কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সংঘাত-সংঘর্ষ, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ, সেনা মোতায়েন—এসবের উত্তেজনা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশেও। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসীরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে ও দেশজুড়ে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে রেমিট্যান্স শাটডাউনের আহ্বান জানিয়েছেন। এভাবে বৈদেশিক শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি আরো চাপে পড়বে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশ ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রবাসীরা পরিবারের সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগ করতে পারেননি। এতে প্রবাসে বসবাসকারীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয় এবং তাদের বড় একটি অংশকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে এ ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা কমবেশি সবাই বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ করেছেন এবং দেশে সরাসরি রেমিট্যান্স না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেকাংশ। কিংবা পাঠালেও হয়তো বিকাশে পরিবারের খরচের টাকা পাঠাবেন বা জরুরি প্রয়োজন হলে অন্য কোনো পন্থায় পাঠাবেন। এছাড়া কোনো টাকা পাঠাবেন না।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের মতে, টানা পাঁচদিন বন্ধ থাকার পর বুধ ও বৃহস্পতিবার সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং কার্যক্রম চলাকালীন যেসব রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, সেগুলো বন্ধের সময় পাঠানো। তবে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসার প্রত্যাশা ছিল, সেটি দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুলাই পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মাত্র ১৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৯৮ কোটি ডলার এসেছিল প্রথম ১৩ দিনে। আর ১৪-২৪ জুলাই পর্যন্ত ১০ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৫৩ কোটি ডলার। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আশাবাদী যে হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসীরা সাড়া দেবেন না। প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠাবেন।
দেশে রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ আসে এজেন্ট ব্যাংকিং বা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ব্যবহার করে। এসব সেবার অন্যতম বিকাশ। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ১৮-২৪ জুলাই পর্যন্ত সেবাটি ব্যবহার করে কেউ রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেননি। আবার ব্যাংকও বন্ধ ছিল। নগদ টাকার সংকট ছিল এটিএম বুথগুলোয়। একদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগহীনতা, অন্যদিকে আর্থিক লেনদেনের এ ভোগান্তি প্রবাসীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে।
যেকোনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম সূচক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পর্যাপ্ত রিজার্ভ ছাড়া জ্বালানি তেল, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধের মতো জরুরি পণ্য আমদানি করা যায় না। এমনকি বিদেশী ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করা হয় রিজার্ভ থেকে। রিজার্ভ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রবাসীদের পাঠানো আয়। কিন্তু নানা কারণেই দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে এ গুরুত্বপূর্ণ সূচক নিম্নমুখী, যা অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। রিজার্ভের স্থিতি ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিলেও সফল হয়নি রিজার্ভ স্থিতি রক্ষায়। এর মধ্যে যদি প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠান তাহলে রিজার্ভের ক্রমশ পতন ঠেকানো আরো কঠিন হবে। অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেবে।
রেমিট্যান্স ছাড়াও দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি উৎস হলো রফতানি আয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি আয়ের অধিকাংশ খরচ হয়ে যায় বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে। ফলে প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় রেমিট্যান্সের তুলনায় অনেক কম। রেমিট্যান্স হিসেবে প্রবাসীরা বিদেশ থেকে যে অর্থ পাঠান তার বিপরীতে দেশের কোনো ব্যয় নেই। তাই প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পুরোটাই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি রিজার্ভ বাড়াতে অবদান রাখে।
তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে ডলার সংকট ও ডলার বিনিময়ের হার নিয়ে দীর্ঘদিন বাজারে অস্থিরতা বজায় ছিল। এছাড়া আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের চেয়ে হুন্ডি মার্কেট বা খুচরা বাজারে ডলারের দাম বেশি হওয়ার সুযোগে বেড়ে যায় হুন্ডি ও হাওলার দৌরাত্ম্য; আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের চেয়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাসে। জুনে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছিল; রেকর্ড ২৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। বিদ্যমান বিনিময় হার অনুসারে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালের একই মাসে ২১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। সে হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাসে রেমিট্যান্সে ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর পুরো অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এখন সংশ্লিষ্টদের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতি ঘিরে যদি প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠান তাহলে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে। আর এমন হলে জুলাইয়ে আসা রেমিট্যান্স হতে পারে চলতি বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এমনিতেও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হুন্ডি ব্যবসার দৌরাত্ম্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অভিমত, হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ সংকটে পড়েছে। অনেকে হুন্ডি ও অর্থ পাচারকে অর্থনীতির জন্য কর্কট রোগ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঘটনাবলি থেকে সৃষ্ট ক্ষোভের কারণে যদি প্রবাসীরা হুন্ডির প্রতি ঝুঁকে পড়েন তাহলে দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানো সহজ হবে না।
দেশ ও দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশী নাগরিকরা সবাই এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এমন পরিস্থিতি বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবেলা করা প্রয়োজন। মানুষের উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা কখনই দেশ ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বয়ে আনে না। এসব বিভাজন ও বিক্ষোভেরই জন্ম দেয় নাগরিকের মনে। বৃহৎ স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এখন সরকারের এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করায় উদ্যোগী হওয়া উচিত। তবেই হয়তো এমন দুর্যোগময় সময় উতরে যাওয়া সম্ভব হবে।










