অর্থনীতি বিষয়টি সবসময়ই ‘প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস টেন্স’ বা বহমান নদীর মতো। মানুষ বেঁচে থাকলে তাকে খেতে হবে, খাওয়ার জন্য কাজ করতে হবে, আয় করতে হবে, দুর্দিনের জন্য সঞ্চয় করতে হবে। অন্যদিকে অগ্রগতিকে জুতসই ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে সেই যাত্রায় অধিকতর মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হয়। অধিক জনসংখ্যার দরিদ্র দেশে আবার ক্রমাগত বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। তার জন্য আবার প্রয়োজন উপযোগী নীতি পরিবেশ ও অনুকূল রাজনীতি।
আমাদের দেশে প্রায় দুই বছর ধরে ডলার–সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই বেশ চাপে রয়েছে বলে প্রায় সবাই স্বীকার করেছেন। তবে সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতা, কারফিউ জারি, স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া, সমুদ্র ও বিমানবন্দরে কাজকর্ম কমে যাওয়া, ইন্টারনেট সেবা বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপ অর্থনীতিকে আরো কঠিন অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
পত্রপত্রিকায় দেখছি, রফতানিমুখী কারখানা বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের বিশাল ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। বিজিএমইএর সভাপতি বলেছেন, কয়েক দিনের স্থবিরতায় প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সরাসরি রফতানিতে ক্ষতি হয়েছে ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতির মতে, একদিন কারখানা বন্ধ থাকলে ১৬ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়, যা দেশী মুদ্রায় ১ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রামভিত্তিক বৃহৎ পোশাক রফতানিকারকদের কেউ কেউ বলেছেন, রফতানি অর্ডার পালন করতে এয়ার শিপমেন্ট এমনকি মূল্যে ছাড় বা ডিসকাউন্ট দিতে হতে পারে।
কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, গত এক সপ্তাহে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ চলমান স্থবিরতায় দিনে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। আবার কোনো কোনো ব্যাংক নির্বাহী বলছেন, অর্থনীতির ক্ষতি হয়তো টাকার অংকে মাপা যায়, কিন্তু দেশের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা মাপার কোনো নিক্তি নেই।
দেশের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি ইন্টারনেটনির্ভর। আমদানি-রফতানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য বিদেশী ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ই-মেইলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বিদেশী ব্যাংক ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। গত বুধবার সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট সেবা চালু হয়েছে। শিল্প-কারখানাগুলোয় উৎপাদন শুরু হয়েছে। ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরও দুদিন সীমিত সময়ের জন্য চালু ছিল। গত বুধবার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে শুল্কায়নের জন্য প্রায় ৭ হাজার ৮১৯টি আমদানি-রফতানি চালানের নথি অনলাইনে দাখিল করেছেন ব্যবহারকারীরা। বন্দর থেকে পণ্য খালাসও পুরোদমে শুরু হয়েছে। ঢাকার সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর গত বৃহস্পতিবার ট্রেন ও সড়ক যোগাযোগও চালু হয়েছে।
কিন্তু প্রায় সবাই মনে করেন, অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি সচল করতে হলে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা পুরোপুরি দূর করতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা অবশ্য শুক্রবারের পরিস্থিতি দেখে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেছেন। তবে যখন সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে করছে, তখন সবকিছু খুলে দিতে দেরি কেন? জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে যা করার, এখনই তা করতে হবে।
তবে অর্থনীতিকে পুরোপুরি গতিশীল করতে হলে কিছু রাজনৈতিক ইস্যুর দিকেও নজর দিতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা একদিকে বলেছেন কোটা আন্দোলন কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা জড়িত নন, অন্যদিকে অজ্ঞাতসংখ্যক আন্দোলনকারীর নামে একের পর এক মামলা করা হচ্ছে। এটা নিশ্চিতভাবেই স্ববিরোধী অবস্থান। এরই মধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগও এসেছে। এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
আমার এ বিষয় তুলে আনার কারণ গত কয়েক দিন যেসব বিদেশী বিনিয়োগকারী বা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা আমাকে ফোন করেছেন বা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তাদের প্রায় সবারই প্রশ্ন ছিল—এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা ঠেকাব কীভাবে? অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হবে কীভাবে? তাদের অনেকেরই পরামর্শ—অনুকূল রাজনীতি ছাড়া গতিশীল অর্থনীতি বিনির্মাণ হবে বৃথা স্বপ্ন।
সন্দেহ নেই, দেশের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি হয়েছে। কোটা সংস্কারের মতো একটি অরাজনৈতিক ইস্যু কেন্দ্র করে দুই শতাধিক মানুষের বিশেষ করে তরুণদের প্রাণহানি ঘটেছে। অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন; দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এ ক্ষতি আর বাড়তে দেয়া যায় না। যারা সম্পদ ধ্বংস করেছেন, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে সরকার আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু নির্দোষ কাউকে হয়রানি করা মোটেই উচিত হবে না।
আমরা যেখানে অর্থনৈতিক শক্তির কথা বলছি, উন্নত দেশের কথা বলছি, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের’ কথা বলছি, সেক্ষেত্রে তরুণ ও মেধাবী জনবলের বিকল্প নেই। তাদের বাইরে রেখে আমাদের কোনো অগ্রগতির স্বপ্নই বাস্তবায়ন হবে না। তরুণ তাজা প্রাণের বিকল্প কখনই স্থবির বা জড় সম্পদ হতে পারে না। অভিনব চিন্তাশক্তির অধিকারী তারুণ্য যে কোনো সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে ইতিহাস তা প্রমাণ করেছে। প্রযুক্তিজ্ঞানে বলীয়ান ইদানীংকার তারুণ্য সেটাকে আরো বেগবান করবে তাতে সন্দেহ নেই।
সেই বিবেচনায় আমাদের একান্ত কামনা হবে—জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পাশাপাশি একটি ভয়হীন পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক। একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে আমাদের কর্মকাণ্ড হোক আরো পরিকল্পিত ও দায়বদ্ধ।
প্রতিটি দেশ বা অর্থনীতির রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মতো, ভাড়া করা বা আমদানি করা মেধার চেয়ে সুশিক্ষিত স্থানীয় মেধাই পারবে স্থানীয় সমস্যার উপযোগী সমাধান। প্রিয় স্বদেশ জ্বলে উঠুক আপন শক্তিতে, সম্মিলিত প্রতিজ্ঞায়।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক










