বাংলাদেশের জিডিপিতে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদের অবদান ছিল প্রায় ১ দশমিক ৯০ শতাংশ, যেখানে কৃষির ছিল ১৬ শতাংশ। গ্রাম্য জনসংখ্যার মোট ৭০ ভাগই পশুপালনের সঙ্গে জড়িত, যাদের অধিকাংশই প্রান্তিক খামারি। এই একুশ শতকে এসে বাংলাদেশে এমন পরিবারও পাওয়া যাবে (বিশেষ করে গ্রামে) যারা শুধু এক-দুটি গরু, কিছু মুরগি/হাঁস চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রান্তিক খামারিদের উপার্জনের সিংহভাগই আসে পশুপালন থেকে। মূলত বাংলাদেশে তিন ধরনের পশুপালন বিদ্যমান: দুগ্ধ উৎপাদন, মাংস উৎপাদন ও পোলট্রি। পশুপালনের মাধ্যমে এ দেশের অন্তত ৩৬ লাখ পরিবার বাড়তি আয়ের সুযোগ পেয়ে থাকে। ২০১৯-এর কৃষিশুমারি অনুযায়ী দেশে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা রয়েছে যথাক্রমে ২ কোটি ৮৫ লাখ, ৭ লাখ ১৮ হাজার, ১ কোটি ৯৩ লাখ ও ৮ লাখ ৯৩ হাজার। এছাড়া পোলট্রি, হাঁস ও টার্কির সংখ্যা যথাক্রমে ১৮ কোটি ৯৩ লাখ, ৬ কোটি ৭৫ লাখ এবং ১৪ লাখ ৪৫ হাজার। প্রান্তিক খামারিরা এ প্রাণিসম্পদ খাতের প্রাণ হলেও পশুপালনে স্থিতিশীলতার ঘাটতি ও নানা ঝুঁকি তাদের সংকটে ফেলে দেয়। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার (প্রাণীর রোগবালাই‌, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চুরি) মুখোমুখি হলে তাদের অনেক সময় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরো খামারটাই হারাতে হয়। প্রান্তিক খামারিরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অভাবে তাদের খামার ব্যবসার আকার বৃদ্ধি করতে ব্যর্থ হয় এবং অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিফল হয়। এ অবস্থায় প্রান্তিক খামারিদের জন্য উপযোগী ও সুলভ্য প্রাণিসম্পদ বীমা ব্যবস্থা ওই সমস্যা থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিত্রাণ দিতে পারে। 

কৃষি বীমা কৃষকদের খরচ এবং উৎপাদনশীল সম্পদ রক্ষায় বড় ধরনের উৎপাদন ক্ষতির বছরগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যার ফলে তারা দারিদ্র্যের ফাঁদ এড়াতে সক্ষম হন। কৃষি বীমা বর্তমানে ১০০টিরও বেশি দেশে সু-উন্নত প্রোগ্রাম বা পাইলট হিসেবে চালু রয়েছে। যদিও উচ্চ আয়ের দেশগুলোর বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত কৃষি বীমা বাজার রয়েছে, তবে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বর্তমানে এ ধরনের পণ্য এবং কর্মসূচি পরিচালনা করে। সেই বিংশ শতাব্দী থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো উন্নত দেশে প্রাণিসম্পদ বীমা সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা ক্ষুদ্রঋণযুক্ত মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স প্রদান করে থাকে, যেটা অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকদের জন্য বাড়তি বোঝার কারণ হয়। যদিও গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের জন্য ক্রেডিট এবং বীমার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে একটি ঝুঁকি রয়েছে যে মাইক্রো-ক্রেডিট বা সঞ্চয় স্কিমগুলোর সঙ্গে বান্ডেল করা বাধ্যতামূলক বীমা স্কিমগুলো নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ক্রেডিট সুবিধা গ্রহণ করার ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। কারণ এ জাতীয় স্কিমগুলো ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে তোলে বা সঞ্চয় থেকে আয় হ্রাস করে। বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ ব্যাংক এবং আশা তাদের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের সঙ্গে খামারিদের বাধ্যতামূলক মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স প্রদান করে থাকে। এ অবস্থায় প্রাণিসম্পদ বীমা বাংলাদেশে অনুপযোগী ও ব্যর্থ হিসেবে গণ্য করা হলেও কৃষকদের চাহিদা ও সামর্থ্য উপযোগী বীমার কাঠামোগত গঠনই পারে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করতে। 

উন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পশুপালন ব্যবস্থার প্রধান পার্থক্য হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ খামারিই প্রান্তিক পর্যায়ের। তবে নিকট অতীতে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ, যেমন ভারত, নেপাল, ইথিওপিয়া, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রে প্রাণিসম্পদ বীমা ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি পরিসরে প্রচলন হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের উদাহরণ সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য। ভারতে ২০০৮-০৯ অর্থ বছর থেকে সরকারি তত্ত্বাবধায়নে একটি বিশেষ হাইব্রিড মডেলের মাধ্যমে ১০০টি প্রশাসনিক জেলায় Livestock Insurance Scheme চালু রয়েছে। এ বিশেষ মডেলে সরকারিভাবে ভারতের Department of Animal Husbandry, Dairying & Fisheries-এর আওতায় পাবলিক বা প্রাইভেট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে বীমার কার্যক্রম পরিচালনার নিমিত্তে নিয়োগ করা হয়। প্রতি বীমার কিস্তির ৫০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি দেয় এবং বাকি ৫০ শতাংশ বীমা গ্রহণকারী বহন করে। প্রিমিয়ামের সর্বোচ্চ হার বার্ষিক ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বা ত্রিবার্ষিক ১২ শতাংশ হারে নির্ধারিত হয়। এ বীমা ব্যবস্থাপনার সার্বিক সাফল্য নিশ্চিতকরণে এবং বীমা-উপযুক্ত পশু নির্বাচনে একজন সরকারি পশুচিকিৎসক নিয়োজিত থাকেন। অনুরূপভাবে নেপালে বাস্তবায়ন হওয়া Community Livestock Development Programme-এর দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, এই স্কিমের আওতায় অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়ামের ৫০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি দেয়। প্রায় পাঁচ হাজার পশুকে সফলতার সঙ্গে এই স্কিমের আওতায় নেয়া সম্ভব হয়েছিল। 

যদিও উন্নত দেশে প্রাইভেট বীমাকেই বেশি সফল মনে করা হয়, তবে ভারত ও নেপালের উদাহরণ থেকে আমরা বলতে পারি যে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের সাফল্য এনে দিতে পারে। আমরা বিভিন্ন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর আঙ্গিকে নিজেদের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে একটি সফল ও অনুরূপ প্রাণিসম্পদ বীমা চালু করা যায় কিনা তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরছি। প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে প্রস্তাবিত ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রামটিতে প্রান্তিক খামারিদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। 

আমাদের প্রস্তাবনায় ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রামটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওপর। এ অধিদপ্তর একজন এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) নিয়োগের মাধ্যমে পুরো বীমা ব্যবস্থাপনাটি দেখভাল করবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সরকারি বা আগ্রহী বেসরকারি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে বীমা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়োজিত করবে। এক্ষেত্রে আমরা প্রতিষ্ঠানগত ইন্স্যুরেন্স পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি। অর্থাৎ বিশেষায়িত বীমা কোম্পানি ব্যতীত অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনজিও এ প্রাণিসম্পদ বীমা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না। উল্লেখ্য, নেপালে প্রতিষ্ঠানগত ইন্স্যুরেন্স পদ্ধতি অনুসরণ করে লাইভস্টক ইন্স্যুরেন্স স্কিম চালু করা হয়েছে। সরকার, খামারি ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির যৌথ সিদ্ধান্তে পশুর বাজারদর নির্ধারণ হবে। বার্ষিক প্রিমিয়ামের সঙ্গে ত্রৈমাসিক কিংবা মাসিক প্রিমিয়ামেরও ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। বাজারদরের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হবে বার্ষিক প্রিমিয়ামের হার। প্রিমিয়ামের ৬০ শতাংশ খামারি নিজে বহন করবেন এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ সরকার বা পাইলট প্রকল্প থেকে ভর্তুকি দেবে। উল্লেখ্য, এই ইন্স্যুরেন্স স্কিমের সূচনাকালে খামারিদের উৎসাহিত করা জন্য সরকার ৪০ শতাংশ ভর্তুকি দেবে, তবে পরবর্তী সময়ে খামারিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলে সরকার এ ভর্তুকি ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নিয়ে আসতে পারে। যদি বীমাকৃত পশু বীমার ঝুঁকি তালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো একটি কারণে মারা যায় তবে খামারি বাজারমূল্যের ৯০ শতাংশ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাবেন। এ ক্ষতিপূরণের ৮০ শতাংশ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং অবশিষ্ট ১০ শতাংশ সরকার বা পাইলট প্রকল্প বহন করবে। উদাহরণস্বরূপ একজন খামারির ৮০ হাজার টাকা বাজারমূল্যের একটি গরু রয়েছে। এই স্কিমের আওতায় প্রতি বছর তার প্রিমিয়াম হবে ৪ হাজার টাকা। এই ৪ হাজার টাকার ৬০ শতাংশ বা ২ হাজার ৪০০ টাকা খামারি নিজে বহন করবে এবং অবশিষ্ট ১ হাজার ৬০০ টাকা সরকার/পাইলট প্রকল্প বহন করবে। পশুর নিরাপত্তার স্বার্থে ৮০ হাজার টাকার বিপরীতে মাত্র ২ হাজার ৪০০ টাকা প্রিমিয়াম হিসেবে প্রদান করা (তা আবার কিস্তিতে) কৃষকদের জন্য খুব একটা কঠিন হবে না। যদি বীমাকৃত পশু বীমার ঝুঁকি তালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো একটি কারণে মারা যায় তবে খামারি ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৮০ হাজার টাকার ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ৭২ হাজার টাকা পাবেন, যা খামারির ক্ষতি অনেকাংশেই পুষিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। মোট ৯০ শতাংশ ক্ষতিপূরণের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৬৪ হাজার টাকা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি বহন করবে এবং অবশিষ্ট ৮ হাজার টাকা সরকার/পাইলট প্রকল্প বহন করবে। কেউ কেউ ভর্তুকিবিহীন বীমার পক্ষে থাকলেও সত্যিকার অর্থে প্রান্তিক খামারিদের বিশেষ প্রতিকূলতার সময় সরকারি ভর্তুকিই কেবল পারে খামারি ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে। আরেকটি কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে এ প্রবণতা রয়েছে যে তারা যখন কোনো কৃষি সম্পর্কিত পণ্যে ভর্তুকি পান তখন তাদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণার সঞ্চার হয়। তাই খামারিদের উৎসাহ প্রদানের জন্য এটি হতে পারে একটি উত্তম ও কার্যকর হাতিয়ার। প্রকৃতপক্ষে এ ভর্তুকিকে সরকারের সাময়িক ক্ষতি হিসেবে মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে এবং এতে উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করবে ও খামারিদের ব্যবসায় স্থিতিশীলতা আসবে এবং তাদের খামারের আকার ও উৎপাদনশীলতাও বাড়বে। দিনশেষে এ বীমা প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্য ও আমিষের চাহিদা পূরণে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। সম্পূর্ণ বীমা ব্যবস্থাপনায় একজন সরকারি রেজিস্টার্ড পশুচিকিৎসক ও একজন লাইভস্টক অফিসার নিয়োজিত থাকবেন এবং তাদের নির্দেশনায় পশুর নিয়মিত শারীরিক ও আনুষঙ্গিক বিষয়াবলির পর্যবেক্ষণ হবে। 

তবে এ বীমার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে কিছু শর্ত থাকবে এবং বীমার আওতায় যেসব ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত থাকবে তা হলো: ১. রোগবালাইয়ে পশুর মৃত্যু, ২. কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে পশুর মৃত্যু (বন্যা, বজ্রপাত, খরা, ভূমিকম্প), ৩. দুর্ঘটনায় পশু মৃত্যু এবং ৪. চুরি। যেহেতু একজন পশুচিকিৎসক ও লাইভস্টক অফিসার সর্বদা তদারকি করবেন তাই রোগবালাই কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পশুর মৃত্যু অনেকাংশেই কম হবে এবং এতে খামারি ও কোম্পানি উভয়ই লাভবান হবে। পশু যদি দুর্ঘটনায় মারা যায় বা চুরি হয় তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত প্রমাণ, সাক্ষী ও সার্টিফিকেট উপস্থাপন করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও বিশ্বাসযোগ্যতাই পারবে একটি সফল ও স্বচ্ছ বীমা ব্যবস্থা গঠন করতে।

খামারি ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি উভয় পক্ষই এ বীমা স্কিমের সুবিধা ভোগ করবে। প্রথমত, খামারিরা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লাভ করবে এবং খামার ব্যবসায় আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। এ বীমা স্কিমের অংশ হিসেবে একজন পশুচিকিৎসক সার্বক্ষণিক পশুর স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও দৈহিক বৃদ্ধির প্রতি নজর রাখবেন। এবং একজন লাইভস্টক অফিসার পশুর খাদ্য, পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনার দিকে সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখবেন। এতে করে পশুর আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পরিচর্যা নিশ্চিত হবে যা পশুর দুধ এবং মাংসের গুণগত মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি করবে, যা খামারিদের আরো লাভবান করবে। অন্যদিকে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধায়নের কারণে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিও যেকোনো বহিঃশক্তির প্রভাব মুক্ত থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে। একই সঙ্গে যেহেতু সরকারি কর্মকর্তারা পশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ব্যাপারটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করবেন এক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর খরচও সাশ্রয় হবে। উপরন্তু, যেহেতু প্রিমিয়ামের ৪০ শতাংশ সরকার/পাইলট প্রকল্প প্রদান করবে তাই নিয়মিত প্রিমিয়াম গ্রহণও তাদের জন্য সহজ হবে এবং প্রিমিয়াম খেলাপি খামারির সংখ্যাও কম হবে। এছাড়া একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানে শুধু একটি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এতে করে কোম্পানির কর্মক্ষমতার বিকাশ হবে, খামারিদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজতর হবে এবং কোম্পানির আনুষঙ্গিক ব্যয় কম হবে। দিনশেষে যেমন খামারিরা ঝুঁকিমুক্ত থাকবেন তেমনি কোম্পানিও পর্যাপ্ত লাভের মুখ দেখবে।

বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ বীমা প্রবর্তন লাখ লাখ কৃষকের জীবিকার সুরক্ষার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। বাংলাদেশে খামারিরা অপ্রত্যাশিত জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পশুর রোগবালাইয়ের মতো উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখোমুখি হন, যা তাদের ব্যবসায়ে ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। প্রান্তিক খামারিদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাণিসম্পদ বীমার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার এখনই উপযুক্ত সময়। গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রসার ঘটানো ও দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রাণিসম্পদ বীমা হতে পারে সাহসী ও যুগোপযোগী উদ্যোগ। বীমা চালুর বিষয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বেশ সময় পেরিয়ে গেছে। ২০৪১-এর মধ্যে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে প্রাণিসম্পদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত উন্নয়নে বীমার প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার আর কোনো অবকাশ নেই। এ বিষয়ে সদাশয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যথাসম্ভব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এটা আমাদের প্রত্যাশা। প্রাণিসম্পদ খাতে বীমা চালুর জন্য আসন্ন বাজেটে কিছু থোক বরাদ্দ রাখারও প্রস্তাব করছি। (লেখাটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাইমুল ইসলাম)

ড. মো. সাইদুর রহমান: অধ্যাপক ও প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এবং সহসভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি ও কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি