দেশে কারিগরি শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় অর্ধেক আসনই ফাঁকা থাকে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। আবার শিক্ষাজীবন শেষে মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এজন্য যথাযথ ও ভালো কর্মসংস্থানের অভাবকে সংশ্লিষ্টরা দায়ী করছেন। সামাজিকভাবেও ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের অবজ্ঞার চোখে দেখা হয় বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় আগ্রহ হারাচ্ছেন দেশের শিক্ষার্থীরা। সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোয় ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় নতুন ভর্তির আসন সংখ্যা ফাঁকা থাকছে অর্ধেকেরও বেশি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় নতুন ভর্তির জন্য আসন সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ১০০। যদিও এসব আসনে ভর্তি হয়েছেন মোট ৭৩ হাজার ২৭২ জন শিক্ষার্থী, যা গত ছয় বছরে সর্বনিম্ন। সে অনুযায়ী, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে দেশে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অর্ধেক আসনও পূরণ হয়নি।

তবে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারালেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ হচ্ছে। এ চাহিদার কথা বিবেচনা করে কয়েক বছরে দেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় আসন সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো ছাড়াও প্রায় ৩ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ২৩টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর পরও ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ক্রমেই শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। 

সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোকে দেশে মানসম্মত ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় অগ্রণী ধরা হয়। যদিও সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৪৮ শতাংশ তাদের ডিগ্রি সম্পন্ন করে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন বলে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এক জরিপের তথ্যে উঠে এসেছে। বাকি সাড়ে ৫১ শতাংশ বেকার থেকে যাচ্ছেন। 

আবার যারা চাকরি পাচ্ছেন, তারাও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আয় করতে পারছেন না। ব্যানবেইসের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে ঢোকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭১ শতাংশ বেতন পাচ্ছেন ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

এ নিয়ে অনুযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মাঝে। এছাড়া ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থান থাকলেও চাকরির বেতন কাঠামোর অবস্থান এখনো ভালো উচ্চতায় পৌঁছেনি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, সমাজে ডিপ্লোমা প্রকৌশল বিষয়ের শিক্ষার্থীদের বিবেচনা করা হয় তুলনামূলক কম মেধাবী হিসেবে। এসব কারণেই শিক্ষার্থীরা ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষায় কম আগ্রহী হচ্ছেন।

প্রকৌশল বিদ্যার বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা ও ব্যবহারিক জ্ঞাননির্ভর কর্মশক্তি জোগানের উদ্দেশ্যে ডিপ্লোমা প্রকৌশল ডিগ্রির প্রচলন রয়েছে। দেশে-বিদেশে এটিকে কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। যদিও দেশে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ দিনে দিনে কমছে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে আরো জানা যায়, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষেও দেশে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার ৮৪০। সেখান থেকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৭৩ হাজার ২৭২-এ। এ অনুযায়ী, গত পাঁচ শিক্ষাবর্ষে দেশে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি।

এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীর পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষকের অভাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো করলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা সংকট মোকাবেলা করে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এ বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের আগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে ব্যয়বহুল বলেও তারা মত দিচ্ছেন।

গুরুত্ব বিবেচনায় দেশে কারিগরি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের যে চ্যালেঞ্জ, সেটি সমাধানে উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে জানা গেছে। যেমন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট, ল্যাব সংকট রয়েছে। বলা যায়, কোর্সগুলো এক ধরনের জোড়াতালি দিয়ে শেষ করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এছাড়া ডিপ্লোমা নিয়ে সমাজে অনেকের অনীহা রয়েছে। বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে এটি দেখা যায়। তবে অনীহা সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে নেই। নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মধ্যে এ ধরনের অনীহা নেই। কিন্তু এসব পরিবারের সন্তানরা অর্থের অভাবে ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তি হতে পারেন না। কারণ আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষা বেশ ব্যয়বহুল। এ শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগসহ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাসহ ব্যয় কমানো প্রয়োজন। পাশাপাশি যথেষ্ট বৃত্তির ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করা যায়। আর কর্মজীবনে মূল্যায়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য দূর করতে শিগগিরই বেতনবৈষম্যের বিষয়টি সমাধান করতে হবে।