মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে সাধারণ মানুষ জর্জরিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশাহারা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। বাজারে কোনো কিছুর দাম কমছে না। একটি পণ্যের মূল্যে আগুন ধরে যাওয়ার পর চক্রাকারে আরেকটি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে সমাজে উচ্চবিত্তদের সমস্যা না হলেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নিম্নবিত্ত মানুষকে। মধ্যবিত্তরাও শান্তিতে নেই। সবকিছুর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাপনের খরচে কাটছাঁট করে চলতে হচ্ছে। বাজারে অস্থিতিশীলতার এ সময়ে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য কিছুটা স্বস্তির জোগান দেয় স্বল্প আয়ের মানুষকে। কিন্তু বিদ্যমান মূল্যস্ফীতিতে টিসিবি কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, টিসিবির কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে ভোগ্যপণ্য কেনার সুযোগ পায় সাধারণ মানুষ। ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনি বিক্রি করলেও বাজার অস্থিতিশীলতার সময় প্রতিষ্ঠানটি মূল্য নিয়ন্ত্রণের তাগিদে অন্যান্য পণ্য বিশেষ করে পেঁয়াজ বিক্রি করে। এমনকি খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে চালও কম দামে বিক্রি করে টিসিবি। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় প্রতিষ্ঠানটির বাজার নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ‘ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম’-এর পরিধি বাড়বে এমনটিই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু টিসিবি ভোজ্যতেল, ডাল ও চালেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে জুনে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৪ শতাংশে পৌঁছে, যা কিনা এক যুগের সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩। চলতি মাসেও খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। 

বর্তমানে সারা দেশে টিসিবির তালিকায় এক কোটি ফ্যামিলি কার্ডধারী রয়েছে। মাসে ভর্তুকি মূল্যে একবার অর্থাৎ ২০০ টাকায় দুই লিটার সয়াবিন তেল, ১২০ টাকায় দুই কেজি মসুর ডাল ও ১৫০ টাকায় পাঁচ কেজি চাল কেনা যায়। তবে তিনটি পণ্যের এ প্যাকেজ থেকে আলাদা করে কেনার সুযোগ নেই। 

ব্যবসায়ীদের দাবি, বৈশ্বিক ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতার কারণে আমদানীকৃত পণ্যের দাম অনিয়ন্ত্রিত রয়েছে। এজন্য কভিডের প্রাদুর্ভাব থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের ব্যাঘাতসহ নানা কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। যদিও গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম কমেছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম এরই মধ্যে কভিডপূর্ব পর্যায়ে নেমে এসেছে। কিন্তু দেশে প্রায় প্রতিটি পণ্যেরই দাম বাড়ছে। এ উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে অপ্রতুল পণ্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষকে টিসিবির কার্যক্রমও স্বস্তি দিতে পারছে না। 

টিসিবির ভাষ্যমতে, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনায় মূল চ্যালেঞ্জ পর্যাপ্ত মূলধন সংকট। জরুরিভাবে ১ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হলেও তা এখনো অনুমোদন হয়নি। ফলে সরবরাহ ঠিক রাখতে টিসিবিকে ৯ শতাংশ সুদে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। আবার পণ্য নেয়ার সময় টিসিবির ডিলারদের ২ শতাংশ হারে সরকারকে আয়কর দিতে হচ্ছে। সে কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।

এদিকে বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়লেও টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় আরেকটি পণ্য চিনিও মিলছে না। এছাড়া নতুন পণ্য যোগ করার বিষয়ে টিসিবির কোনো পরিকল্পনা নেই বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বস্তুত বাজারের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যেই টিসিবির এ কার্যক্রম শুরু হয়। এখন দুর্মূল্যের বাজারে সেটিই যদি নিশ্চিত না হয় তাহলে টিসিবির ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়বে। এজন্য প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও টিসিবিকে আরো ঢেলে সাজানো উচিত। যেহেতু গত জুলাইয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের চাল যুক্ত হয়েছে। এমনকি রমজান মাসে যেহেতু ছোলা দেয়া হয়, তাহলে এটি প্রতীয়মান হয় যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইলে অন্য কোনো পণ্য যোগ করতে পারে। এক্ষেত্রে সদিচ্ছাটাই জরুরি। কারণ বর্তমানে টিসিবি থেকে কার্ডের মাধ্যমে মাসে একবার যে পণ্য কেনা যায়, তা দিয়ে অনেক পরিবারের ১০ দিনের প্রয়োজনও পূরণ হয় না। এটা সত্য, কম দামে পণ্য পেলে ক্রেতার সংখ্যাও বাড়বে। কিন্তু মানুষের ক্ষুধা নিবারণের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবেই টিসিবিকে অধিক কার্যকর করতে হবে। এজন্য মানবিক দিক বিবেচনা করে নিম্নবিত্তদের জন্য টিসিবির পণ্য তালিকা বাড়ানো উচিত। প্রয়োজনে ২০২১ সালের মতো ই-কমার্সের মাধ্যমে হলেও টিসিবির পণ্য বিক্রি করতে হবে। প্রত্যাশা করব, সরকার সাধারণ মানুষের কথা ভেবে টিসিবির ভূমিকা বাড়াতে জোরালো পদক্ষেপ নেবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি প্রদানসহ কর অব্যাহতির ব্যবস্থাও করতে হবে।