ঢাকাসহ বাংলাদেশের ৪৫টির বেশি জেলার ওপর দিয়ে এখন তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দিনের গড় তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেছে। ফলে তীব্র গরম অনুভূত হওয়ায় সারা দেশেই জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না। তীব্র গরমে যেখানে জনজীবন বিপর্যস্ত, সেখানে প্রসূতি ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর যত্ন হেলাফেলার নয় মোটেও। এ সময়ে তার অস্বস্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে চলমান অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ। ফলে ঝুঁকি বাড়ছে গর্ভবতী ও অনাগত সন্তানের। এ গরমে শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের প্রসূতি নারীরা বেশি ঝুঁকিতে। এ বিষয়ে তারা অসচেতন। এ গরমে তাদের যে বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন সে বিষয়ে তারা গুরুত্ব দেন না। গর্ভবতী ও অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে গ্রামাঞ্চলের নারীদের সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশের তাপমাত্রা গর্ভবতী নারীর শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি বা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর পৌঁছলে রক্তের ভারসাম্যহীন প্রবাহ গর্ভের শিশুর পুষ্টি ও অক্সিজেনে ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে। পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) ও হরমোন পরিবর্তনের (প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন ও অক্সিটোসিন) ভারসাম্যহীনতা অকালে প্রসবের সম্ভাব্য সূত্রপাত ঘটায়। গর্ভবতী নারীর ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা থাকে।

কিন্তু সোমবার যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। আর পঞ্চগড়ের তেতুঁলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। ঢাকায় ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, যা একজন গর্ভবতী নারীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে অনেক বেশি। এ সময়ে তাদের বাড়তি যত্ন নেয়ার প্রয়োজন থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। তাপপ্রবাহের কারণে অন্যদের চেয়ে গর্ভবতী নারীরা বেশি সমস্যায় পড়েন। এ সময় তারা হরমোনাল ভারসাম্যহীনতায় থাকেন। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়। অজ্ঞান হওয়া কিংবা অস্থির হয়ে পড়তে পারেন তারা। তাদের এ সময় খুবই সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। এক্ষেত্রে উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা মোটেই গর্ভবতী স্বাস্থ্যের জন্য সুখকর নয়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) নির্দেশনায় গর্ভধারণের পর থেকে প্রসব পর্যন্ত অন্তত আটবার সেবা নেয়ার কথা বলা আছে। তবে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এ সেবা অন্তত চারবার নেয়ার কথা বলেছে, কিন্তু সেটিও করা হচ্ছে না। গর্ভকালীন উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোনো ধরনের সংক্রমণ দেখা দিলে প্রসব-পূর্ব সেবায় তা ধরা পড়ে। তখন যথাযথ চিকিৎসা দিলে মা সুস্থ হয়ে ওঠেন, গর্ভের সন্তানও ভালো থাকে। এতে অপরিণত ও কম ওজনের শিশুর জন্ম, শিশুর জন্মগত ত্রুটি, নবজাতক মৃত্যু, মৃত শিশুার জন্ম এবং মাতৃমৃত্যু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সম্ভব।

শুধু অন্তঃসত্ত্বা মাকে শুধু সেবা নিলেই হবে না, প্রসব-পূর্ব চারবার সেবার মানের দিকেও বিশেষ নজর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিরাপদ প্রসবের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। চিকিৎসকসহ সেবাদানকারী জনবল ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করতে হবে। 

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), নরওয়ের বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয় ও নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেকোমা পিয়ার্স কাউন্টি স্বাস্থ্য বিভাগের আটজন গবেষক বাংলাদেশে প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা ও প্রসবসেবা নিয়ে ৩ হাজার ২৯৩ গর্ভবতী মায়ের ওপর একটি গবেষণা চালান। গবেষণায় ২০১৮-এর অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত এসব মাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই গবেষণায় দেখা যায়, ৯৮ শতাংশ গর্ভবতী কমপক্ষে একবার প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা নিয়েছিলেন। দু’বার সেবা নেয়ার হার ৯১ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় সেবার পরিমাণ যত বাড়ছে, সেবা নেয়া মায়ের হার তত কমছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তিনবার প্রসব-পূর্ব সেবা নিচ্ছেন ৭৪ শতাংশ নারী এবং চার বা তার বেশিবার সেবা নিয়েছেন ৫২ শতাংশ। তথ্যে পাওয়া যায়, প্রয়োজনীয় প্রসব-পূর্ববর্তী সেবার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন প্রায় অর্ধেক।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ সালের মধ্যে কিছু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রতিশ্রুতি আছে। বলা হয়েছে, প্রশিক্ষিত জনবলের মাধ্যমে প্রসব-পূর্ববর্তী সেবার আওতায় ৯৮ শতাংশ গর্ভবতীকে আনতে হবে। ওই সময়ের মধ্যে দেশের ৯৮ শতাংশ প্রসবকালীন নারীর পাশে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী থাকতে হবে। সেবার মান উন্নত না করলে দেশে মাতৃমৃত্যু কমানো সম্ভব হবে না। ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু কমিয়ে ৭০-এর নিচে আনতে হবে। মানসম্পন্ন মাতৃস্বাস্থ্যসেবা দেয়া বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন লজিস্টিক সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। ঘাটতি জনবল আর জবাবদিহিতায়। 

বিভিন্ন কারণে প্রসব-পূর্ব চারবার সেবা নিতে পারছেন না গর্ভবতী। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে যাতায়াত ও ওষুধপত্র কেনার টাকা না থাকা, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অনাগ্রহ এবং বাড়ি থেকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বেশি দূরত্ব। প্রসূতি ও পরিবারের সদস্যদের তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সচতেনতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা ও নবজাতকের মৃত্যু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য। একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে অন্তত চারবার প্রসব-পূর্ব সেবা দিলে একটি পরিবার সুস্থ একটি শিশু পেতে পারে। ওই মা প্রসবকালীন জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। 

সরকারি হাসপাতালে প্রসব-পূর্ব চারবারের সেবা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রসব-পূর্ব সেবার প্রথম ধাপে যত মা সেবা নেন, তার তুলনায় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে সেবা নেয়ার হার আরো কমতে থাকে।

মাতৃস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসব-পূর্ব সেবা নিতে হবে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে। পাশাপাশি প্রসব হতে হবে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তায়। দুটি ক্ষেত্রেই সমাজের দরিদ্র শ্রেণী পিছিয়ে।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণীর ৩৫ শতাংশ মা প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা পান প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে। সমাজের সবচেয়ে ধনী শ্রেণীর মধ্যে এ হার ৮৮ শতাংশ।

প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তায় প্রসব হলে মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি কম থাকে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বলছে, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণীর মাত্র ১৮ শতাংশ গর্ভবতী প্রসবের সময় প্রশিক্ষিত ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা পান। সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণীর ৮২ শতাংশ মায়ের প্রসবের সময় পাশে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন না। সবচেয়ে ধনী শ্রেণীর ৭৩ শতাংশ মা প্রসবের সময় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা পান। প্রসব-পূর্ববর্তী সেবায় সরকারকে বৈষম্য কমিয়ে আনতেও নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। 

জরিপে আরো বলা হয়েছে, চার বা এর বেশিবার গর্ভকালীন সেবা নেয়ার হার আগের চেয়ে ৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ শতাংশে। চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল, ২০২৩ সালের মধ্যে এ হার ৫০-এ উন্নীত করা। এছাড়া মানসম্মত চার বা এর বেশিবার গর্ভকালীন সেবা পাওয়ার হার মাত্র ২১। এখানে ‘মানসম্মত’ বলতে বলা হয়েছে, চারবার সেবা নেয়ার মধ্যে অন্তত একবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া; ওজন ও রক্তচাপ মাপা; রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা এবং গর্ভকালীন সম্ভাব্য বিপজ্জনক লক্ষণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া। সরকারি হাসপাতালে প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা (এএনসি), প্রসব-পরবর্তী সেবা (পিএনসি) দুটি সেবাই বিনামূল্যের কিন্তু মা ও শিশুর সুরক্ষায় প্রসবের পরের জটিলতা প্রতিরোধে এ সেবা নেয়া উচিত।

প্রসবের আগে ও পরে নিয়ম মেনে সেবা নিতে সবাইকে সচেতন করতে সরকারকে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কাজ করতে হবে। হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে যারা প্রথম প্রসব-পূর্ব সেবা নিতে আসেন, তাদের প্রসব-পরবর্তী সেবার গুরুত্ব বুঝিয়ে সচেতন করার কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোয় যেন মায়েরা মানসম্মত সেবা পান, তাও নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রসবের সময় ঝুঁকি কমাতে বাল্যবিবাহ রোধে উদ্যোগ নিতে হবে।