মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে আর্থসামাজিক উন্নতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বেরিয়ে দেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে এসেছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক গড় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ অর্জন করেছে বাংলাদেশ, যদিও কভিড মহামারী ২০১৯-২০ সালে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। তার পর থেকে আবার বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মোটামুটি ৭ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ঘোষিত রূপকল্প-২০৪১-এর প্রধান অভীষ্ট হলো, ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান ও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদায় উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের সম্পূর্ণ অবসানসহ উচ্চ আয়ের দেশের মর্যাদায় আসীন হওয়া। সরকার রূপকল্প-২০৪১-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও কর্মসূচিসহ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ প্রণয়ন এবং তারই আলোকে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এর ভিত্তিমূলে রয়েছে দু-দুটি প্রধান অভীষ্ট। তার একটি হলো, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং অন্যটি হলো বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, যেখানে দারিদ্র্য হবে সুদূর অতীতের সাক্ষী। এসডিজি ২০৩০ অর্জনসহ পরিবেশের সুরক্ষা এবং সব নাগরিককে একসঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে উন্নয়নের এ অগ্রযাত্রা।
দেশের অগ্রগতির পেছনে সরকারি, বেসরকারি, সিভিল সোসাইটিসহ সবার ব্যাপক অবদান রয়েছে। দেশের ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী দেশের উন্নয়ন অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। যেকোনো ব্যবসা করতে হলে সিএসএমইদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। বড় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি গঠন করতে হলে রেজিস্ট্রার জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস দপ্তর থেকে রেজিস্ট্রেশন নিতে হয়। সম্ভবত শুরু থেকেই ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ছিল এক বছর এবং বছরভিত্তিক তা নবায়ন করতে হতো। তবে দীর্ঘদিন থেকেই ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে একটি দাবি ছিল ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ন্যূনপক্ষে পাঁচ বছর করতে হবে। অবশেষে সে দাবি পূরণ হয়েছে অর্থাৎ ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর করা হয়েছে। তবে সব ট্রেড লাইসেন্সই পাঁচ বছর মেয়াদি হবে বিষয়টি ঠিক তেমন নয়, বরং সর্বোচ পাঁচ বছর মেয়াদি হতে পারে। বিষয়টি খোলসা করা দরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারীকৃত পরিপত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর বার্ষিক কর/ফির বিদ্যমান হার অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য কর/ফি আদায় করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা যাবে। অর্থাৎ কোনো ব্যবসায়ী চাইলেই এক থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স পেতে পারেন।
দেশের সর্বোচ্চ ব্যবসায়ী ফোরাম এফবিসিসিআই থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত যেকোনো আলোচনাতেই ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদের বিষয়টি আলোচনায় আসত। এর কারণ হলো, ট্রেড লাইসেন্স পেতে এবং নবায়ন করতে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি পোহাতে হতো বলে বরাবরই একটি অভিযোগ ছিল। আর তা হলো, একে তো এক বছর মেয়াদি এবং ট্রেড লাইসেন্স পেতে ও নবায়ন করতে ফি বছরই প্রায় দৌড়ঝাঁপ করতে হতো। বছর মেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে লাইসেন্স দেয়ার দাবির পেছনে যুক্তি হলো, মহামূল্যবান পাসপোর্ট যদি ৫-১০ বছর মেয়াদে দেয়া যায় তবে ট্রেড লাইসেন্স দীর্ঘমেয়াদে দিতে অসুবিধা কোথায়। অবশেষে সম্প্রতি দীর্ঘমেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর উদ্যোগ নেয়ায় সরকারের প্রতি সমগ্র ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রকৃতপক্ষে সম্প্রতি কথাটি বলা বোধ হয় পুরোপুরি ঠিক হচ্ছে না আবার ভুলও বলা যাচ্ছে না। তার কারণ হলো, সিটি করপোরেশন আদর্শ কর তফসিল ২০১৬ এর ১০ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘ট্রেড লাইসেন্স ফি বৎসরভিত্তিক একত্রে সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বৎসর মেয়াদে আদায়যোগ্য হইবে এবং উক্ত সময়ে আদায়যোগ্য ফি এর পরিমাণ কম বা বেশি হইলে উহা পরবর্তীতে সমন্বয়যোগ্য হইবে।’ সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৬ সাল থেকেই পাঁচ বছর মেয়াদে করা যেত। তবে ওই কর তফসিল কার্যকরের কোনো উদ্যোগ বা সে অনুসারে দীর্ঘমেয়াদ-ভিত্তিক ট্রেড লাইসেন্স কোথাও ইস্যু করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আসলে ওই কর তফসিল কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ তখন নেয়া হয়নি।
গত দেড়-দুই বছরের বিভিন্ন সভা/সেমিনার/ওয়ার্কশপে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়েছে এবং সবারই বক্তব্য ছিল ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর করা উচিত। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এফবিসিসিআই, এসএমই ফাউন্ডেশন, ডিসিসিআইসহ অন্যান্য ট্রেডবডি অ্যাসোসিয়েশনও এ বিষয়ে অত্যন্ত জোরালো দাবি উত্থাপন করেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে ওই প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগের নজরে এনেছে এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি (সর্বোচ্চ পাঁচ বছর) ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ১২/১০/২০২২ তারিখের ১১৬৩ নং স্মারকে সব সিটি করপোরেশন এবং গত ৩০ মার্চ ২০২৩ তারিখের ৫৩০ নং পরিপত্রের মাধ্যমে সব পৌরসভাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে ১৭ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে ৩৭৩ নং স্মারকের মাধ্যমে সব ইউনিয়ন পরিষদকে এ বিষয় কার্যকরের জন্য সব জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেছে। আমরা প্রত্যাশা করছি, জেলা প্রশাসকরা এরই মধ্যে তার অধিক্ষেত্রের সব ইউনিয়ন পরিষদকে বিষয়টি অবহিত করেছে এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
মোদ্দা কথা হলো, আলোচ্য পরিপত্র বা স্মারক ইস্যুর মাধ্যমে সব সিটি করপোরেশন/পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ এক থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু এবং নবায়ন করতে পারবে। যেকোনো ব্যবসায়ী চাইলেই তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদে নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু অথবা বিদ্যমান ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে পারবেন। সরকারের এ উদ্যোগের ফলে নতুন ব্যবসা শুরু এবং বিদ্যমান ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স-সংক্রান্ত জটিলতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে বলে মনে করছি। বহুদিনের দাবি পূরণ করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করার নির্দেশনা দেয়ায় সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রাসঙ্গিকক্রমে উল্লেখ্য, পরীক্ষা করে দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন থেকে যেসব ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয় যেগুলো দেখতে একেকটি একেক রকম এবং তথ্যেরও ভিন্নতা রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ একই ধরনের আবেদন, ট্রেড লাইসেন্স ফরম্যাট ব্যবহার করার তাগিদ দিয়েছে। দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ একসঙ্গে বসে একই ধরনের আবেদন ফরম ও ফরম্যাট প্রণয়ন করবে এটা বাস্তবসম্মত নয়। স্থানীয় সরকার বিভাগকেই কেন্দ্রীয়ভাবে এ কাজ করার অনুরোধ জানানো হলো। সরকার নির্ধারণ করে দিলেই কেবল দেশের সব সিটি করপোরেশন/পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের জন্য অভিন্ন ও নির্ধারিত আবেদনপত্র এবং অভিন্ন ট্রেড লাইসেন্স ফরমেট অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাংক প্রণীত ব্যবসা সহজীকরণ (ইজ অব ডুইং বিজনেস) সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম অবস্থানে রয়েছে, যা দু-তিন বছর আগেও ১৭৬তম অবস্থানে ছিল। অর্থাৎ ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ১০ ধাপ এগিয়েছে। এটি অত্যন্ত ভালো লক্ষণ। ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য করা আরো সহজ হবে এবং ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করা সহজ হলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তথা রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নের পথ আরো প্রশস্ত হবে।
ড. মো. মফিজুর রহমান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক
এসএমই ফাউন্ডেশন










