কাঁচামাল আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তা উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকটে ব্যাংকগুলোয় আমদানি ঋণপত্র এলসি খোলা কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশের শিল্প খাতে সম্পৃক্ত প্রতিটি পণ্যের এলসি খোলা কমেছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও গত বছরের জুলাইয়ে দেশের ব্যাংকগুলোয় পণ্য আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছিল ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন বা ৬৩৫ কোটি ডলারের। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো মাত্র ৪৩৭ কোটি ডলারের নতুন এলসি খুলতে পেরেছে। এ হিসাবে অর্থবছরের প্রথম মাসে ব্যাংকগুলোয় এলসি খোলা কমেছে ৩১ শতাংশেরও বেশি। এর আগে ২০২২ সালের মার্চে রেকর্ড ৯৫১ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। সে সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে নতুন এলসি অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। গত দুই বছর দেশে ডলারের বিপরীতে টাকার অন্তত ২৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। এর মধ্যে গত অর্থবছরে অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে এক বছরে দেশে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামও বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আমদানিনির্ভর পণ্যের মূল্য। এর বিরূপ প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম নিম্নমুখী। অনেক পণ্য ২০২১ ও ২০২২ সালের তুলনায় অর্ধেক মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দেশের বাজারে পণ্যের দামে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় জনগণ দাম কমার সুফল পাচ্ছে না। এ কারণে চেষ্টা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কমছে না। বস্তুত অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যর্থ হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের অভিযোগ।
বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবেলা করতে চাচ্ছে। পাশাপাশি রিজার্ভের ক্ষয় থামানোর চেষ্টাও করছে। তবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করেও রিজার্ভ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, বরং কমে যাচ্ছে। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮০৬ কোটি ডলারে উঠেছিল। এর পর থেকে তা কমতে থাকে। এখনো কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ। এ কারণে রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রেও ৩০-৪০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। আমদানি-রফতানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার ব্যাংকগুলো দিতে না পারায় ও অপ্রয়োজনীয় আমদানির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধের কারণে এখন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছেন। ধারাবাহিকভাবে এ সংকট তীব্রতর হচ্ছে।
এলসি খোলার হার কমে যাওয়া দেশের অর্থনীতি মন্থরগতির দিকে যাচ্ছে এমন ইঙ্গিত দেয়। কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। এতে দেশে বিনিয়োগ কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাবে। বর্তমানে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল চাহিদা সত্ত্বেও ডলার না থাকায় ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না। আবার ব্যাংক এলসি খুলতে না পারায় হুন্ডির বাজার বড় হয়েছে।
ডলার সংকটের কারণে বিলাসপণ্যের পাশাপাশি অনেক জরুরি পণ্যের আমদানিও কমেছে। জরুরি পণ্যের মধ্যে অন্যতম হলো মেডিকেল ডিভাইস ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। এসব পণ্য আমদানির এলসি খোলা থেকে ব্যাংকগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বিরত থাকছে। আমদানি কমায় কোম্পানিগুলোয় চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামালের ব্যাপক সংকট দেখা গেছে। বাজারে ওষুধের সরবরাহ কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিমেন্ট শিল্পের মূল উপাদান ক্লিংকার ও চুনাপাথরের মতো মধ্যবর্তী পণ্যের জন্য এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির এলসির নিষ্পত্তিও কমেছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের দাবি, প্রতিটি খাতেই শিল্প প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ইস্পাত খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলসি খুলতে ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ না কাটলে অনেক শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এলসি খুলতে না পারায় নিয়মিত সরবরাহ চেইন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানি কমে যাওয়ায় দেশের রফতানিমুখী বস্ত্র ও পোশাক খাতে সংকট দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
দেশের অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে আমদানির প্রকৃত চাহিদা কত—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ তথ্য নেই। এদিকে এলসি খোলার ক্ষেত্রে সতর্কতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য আমদানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থ পাচার কমে গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করেছে। ফলস্বরূপ, মোট এলসির পরিমাণও কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত পণ্য আমদানি করেছেন। সেগুলোর স্টক রয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। এক্ষেত্রে দেশের প্রকৃত আমদানি চাহিদা কত সেটি যাচাই করার প্রাসঙ্গিকতাও তৈরি হয়েছে।
এছাড়া ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে পারছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এমনটি বলা হলেও বর্তমানে আমদানিনির্ভর শিল্প ও সেবা খাতের ব্যবসা একেবারেই সংকুচিত হয়ে এসেছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, সার্বিকভাবে অর্থনীতির এ সংকটকালে সঠিক নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই। আমরা প্রত্যাশা করি, সংকটে পথ না হারিয়ে অর্থনীতি ঠিক পথেই অগ্রসর হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের যথোপযুক্ত ভূমিকা কাম্য।










