ড. মুহাম্মদ সামাদ শিক্ষাবিদ ও গবেষক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইনোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং অধ্যাপক ছিলেন। ২০০৯ সালে সমাজকর্ম শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ওয়াশিংটনের সিএসডব্লিউই পরিচালিত ‘ক্যাথেরিন ক্যান্ডাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যাল ওয়ার্ক এডুকেশন’-এর ফেলো হিসেবে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্মের উচ্চ শিক্ষার ওপর তুলনামূলক গবেষণা করেন। সম্প্রতি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিদ্যমান নানা অসংগতি, সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

সামাজিক সুরক্ষায় প্রধান তিনটি উপাদান রয়েছে—সামাজিক সহায়তা, সামাজিক বীমা ও শ্রমবাজারমুখী কর্মসূচি। এখন পর্যন্ত এ তিন খাতে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের সরাসরি সুফল কতটুকু আর ছায়ামূল্যের পরিমাণ কত?

সামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার সুদৃঢ় এবং এসবের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। ২০১৫ সালের জুনে সরকার জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএসএস) গ্রহণ করে। এটির লক্ষ্য ছিল সামাজিক সুরক্ষার ওপর সরকারি ব্যয়ের অভিঘাত শক্তিশালী করা এবং মধ্যম আয়ের অর্থনীতির সামাজিক সুরক্ষা সমস্যাগুলো মোকাবেলার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা। কিন্তু জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল ও জাতীয় সামাজিক কৌশল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, তবে সামগ্রিক অগ্রগতি মাঝামাঝি ধরনের। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রাধিকার দেয়া সত্ত্বেও রাজস্ব আয়ের মন্থরগতির কারণে সম্পদের সীমাবন্ধতা তৈরি হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। করোনা এবং পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকটের মধ্যেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সন্তোষজনক অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাথাগুনতি দারিদ্র্যের হার ২০০০ সালের ৫০ শতাংশ থেকে অর্ধেক কমে ২০১৬ সালে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নির্মূলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। কারণ একটি আধুনিক আয়কর পদ্ধতির প্রচলন এবং তার মাধ্যমে আহরিত অর্থ ন্যায়সম্মতভাবে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র ও ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর মধ্যে যথাযথ উপায়ে বিতরণ করা সম্ভব হলে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দারিদ্র্য স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হতে পারে। তাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়গুলো প্রতিরোধ করার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব এ মুহূর্তে সর্বাধিক। 

সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত উপকারভোগীদের সুরক্ষা ও কল্যাণের প্রসার করা। বাংলাদেশ সামাজিক সুরক্ষায় জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশে ব্যয় করে আসছে। তবে এর একটি বড় অংশ (জিডিপির ১%) সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন তহবিলে অর্থায়নের কাজে ব্যবহার হয়। তদুপরি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের সূচকগুলো থেকে বোঝা যায় ব্যবস্থাটি আপাতদৃষ্টিতে কার্যকর নয় এবং ব্যয়সাশ্রয়ীও নয়। ফলস্বরূপ বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আর্থিক মান খুব বেশি নয়। তবে ছায়ামূল্যের হিসাব আমার জানা না থাকলেও তার পরিমাণ যে অবশ্যই বেশি হবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। 

এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কি পর্যাপ্ত বলে মনে হয় আপনার? 

বর্তমান বাজেট থেকে সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকার একটি পৃথক বরাদ্দ দেয়, যা সরকারি কর্মচারীদের পেনশন বাদ দিয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময় জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য সর্বাধিক অগ্রাধিকার হলো এনএসএসএস বাস্তবায়ন। এ লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সামাজিক সুরক্ষা চলাকালে দারিদ্র্যকেন্দ্রিক ব্যয়কে জিডিপির ১ দশমিক ২ থেকে ২ শতাংশে উন্নীত করার প্রক্ষেপণ করেছে।

তদুপরি সরকারি চাকরিতে পেনশনের বিষয়টি বাদ দিলে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণদের মোট সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় পিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। এ ব্যয় একটি দেশের দুই কোটি দরিদ্র ও দারিদ্র্যের কাছাকাছি আরো দুই কোটি (দারিদ্র্যরেখার ১.২৫ গুণ বেশি) লোকের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

জানা যায়, দেশের প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে রয়েছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতায় অনিয়ম ধরা পড়েছে ২৩ শতাংশ। বয়স্ক ভাতায় শর্ত পূরণ করেননি ৫৯ শতাংশ। এসব তথ্য কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আড়ালে দেশের সম্পদের নৈতিক অপচয়ের চিত্র স্পষ্ট করছে? এক্ষেত্রে বণ্টনমূলক জোটের দায় কতটুকু? 

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতাংশ হিসেবে সুবিধাভোগী আওতাভুক্তির পরিমাণ ২০১৫ ও ২০১৮ অর্থবছরে ৩২-৩৪ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়শীল দেশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মাত্র কয়েক বছর ধরে চালু করেছে। সেক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবেই। বর্তমানে অর্থ প্রদানের একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সুবিধাভোগীদের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষার তহবিল হস্তান্তর করা হয়। ২০১৭ সালে সামাজিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়। এতে অর্থ প্রদান পদ্ধতিগুলোর বেশ কয়েকটি ত্রুটি চিহ্নিত হয়েছে। এগুলোর কয়েকটি হলো: ১. তহবিল প্রাপ্তিতে বিলম্ব; ২. সুবিধাভোগীদের জন্য অসুবিধা—সময়, সুযোগ ও অর্থের ভিত্তিতে; ৩, বৃদ্ধ, শারীরিকভাবে অক্ষম, অসুস্থ, সন্তানসহ মা, গর্ভবতী মায়েদের জন্য বাড়তি অসুবিধা; ৪. লেনদেনের উচ্চ ব্যয় (০-২.৫০%); ৫. অর্থ প্রদানে পুনরাবৃত্তি বা জালিয়াতির আশঙ্কা এবং ৬. নগদ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি। এগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস।

উল্লেখ্য, অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৩ থেকে জানা যায়, দেশের পশ্চাৎপদ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধাবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচির জন্য মোট ৭ হাজার ৪৬৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।

এ কার্যক্রম শুরুর আগে মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিতকরণ ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে তাদের মতামত নেয়ার প্রয়োজন আছে কিনা।  উপকারভোগীর তালিকায় স্বচ্ছতা আনতে কী করা যায়?

অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ প্রকৃত ব্যক্তির কাছে তহবিল পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত করেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। উপকারভোগীদের মতামত গ্রহণ অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সিদ্ধান্ত গ্রহণে, পরিকল্পনা প্রণয়নে, বাস্তবায়নে, উপকার বিতরণে ও মূল্যায়নে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে তালিকাসহ সবকিছুতেই স্বচ্ছতা আনা সম্ভব। জানা যায়, উপকারভোগীদের তালিকায় স্বচ্ছতা আনতে সরকার সব পরিবারের জন্য প্রণিধানযোগ্য ডাটাবেজ তৈরির জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে (ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেজ হিসেবে পরিচিত—এনএইচডি)। দরিদ্রদের বাছাই আরো সুচারু করতে প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) মডেলের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্বাচন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এনএইচডি প্রকল্প ২০১৯-এ উল্লিখিত পিএমটি মডেলের মূল লক্ষ্যগুলো হলো: ১, প্রদত্ত সীমিত বাজেটে দরিদ্র ও ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর আওতা সর্বাধিক করা; ২. দরিদ্রদের সর্বজনীন আওতাভুক্ত করার লক্ষ্যের সঙ্গে পদ্ধতিটি সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং ৩. দরিদ্রদের চিহ্নিত করতে ব্যয়-কার্যকর ব্যবস্থা তৈরির মূল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। 

টেকসইভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করতে কর্মক্ষম জনবলের বিকল্প নেই। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় আমরা বেকার ভাতা দিয়ে থাকি। এ ভাতার অন্যতম লক্ষ্য বেকার গোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে সহায়তা করা। আদতে কি তা হচ্ছে? 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এ দেশের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেকার যুবকদের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ’ কর্মসূচি চালু হয়েছে। এ কর্মসূচিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্টার্টআপ প্রোগ্রাম হিসেবে অভিহিত করেছেন। ওই কর্মসূচির আওতায় দুই লাখ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেকার যুবকের মাঝে ঋণ প্রদানের কর্মপরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় গত বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৭৫ উদ্যোক্তার অনুকূলে ২ হাজার ৫৯০ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সীমিত সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব করা হচ্ছে।  

পরিসংখ্যান বলছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে আমাদের বয়স্ক জনসংখ্যা কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। এমন হলে তখন বয়স্ক ভাতা, পেনশন স্কিম বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতে এটি অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সেক্ষেত্রে একই সঙ্গে তাদের সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কেমন পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

বয়সের কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশে এখনো তরুণদের সংখ্যা অধিক। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বয়স্ক জাতির পর্যায়ে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। ৫০ বছর বা তার চেয়েও বেশি বয়সের লোকের সংখ্যা ২০২০ সালে মাত্র এক কোটি থেকে ২০৫০ সালে চার কোটিরও ঊর্ধ্বে পৌঁছে যেতে পারে। সুতরাং পরবর্তী তিন দশকের প্রতিটি সময়ই ১০ মিলিয়ন অতিরিক্ত প্রবীণ নাগরিক এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার নাগরিকদের জন্য বয়স্ক ভাতা ও সর্বজনীন পেনশনের একটি পদ্ধতি পরিচালনা করে আসছে। অন্তর্ভুক্তকরণে সামাজিক পেনশন উল্লেখযোগ্য প্রসার লাভ করেছে। তবে প্রয়োজনীয়তার তুলনায় অন্তর্ভুক্তি এখনো কম এবং হস্তান্তরিত অর্থ প্রদান অপ্রতুল বলে প্রতীয়মান হয়। সেক্ষেত্রে সামাজিক পেনশনের স্কিমের পরিপূরক হিসেবে অবদানমূলক পেনশন স্কিম চালু করা দরকার। অবদানমূলক পেনশন স্কিমগুলোয় অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকসহ বৃহৎ গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। সে লক্ষ্যে ২০২৩ সালে সরকার সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা আইন প্রণয়ন করে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ।

কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি কি বাড়ানো উচিত?

তাত্ত্বিক অর্থে সামাজিক নিরাপত্তা ধারণাটি বলতে বোঝায় সামাজিক বীমা, সামাজিক সাহায্য ও সামাজিক সেবা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবেলা, পরিবহন, যোগাযোগ ইত্যাদি সেবা কার্যক্রমের অনেক কিছুই সামাজিক নিরাপত্তার অন্তর্ভুক্ত।  এরই মধ্যে বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্তকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার উপযোগী দক্ষ জনবল সৃষ্টির লক্ষ্যে মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। যেমন অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, ৬৪টি টিচার্স স্টুডেন্টস সেন্টারের (টিএসসি) সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি।

কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে গত ১০ বছরে ভর্তির হারে অগ্রগতি সাধন হয়েছে। ২০২১ সালে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ছিল ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। 

তবে দেশ ও সমাজের প্রয়োজন এবং পরিবর্তনীয় বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের জন্য শিক্ষাগত পাঠ্যক্রমটি পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা উচিত, যার ভিত্তিতে বাজারের চাহিদা ও কর্মজীবনের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কর্মমুখী শিক্ষা প্রসারে সরকারের প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অবদান রাখতে পারে। যেমন অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও ভাতা প্রদান, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা এবং শিক্ষাজীবন শেষে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য স্বল্প সুদে শিক্ষা ঋণ দেয়া যেতে পারে।