অধ্যাপক মোহাম্মদ এ. মোমেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) পরিচালক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ থেকে বি.কম ও এম.কম করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেক ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি আইবিএতে যোগদান করেন এবং বর্তমানে আইবিএর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি প্রাইড গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা, উদ্যোক্তা ও পরিচালক। বাংলাদেশে পারিবারিক ব্যবসার নানা চ্যালেঞ্জ, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম
পরিবারভিত্তিক ব্যবসার প্রচলন বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৃহদংশের মূল ভিত্তিও পারিবারিক ব্যবসা। শুরুতে এ ধরনের ব্যবসার বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট জানতে চাই।
অর্থনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহদায়তন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিবার কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। রেনেসাঁ ইউরোপের মেডিচি পরিবার, ১৮ শতকের রথসচাইল্ড পরিবার এবং আজকের পৃথিবীর ওয়ালমার্ট পরিবার এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ব্যবসায়িক আয়ের নিরিখে সবচেয়ে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে ওয়ালমার্ট (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিপার্টমেন্টাল স্টোর চেইন)। ওয়ালমার্ট পরিবারভিত্তিক পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, যার ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ ওয়ালমার্ট পরিবারের হাতে। জার্মানিতে বেশির ভাগ কোম্পানির নাম পরিবারের নামে হয়েছে। যেমন মার্সিডিজ বেঞ্জ নামটি এসেছে মার্সিডিজ পরিবারের নাম থেকে। ব্রুকনার নামে একটি জনপ্রিয় টেক্সটাইল মেশিনারিজ ব্র্যান্ড আছে। ব্রুকনার একটি পরিবারের নাম, যাদের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু ১৯৪৯ সালে জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে কার্ট ব্রুকনারের হাত ধরে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বৃহৎ দেশগুলোর দিকে আজকে যদি তাকাই, পারিবারিক ব্যবসার প্রাধান্যই দেখতে পাই। পরিবারভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের এ প্রাধান্য বা অবদানকে জিডিপি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। যেমন ধরুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৭ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিবারকেন্দ্রিক অথবা পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে জিডিপির ৬৪ শতাংশ আর মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৬২ শতাংশের সংকুলান হয় পারিবারিক ব্যবসার মাধ্যমে। একইভাবে যুক্তরাজ্যে (ব্যক্তি মালিকানাধীন সব ব্যবসার ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ), জার্মানিতে (৯০ শতাংশ), কানাডায় (৬৩ দশমিক ১ শতাংশ) এবং চীনে (৮০ শতাংশ) পারিবারিক ব্যবসার প্রভাব মুখ্য। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ৭৯ শতাংশ ব্যবসা পারিবারিক। প্রায় প্রত্যেক দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে পারিবারিক ব্যবসায়ের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ব্যবসা টিকে আছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও এ ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
আপনি প্রজন্মের কথা বললেন। তৃতীয়, চতুর্থ প্রজন্মের হাত ধরেও পারিবারিক ব্যবসা এগিয়ে যায় এবং সম্প্রসারিত হয়। অথচ বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় প্রজন্মে এসেই উত্তরাধিকার বা অংশীদারদের মধ্যে নানা ধরনের বিরোধ। এ সমস্যার বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
প্রকৃতপক্ষে এ বাস্তবতা উদ্বেগজনক। প্রথম প্রজন্মের একজন উদ্যোক্তা যখন তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, শত বিপত্তি পেরিয়ে, পরিবার-সমাজ-বৈশ্বিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে একটি ব্যবসা দাঁড় করান, তার সামনে স্বপ্ন থাকে তার উত্তরাধিকারীদের হাত ধরে সেই ব্যবসা নতুন নতুন দিগন্তে সম্প্রসারিত হবে, আরো সফলতার মুখ দেখবে। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। আমার উপলব্ধিতে এর মূলে রয়েছে কাঠামোগত সমস্যা।
একটি ব্যবসাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বানাতে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হবে; একটা পর্যায়ের পর, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি সংগঠনের নিজস্ব একটা ধারা থাকে, নিজস্ব একটা ছন্দ বা সংস্কৃতি থাকে। শুরুতে সেই ধারায় কোনো কাঠামো থাকে না। থাকার কথাও নয়। কারণ আদি উদ্যোক্তা ধাপে ধাপে এটাকে গড়েছেন—সৃজনী, সাহস, আর উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে একটি বাধা উতরেছেন, তারপর অগ্রসর হয়েছেন পরের ধাপে। বিপদ ঘটে, যখন কোনো কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার আগেই ব্যবসা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর হয়। আমি বলছি না যে পরবর্তী প্রজন্ম কাঠামো আনার কাজটি নিজেরা করতে পারেন না। অনেকেই পারেন। পেরেছেনও। তবে বাস্তবতা এই যে আদি উদ্যোক্তা যে সংকল্প আর প্রজ্ঞা নিয়ে ব্যবসা গড়ে তোলেন, সন্তান বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তা সমানভাবে থাকে না। চিন্তায়, অভিলাষে পার্থক্য থাকে। থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।
তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কীভাবে হবে? আর তার কাঠামোই বা কীরূপে আনতে হবে? উত্তরটা কিছুটা সহজ। যেসব দেশের উদাহরণ দেখলাম আমরা একটু আগে, সেখানে সব পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই করপোরেশন-ভিত্তিক। হ্যাঁ, নিয়ন্ত্রণ পরিবারের হাতে, মালিকানার সিংহভাগ পরিবারের হাতে। কিন্তু মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক। ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ পেশাদারদের ওপর ন্যস্ত। এ পরিবেশ তৈরি করতে দরকার হবে মালিক পক্ষের মধ্যে সদিচ্ছা এবং শৃঙ্খলা, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রতিষ্ঠানব্যাপী নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সর্বোপরি প্রতিটি ব্যবসা ঘিরে যে মূল্যবোধ, লক্ষ্য, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক আন্তঃসম্পর্ক ওই ব্যবসাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে, সময় নিয়ে, কিছুটা নৈর্ব্যক্তিক বিচারে, আন্তরিক প্রচেষ্টা দিয়ে একটি কাঠামো গড়ে তোলা। পাঠ্যপুস্তক থেকে তুলে এনে ছাঁচে বাঁধা কাঠামো আরোপের চেষ্টা করলে তা টেকসই হবে না বলেই আমার মনে হয়। অন্ততপক্ষে তাই দেখে আসছি আমরা।
একটু পেছনে ফিরে যদি জানতে চাই, একজন আদি উদ্যোক্তার সংগ্রাম আসলে কেমন হয়? ব্যবসাকে কাঠামোগত রূপ দিতে না পারার ক্ষেত্রে তাদের এ সংগ্রাম কোন ভূমিকা রাখে?
আমি মনে করি রাখে। আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা অনেক ধরনের প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে তাদের উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। যে অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে প্রতিটা দিন তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে আমরা সবাই সেই গল্পগুলো জানি না, অনেক সময় আঁচ করতেও পারি না।
আপনাকে একটা উদাহরণ দিই। আমাদের পারিবারিক ব্যবসার ফ্যাক্টরিগুলো যখন তৈরি হয়, মেশিন কেনার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে আমাদের। টাকা দিয়ে সরঞ্জাম কিনব। কিন্তু বিক্রেতাদের রাজি করাতে পারিনি আমাদের কাছে যন্ত্রপাতি বিক্রি করতে। এর কারণ সে সময় কোনো এজেন্সি বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট সিস্টেম ছিল না। মেশিনে কোনো গোলযোগ দেখা দিলে সাপোর্ট সিস্টেমের অভাবে তা সারানো যাবে না, মেশিন প্রস্তুতকারকের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে, এ শঙ্কায় জার্মান এক মেশিন প্রস্তুতকারক আমাদের সরঞ্জাম দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আরো প্রতিবন্ধকতা ছিল। প্রতিবন্ধকতা ছিল নতুন টেকনোলজি আনার ক্ষেত্রে, বাউন্ডারি ওয়াল তৈরিতে, ইউটিলিটি লাইন স্থাপনে—এমন আরো হাজারো কাজে। আর অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় ছিলই, দাপ্তরিক জটিলতা ছিল। একটা সাংঘাতিক বেড়াজালের মধ্যে দাঁড়িয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে।
প্রথম প্রজন্মের সেই আদি-উদ্যোক্তাদের এখন পাওয়া মুশকিল। তবে যদি আপনি দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছেও যান, জানবেন সেসব সংগ্রামের কথা। ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই যদি সবশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে কাঠামো চিন্তার সুযোগ, অবকাশ, সৃজনীশক্তি অবশিষ্ট থাকে সামান্যই।
আজকের জামানায় আমরা উন্নতি করেছি, বিশ্বের দরবারে প্রশংসা পেয়েছি। কী রকম পরিবর্তন এসেছে তা বোঝাতে একটা মজার অভিজ্ঞতা স্মরণ না করে পারছি না। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল মেশিনারি অ্যাসোসিয়েশনের (ইটমা) একটি মেলায় গার্মেন্ট শিল্পে ব্যবহৃত নতুন সরঞ্জামাদি সরজমিনে দেখার জন্য গেলাম। ইয়ার্ন মেশিন দেখতে একটি জার্মান স্টলে ঢুকলাম। ভেতরে সোফার ওপর ঈষৎ আড়মোড়া ভেঙে এক ভদ্রলোক অভিবাদন জানালেন। সোফায় বসেই আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন কোন দেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশ। শোনামাত্র যেন বৈদ্যুতিক শক খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ইয়েস, স্যার! হোয়াট ডু ইউ নিড?”। বাইরের পৃথিবীর চোখে আমাদের ইমেজের এ পরিবর্তন নিঃসন্দেহে গৌরবের। একদিনে বা এক প্রজন্মে তা আসেনি। অগণিত উদ্যোক্তার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এ পরিবর্তন।
তবে বিনিয়োগ, বাজার প্রতিযোগিতা, ব্যবসা সংগঠন প্রক্রিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে যদি লক্ষ করেন, দেখবেন এ পর্যায়ের সংগ্রাম আমাদের তুলনায় তাদের উদ্যোক্তাদের খুব কমই করতে হয়েছে। আমি উদাহরণস্বরূপ ভিয়েতনামের কথা চিন্তা করছি। ট্রেড লাইসেন্স, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রিসাইকেলিং, পেটেন্ট, ফাইন্যান্সিং, ট্রান্সপোর্টেশন, এলসি—আপনি যেখানেই তাকান, উদ্যোক্তারা দ্রুততম সময়ে, স্বচ্ছতার সঙ্গে, বৈশ্বিক মানের সেবা-সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাদের পক্ষে সংগঠনের কাঠামো নিয়ে চিন্তা করা সহজ, নতুন আঙ্গিকে ব্যবসা সাজিয়ে পরের ধাপে অগ্রসর হওয়ার পথ সুগম। একজন বিনিয়োগকারীও যদি এখানে নিরপেক্ষ বিচার করেন, আমাদের পশ্চাৎপদ মনে করবেন। স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক অর্থায়নের প্রবাহ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি এ কারণে।
সবদিক বিবেচনায় আমাদের পারিবারিক ব্যবসাকে কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হলে ব্যবসার ক্ষেত্রে এ বাধাগুলো দূরীভূত করতে হবে। নিজেদের মেধা আর উদ্ভাবনী শক্তি উদ্যোক্তারা যাতে পণ্য বা সেবার মান উন্নয়নে, নতুন বাজার সম্প্রসারণে এবং দেশীয় ব্র্যান্ড সৃষ্টিতে বিনিয়োগ করতে পারেন তার অনুকূল পরিবেশ আনতে হবে।
পেশাদার ব্যবস্থাপনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারিবারিক ব্যবসার মালিক পক্ষ কি ব্যর্থ হয়েছে? আপনার কী মূল্যায়ন?
উদ্যোক্তা স্বপ্নদ্রষ্টা। পেশাদার ব্যবস্থাপক সুচারু বাস্তবায়নকারী। উদ্যোক্তার কার্যপ্রণালি আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা অগোছালো, কারণ সেখানে ঝুঁকি গ্রহণ আর সৃজনশীলতার ভূমিকা মুখ্য। পেশাদার ব্যবস্থাপকের কাজ সুন্দরভাবে ছন্দবদ্ধ, কারণ সেখানে কাঠামোর ওপর ভর করে সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নই প্রধান উদ্দেশ্য। এ দুইয়ের মধ্যে মেলবন্ধন থাকতে হবে। আপনি মালিক পক্ষের ব্যর্থতার কথা বললেন। এভাবে একপেশে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হয়তো ভুল হবে। উদ্যোক্তা আর ব্যবস্থাপকের মধ্যে মেলবন্ধনে দুজনেরই ভূমিকা রয়েছে। যেসব পারিবারিক ব্যবসায় এ মেলবন্ধন সঠিকভাবে হয়নি, সেখানে উভয় পক্ষের দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে আমার মনে হয়।
প্রথমত, আমাদের দেশের তরুণ ব্যবস্থাপকরা ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে পর্যাপ্ত আকর্ষণীয় মনে করছেন না। তাদের লক্ষ্য ও প্রশিক্ষণ কাঠামোবদ্ধ জায়গায় কাজ করার। বিষয়টা অনেকটা সাজানো বাগানে এসে কাজ করার মতো। তারা একটা অনুর্বর জমিকে শ্রম দিয়ে বাগান করতে অনিচ্ছুক। এখানে প্রচেষ্টাগত পার্থক্য রয়েছে। তারা একজন উদ্যোক্তার পরিশ্রম, ভাবনা-অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করেন না। আরো উদ্বেগের বিষয়, তরুণ ব্যবস্থাপকরা বিদেশে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর ফেরত আসেন না। বাংলাদেশে অবস্থিত বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটে। তবে আমাদের পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও অনুরূপ ব্রেইন ড্রেইন হচ্ছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ব্যবস্থাপকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে তার পেছনে লেগে থাকার প্রবণতা লোপ পাচ্ছে। আমাদের পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে তরুণ, বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল ব্যবস্থাপক প্রয়োজন, যারা বিশ্বমানের পেশাদারত্ব দিয়ে এসব ব্যবসাকে এগিয়ে নেবেন দশকের পর দশক ধরে।
অন্যদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন বা পারিবারিক ব্যবসায় ব্যবস্থাপকরা অনেক সময় তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা পাচ্ছেন না। উপরন্তু মালিক পক্ষ তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারায় পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে বা পেশাগত উন্নয়নের প্রশ্নে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক থেকে যাচ্ছে। মোট কথা, পারিবারিক ব্যবসার ক্ষয় ঠেকাতে পেশাদার ব্যবস্থাপক এবং উদ্যোক্তা/মালিক পক্ষের এ মেলবন্ধনে আরো কাজ করতে হবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ব্যবসায় প্রশাসন পড়ানো হয়। সেখান থেকে এক্সিকিউটিভ তৈরি হয়। কিন্তু উদ্যোক্তা তৈরি হয় না তেমন একটা। এটা কেন?
আমি উদ্যোক্তা পরিবারের সন্তান। আমি আমার শিক্ষা-দর্শনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা, উদ্যোগ গ্রহণ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠাকে অনুপ্রেরণা দেয়ার চেষ্টা করেছি। তবে উদ্যোক্তা বলতে আমরা যা বুঝি তা এখন সত্যিকার অর্থে কতটুকু আছে আমার প্রশ্ন জাগে। আমার বাবা যখন সাধারণ একটা ফ্যাক্টরি করেছিলেন, সেটা এক ধরনের ‘স্টার্টআপ’ই ছিল বলা যায়। কিন্তু সেটা তিনি কিছুদিনের মধ্যে আংশিক ভ্যালুয়েশন করে বিক্রি করে দেননি। রাইড শেয়ারিং ব্যবসা ‘উবার’ একদিকে বছরের পর বছর ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, অন্যদিকে তার ভ্যালুয়েশন বেড়েই চলেছে—আমার কাছে বিষয়টি যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি কখনই। ইদানীং ‘স্টার্টআপ’ কালচার প্রসার পাচ্ছে আপনারা জানেন। আমি এর খুঁটিনাটি ভালোভাবে বুঝি না, বলতে পারেন অনেকটা বিশ্বাসও করি না। এখনকার ‘স্টার্টআপ’ উদ্যোক্তাদের মধ্যে তড়িঘড়ি করে কিছু একটা বানিয়ে তার ভ্যালুয়েশন দাঁড় করে বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়ার একটা মানসিকতা আছে। তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে এখন নিজেরা প্রথমে কিছু করার চিন্তা করছে, তাকে আমি সাধুবাদ জানাই। সামনের দিনের প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক, জলবায়ুগত ঝুঁকি মোকাবেলায় আত্মকর্মসংস্থান একটি হাতিয়ার। তবে আমি মনে করি, নতুন ব্যবসা উদ্যমের সঙ্গে লেগে থেকে বড় করা উচিত। প্রযুক্তি থেকেই উদ্ভাবন ও বিভিন্ন ধরনের সেবা হবে এবং নতুন নতুন ব্যবসা গড়ে উঠবে।
এখন কোনো কিছু ইন্টারডিসিপ্লিনারি হওয়া পর্যাপ্ত নয়, বরং মাল্টিডিসিপ্লিনারি হতে হবে। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক বিষয়ের সঙ্গে আরেক বিষয়ের যোগাযোগ এবং গবেষণা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবন ল্যাব, ব্যবসা প্রতিযোগিতা ও বিজনেস ক্লাবের মাধ্যমে ছোট অবস্থা থেকেই ব্যবসা গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দিতে হবে। আমাদের দেশে ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে এবং অত্যন্ত ভালো ও অবিশ্বাস্য ধারণা দিয়ে পুরস্কার অর্জন করে। কিন্তু সে ধারণার বাস্তবায়ন হয় না। সুতরাং শুধু অনুপ্রেরণা দিলেই হবে না, বাস্তবায়নের রূপরেখা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। আর্থিক, ব্যবস্থাপনাগত, আইনগত, প্রযুক্তিগত সহায়তার জোগান দিতে হবে। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে আমরা নতুন এক উদ্যোক্তা শ্রেণীর সূচনা করতে পারি।










