাবে ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ হওয়া এবং ডুবে মৃত্যুর সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৩ সালেই ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫১ জন ইতালির উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। এ সময় নিখোঁজ বা মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৭। আর বাংলাদেশীর মৃত্যুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বাংলাদেশীরা ইউরোপে যাওয়ার জন্য মূলত ইতালিকেই এন্ট্রিপয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েই ইতালিতে প্রবেশ তুলনামূলকভাবে সহজতর। ফলে মানব পাচারকারীরা এ রুটকেই ব্যবহার করে। আর ভূমধ্যসাগরেই নৌকা ডুবে মারা যায় এসব অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশী, যেখানে বাংলাদেশীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এখানে মনে রাখা জরুরি যে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যায় বলে অনেকের মরদেহও পাওয়া যায় না। যাদের মরদেহ পাওয়া যায়, তারা বাক্সবন্দি হয়ে ফিরে আসে বাংলাদেশে।
এভাবে বাক্সবন্দি মরদেহ হয়ে দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়েও এ দেশের তরুণ-যুবকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যখন বিদেশে পাড়ি জমানোর কাতারে ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত হয়, তখন বুঝতে হবে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে খানিকটা গলদ আছে। এ উন্নয়ন অসম-উন্নয়ন, যা মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে, শহর আর গ্রামের মধ্যে সুযোগ, সম্ভাবনা ও অধিকারের তারতম্য সৃষ্টি করছে এবং তরুণ-যুবাদের মধ্যে স্বপ্ন উৎপাদনের পরিবর্তে হতাশার জন্ম দিচ্ছে। তাই অবৈধ অভিবাসনের সংখ্যা বছরের পর বছর বাড়ছে। ভূমধ্যসাগরও রাক্ষুসে থাবায় কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য বাংলাদেশী তরুণ-যুবার জীবন। ফলে মরদেহের বাক্সের সংখ্যাও ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। জীবন ও মৃত্যুর এ নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে কিছুটা নৈতিক উন্নয়ন জরুরি, যা মৃত্যুকে আলিঙ্গন নয়, বরং মানুষকে বাঁচতে শেখাবে।
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










