ছবিটা পরিষ্কার। নির্বাচনের আগে এটাই শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময় প্রণীত হচ্ছে যখন নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও সংকটে বৈশ্বিক অর্থনীতি টালমাটাল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মন্দার হাতছানি, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, চীনের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ধীরগতি, ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আক্রমণে খাদ্যশস্য, সার ও জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং অবরোধ ও পাল্টা অবরোধে সার্বিকভাবে বিশ্বের সব দেশই সমস্যাসংকুল। তাছাড়া এ বছরের ডিসেম্বরে বা আগামী বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে দেশের জাতীয় নির্বাচন। একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে নির্বাচনপূর্ব বাজেট হিসেবে জনতুষ্টির দিকে লক্ষ রেখে এবারের বাজেট প্রণীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা, রেমিট্যান্স কমে যাওয়া, রাজস্ব আয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব সূচক স্বাভাবিক অবস্থায় না ফেরাতে পারলে অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে সন্দেহ নেই। এজন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, রেমিট্যান্স বাড়াতে সব ধরনের পদক্ষেপসহ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। প্রাথমিকভাবে দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কিছুটা সমন্বয় করা হলেও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় সার ও খাদ্যপণ্য আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। সার ও সেচের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যপণ্যের ওপর প্রভাব পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা আশা করি, সময়োপযোগী এবং জনবান্ধব কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উপস্থাপিত হবে আগামী বাজেট। নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দেয়া হচ্ছে। চলতি বাজেটে খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ করা দরকার। এসব আমলে নিয়ে সুপরিকল্পিত বাজেট প্রণয়ন করতে হবে আগামীতে। ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে আনা এবং সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর মতো কর্মসূচি হাতে নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে আগামীতে। এমনিতেই বাড়তি দ্রব্যমূল্য তার ওপর ভর্তুকি কমানোর কারণে আবার যেন বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি জনগণের কষ্টের কারণ না হয় সেদিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে বাজেটে। গত অর্থবছরের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করে আগামী অর্থবছর কেমন হতে যাচ্ছে, সে বিষয়টি মাথায় রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে গতিপ্রকৃতি ঠিক করতে হবে। সামনে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাজেটে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশ কয়েক বছর ধরে ৮-৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজস্ব প্রশাসনের বৈপ্লবিক সংস্কারই পারে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে। সেজন্য জনবল বৃদ্ধি, উপজেলা পর্যন্ত অফিস স্থাপন ও কর আদায় ব্যবস্থার অটোমেশন অপরিহার্য। আইএমএফসহ দেশের অর্থনীতিবিদরা বারবার এ বিষয়ে আলোকপাত করছেন। অবস্থাদৃষ্টে ধারণা করা যায়, একমাত্র দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাই এ কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে। স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০০১ ও ২০১১ সালে এনবিআরের প্রশাসনিক সংস্কারের পর রাজস্ব সংগ্রহে উল্লম্ফন লক্ষ করা গেছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি ব্যতীত স্বনির্ভর বাস্তবমুখী বাজেট প্রণয়ন সম্ভব নয়। প্রতি বছর বাজেট ঘাটতি বাড়ার কারণে সরকারের ঋণগ্রহণও বাড়ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপের সৃষ্টি করছে। খেলাপি ঋণের আধিক্য ও নানা অনিয়মের কারণে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের সামর্থ্য সীমিত। তাছাড়া উন্নয়ন-সহযোগীদের ঋণপ্রাপ্তিতেও আছে ধীরগতি। এ অবস্থায় সম্ভব হলে বাজেটের আকার কাটছাঁট করে ঘাটতি এবং ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরাই হবে যুক্তিযুক্ত। নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে রাখার মধ্যেই রয়েছে বাজেট প্রণয়নের কৃতিত্ব। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আদায়কারী কর্মচারীদের দুর্নীতি রাজস্ব বৃদ্ধির বড় অন্তরায় বলে অনেকে মনে করেন। দুর্নীতি রোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পে কর ফাঁকি রোধে উৎপাদন, কাঁচামাল ব্যবহার ও বিক্রয়ে স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কার্যকর অডিট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
প্রতি বছর বাজেটে যা উন্নয়ন বরাদ্দ থাকে তার সবটা খরচ করা সম্ভব হয় না। এখনো আমাদের বাজেটের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতার জন্য এবং আরো নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্ব হয়। সেজন্য বাজেট বরাদ্দ সুষ্ঠুভাবে খরচ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নযোগ্য এবং আশানুরূপ ফল লাভের সম্ভাবনা থাকে, সরকারের শেষ বর্ষে সে ধরনের নতুন প্রকল্প নেয়া উচিত হবে। তবে চালু প্রকল্প সমাপ্তির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে। এবারের বাজেটে দ্রব্যমূল্য যাতে না বাড়ে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে শুল্ককর বৃদ্ধির ফলে যাতে জনদুর্ভোগ না বাড়ে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল প্রভৃতি আমদানির শুল্ক ও মূসক সহনীয় পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিলাসদ্রব্যসহ ধনীদের ব্যবহার্য দ্রব্যাদিতে শুল্ককর বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আমাদের দেশের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সবটাই বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে ঘটে না, বরং এর পেছনে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর অতি মুনাফাখোরি মনোবৃত্তিই দায়ী। চিনি, চাল, ভোজ্যতেলসহ বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ গুটি কয়েক ব্যবসায়ী গ্রুপের তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে। এ বিষয়ে সরকারি মনিটরিং জোরদার করা দরকার।
২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া নভেল করোনাভাইরাসের কারণে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বমন্দা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকেই কর্ম হারিয়ে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ে। সেজন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আরো নতুন জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন হবে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতে গত বছরের তুলনায় বাজেট বৃদ্ধিরও চিন্তা করতে পারে। তাছাড়া বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মহীনদের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তাদের কর্মসংস্থান করা যেতে পারে। তাছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি ক্রয়ে বিশেষ বরাদ্দ থাকতে পারে যাতে পূর্ণ ক্যাপাসিটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। এতে শিল্প-কারখানা শতভাগ পূর্ণ ক্যাপাসিটিতে চালু থাকলে বাড়তি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে।
কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বর্ধিত বিনিয়োগের প্রয়োজন। শুধু সরকারি বিনিয়োগ নয়, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকার বাজেটে নতুন বিনিয়োগকারীসহ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে বেশ সুবিধা দিচ্ছে। উদ্যোক্তাদের সেগুলোর সদ্ব্যবহার করা উচিত। সরকারকেও লক্ষ রাখতে হবে বাজেটে প্রদত্ত সুবিধাগুলো যেন উদ্যোক্তাদের নাগালের মধ্যে থাকে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেন সেগুলো হারিয়ে না যায়। সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি যাতে বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করে কর্মসংস্থান, জাতীয় আয় ও রাজস্ব বাড়ানো যায়। রফতানি আয় যাতে সময়মতো দেশে আসে সেদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে লক্ষ রাখতে হবে। একইভাবে এ উভয় প্রতিষ্ঠানকে আমদানি-রফতানির ‘ওভার ইনভয়েসিং’ ও ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এবারের বাজেটে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর শাস্তির বিধান করা যেতে পারে। একইভাবে ব্যাংকের ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধেও থাকতে পারে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা।
বিশ্বব্যাপী যে স্ট্যাগফ্লেশন বা উচ্চমূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধি মিলে যে মন্দা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তার উত্তাপ আমাদের অর্থনীতিতেও অনুভূত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলার জন্য আমাদের নিজস্ব পণ্য ও সেবার জোগান বাড়াতেই হবে। বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবে ঘাটতি মোকাবেলার জন্য আরো উদ্ভাবনীমূলক নীতি বাস্তবায়নের কথা ভাবতে হবে। নিশ্চয়ই এ বছরও প্রবৃদ্ধি চাই। তবে তার চেয়েও বেশি চাই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। একই সঙ্গে ‘আয় বুঝে ব্যয়’ করার কৌশলই হতে হবে আসন্ন অর্থবছরের মূলনীতি। এছাড়া যারা মাথাপিছু আয় বাড়ার সুফল তুলনামূলক বেশি পাচ্ছেন সেই অতিধনীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর বেশি করে আদায় করে তা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ একটি রি-ডিস্ট্রিবিউটিভ রাজস্ব নীতি আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। সংকট মোকাবেলার জন্য অর্থবছরের মাঝপথেও নীতি-কৌশল বদলাতে হতে পারে। সে রকম পরিবর্তনের জন্য সব অংশীজনকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে যাদের আয় এরই মধ্যে কমেছে, অনানুষ্ঠানিক খাতের যারা কাজ হারিয়েছেন তাদের পাশে সরকার খাদ্য সহায়তাসহ বাড়তি সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে হাজির থাকবে—এ কথাটি আরো স্পষ্ট করে বলা দরকার।










