পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তার অবদান মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ছবি, তার ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ উপাধি, স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান, বাংলার মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ প্রভৃতির রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার ও স্মরণ নিষিদ্ধ ছিল। দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে বঙ্গবন্ধুকে পুনরায় পুনর্বাসন করা হয়। তার জীবন ও কর্মের ওপর নানা গবেষণা হয়, বাংলাদেশের জন্য তার পর্বত প্রতিম অবদান দেশবাসী ও নতুন প্রজন্ম জানতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়নে তার কন্যা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার সংবাদ বেতারের শোনার পর সাহিত্যিক সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীন তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, মৃত মুজিব জীবিত মুজিবের চেয়ে শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হবেন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবের কবর একদিন সমাধিস্থলে রূপান্তরিত হবে এবং বাঙালির তীর্থস্থান হিসেবে রূপ লাভ করবে। তাদের ভবিষ্যদ্বাণী এখন বাস্তবতা। বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল এ দেশের মানুষ তথা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের তীর্থস্থানে রূপ নিয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেন এ অবিনাশী সত্তায় রূপ নিলেন তার সাক্ষ্য দেয় তার জীবনব্যাপী কর্মযজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন, আন্দোলন-সংগ্রাম, সরকার পরিচালনা ও দেশ শাসনসহ সার্বিক জীবনাচার পর্যালোচনা করলে যে বিষয়গুলো আমাদের সামনে প্রতিভাত হয় তা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাসের মূলধারা।

ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি শুরু করে বাংলার মানুষকে ভালোবেসে তাদের দুঃখ-কষ্টে এগিয়ে এসেছেন সকলের ‘‌মুজিব ভাই’। তাই দেখা যায়, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে এবং ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জীবন বাজি রেখে মানুষের সেবা করেছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হওয়ার পর ১৯৪৮ সাল থেকেই ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানের তাঁবেদার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গঠন, ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এরপর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদানের মাধ্যমে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করেন। 

অল্প সময়ের মধ্যেই মওলানা ভাসানী, শামসুল হক প্রমুখ নেতা এবং সর্বোপরি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে এসে পূর্ববাংলার রাজনীতিতে পরিপক্বতা অর্জন করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের শাসন বিভাগে অংশগ্রহণ করলেও বাঙালির স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের পর বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালিদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করতে দেবে না। বাঙালিদের শাসন ও শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তানকে সমৃদ্ধ করা হচ্ছিল। শাসন ব্যবস্থা, সরকারি চাকরি, প্রতিরক্ষা বাহিনীতে নিয়োগ, উন্নয়ন ব্যয়ের অংশীদারত্ব সব ক্ষেত্রেই পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান বৈষম্যের শিকার হয়। আওয়ামী লীগের ছায়াতলে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য প্রগতিশীল নেতারাসহ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যের অবসানের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যান। প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তান সরকার এবং ১৯৫৮ সালের পর সামরিক সরকার, ১৯৬০ সালের পর বেসামরিক শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সেনা সমর্থিত সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আন্দোলন দমনের জন্য তাকে বারবার গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করে, প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রদানের চেষ্টা করে। 

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খুবই বিরক্ত হন। ২০ মার্চ ১৯৬৬ প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এসে বলেন, ‘‌দেশের অখণ্ডতা বিরোধী কোনো প্রচেষ্টা সমর্থন করা হবে না, প্রয়োজন বোধে অস্ত্রের ভাষায় এর জবাব দেয়া হবে।’ সেদিনই বিকালে পল্টন ময়দানে লক্ষ লোকের সমাবেশে শেখ মুজিব বলেন, ‘ছয় দফা দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনসহ মেনে নিতে হবে। আমরা অনেক রক্তচক্ষু দেখেছি, আর নয়। ... দেশের উভয় অংশকে সমান শক্তিশালী করতে হবে।’

ছয় দফার প্রচার আন্দোলনকালে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘন ঘন জেলে যেতে হয়েছিল। সরকার আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। বিশেষ করে শেখ মুজিবকে বড় রকমের কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করার জন্য সরকার ফাঁদ পাতে। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করে পুনরায় গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে থেকেই শেখ মুজিব প্রায় ২১ মাস ধরে জেলে আটক ছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃস্বার্থ রাজনীতি, মানুষের জন্য ভালোবাসা, জেল-জুলুম সত্ত্বেও অসীম সাহসিকতা ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থরক্ষায় ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সর্বোপরি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সহানুভূতি ও মমত্ববোধ তার ওপর বর্ষিত হয়। জনগণ বুঝতে পারেন, পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রহসনের বিচার করে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিল। ১৯৬৯ সালের শুরুতেই ছাত্র-জনতা রক্তক্ষয়ী গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সরকারকে বাধ্য করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাহার করে নিলে শেখ মুজিব ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাস থেকে মুক্ত হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে গণসংবর্ধনা প্রদান করে। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ হতে পরিষদ সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে”বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেন।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব রাজনৈতিক সংকট নিরসনকল্পে পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ১৯৬৯ সালের মার্চে গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ওই বৈঠকে ছয় দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও তার সরকারের পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক নেতারা পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনি, বরং তারা শেখ মুজিবের ভূমিকা ও প্রস্তাবকে ‘পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখেন। বৈঠকে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় আইয়ুব খান এই বলে গোলটেবিল বৈঠক সমাপ্ত করেন যে নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকার ব্যবস্থা ও অন্যান্য মৌলিক নীতিগত বিষয় ঠিক করবে।

মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান করেন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য। তিনি বলেন, সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।” ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর গণআন্দোলন এবং মার্চে আইয়ুব খান সরকারের পতন প্রভৃতির প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেবে আবির্ভূত হন। তার অসাধারণ নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা, গুরুগম্ভীর বাগ্মিতা, ব্যক্তিত্ব প্রভৃতির কারণে বাঙালির একমাত্র ভরসাস্থল হিসেবে পরিগণিত হন। এর ফলে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের দুটি ব্যতীত সবক’টি আসনে জয়লাভ করে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

পাকিস্তানের পরবর্তী ইতিহাস আরো কলঙ্কজনক। আইয়ুব খানের পরবর্তী সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করে। ১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ প্রাণ হারায়। রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা তুলে ধরেন। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর অনড় অবস্থানের কারণে আলোচনা ব্যর্থ হলে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ইয়াহিয়া খান ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করে। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়।

আওয়ামী লীগে তার সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখের নেতৃত্বাধীন হাইকমান্ড ভারতে গিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে। বাংলাদেশের ছাত্র-শ্রমিক, যুবকসহ অধিকাংশ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে অবস্থান নেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৬ মার্চের পর পর বাঙালি পুলিশ, ইপিআর, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অফিসার ও জাওয়ানরা বিদ্রোহ করে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করলেও ক্রমান্বয়ে মুক্তিবাহিনীতে আপামর জনতা যোগ দেয়ার ফলে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে এটি একটি জনযুদ্ধে পরিণত হয়। অবশেষে নয় মাসের জীবনপণ যুদ্ধে এবং ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ বাঙালিসহ ৩০ লাখ শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয়।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১২ জানুয়ারি সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী) হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কোনো টাকা ছিল না, বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না, সে দেশের পুনর্গঠন, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান, ভারত প্রত্যাগত প্রায় এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসন, পাকিস্তান থেকে পাঁচ লক্ষাধিক বাঙালিকে ফিরিয়ে আনা, ১২১টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসি, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ প্রভৃতি জোট ও সংস্থার সদস্যপদ লাভ, বিশ্বের ছোট-বড় দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন, দেশের অভ্যন্তরে অব্যাহত সন্ত্রাস, চুরি ডাকাতি, দুর্নীতি, কালোবাজারি, মুনাফাখোরি, চোরাচালান এবং সব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবস্থা গ্রহণ, বন্যা-দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি মোকাবেলা করে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে যখন অগ্রগতির পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে নেমে এসেছে এক অকল্পনীয় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্যোগ। একটি ক্ষমতালোভী, বিশ্বাসঘাতক ও বিপথগামী চক্র ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।

বঙ্গবন্ধুর আত্মবিশ্বাস ছিল যে তিনি বাংলার মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষও তাকে ভালোবাসে। বঙ্গবন্ধু নিজ বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ সাধারণ নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থাকতেন। তিনি বলতেন, “বাঙালি আমাকে মারবে না।” তার এ বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম এবং বাংলার মানুষের প্রতি সীমাহীন বিশ্বাস ও আস্থা। তার জীবিত অবস্থায় ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট কোনো এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কী?" বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আই লাভ মাই পিপল। পরের প্রশ্ন, “আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?” বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেছিলেন, আই লাভ মাই পিপল টু মাচ। আমি মরি তাও ভালো। তবু আমার দেশবাসীর যেন মর্যাদার হানি না ঘটে। অথচ এ দেশেরই কিছু দুষ্কৃতিকারী ও বিপথগামী সেনাসদস্যের গুলিতে সপরিবারে প্রাণ হারান জাতির পিতা।”

বিশ্ববাসী ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞের খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যে মানুষটি তার সারা জীবন বাংলার মানুষকে ভালোবেসে তাদের অধিকার আদায়, তাদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, জীবনের প্রায় ১৩টি বছর পাকিস্তানের কারাগারে নিঃসঙ্গ, অনিশ্চিত জীবন কাটিয়েছেন, জাতিকে স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন, যাকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা হত্যা করতে সাহস করেনি, তাকে কিনা হত্যা করেছে একদল বিপথগামী অকৃতজ্ঞ বাঙালি! এ কেমন জাতি! দেশবাসী কীভাবে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড মেনে নিল!

হত্যাযজ্ঞের কুশীলবরা চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নাম ও নিশানা মুছে দিতে। অথচ এখন শেখ মুজিব একটি অবিনাশী নাম একজন কিংবদন্তি। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য করে দিয়ে, ‘‌মৃত মুজিব জীবিত মুজিবের চেয়ে শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত’ হয়েছেন। টুঙ্গিপাড়ায় তার সমাধিস্থল দেশের সর্বস্তরের মানুষের তীর্থস্থান। 

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান, বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত