দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট চলমান দীর্ঘদিন ধরে। গত বছরের ৩০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্বাহী বোর্ডের সভায় বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন হয়। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ পাবে বাংলাদেশ। তবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ ঋণ কর্মসূচি চলাকালীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের শর্ত পরিপালন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দেয় সংস্থাটি। শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আইএমএফের বেঁধে দেয়া নিট রিজার্ভ মানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, নিট রিজার্ভ ছাড়া আইএমএফের সব শর্তই পূরণ করেছে বাংলাদেশ। গত ডিসেম্বর ও মার্চে পরপর দুই প্রান্তিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর ও জানুয়ারি-মার্চ) শেষে সংস্থাটির সংশোধিত লক্ষ্য অনুযায়ী রিজার্ভ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশ এ ঋণ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে কখনই আইএমএফের লক্ষ্য অনুযায়ী রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে না পারলেও ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া আইএমএফের রিভিউ মিশনে আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে রফতানির অপ্রত্যাবাসিত অর্থ। এ প্রাক্কলন বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত দুই দশকের বেশি সময় (২০০১-০২ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর) অধিকাংশ অর্থবছরেই আর্থিক হিসাবের (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। যদিও গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) দেশের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে দেখা গেছে বড় অংকের ঘাটতি। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এ ঘাটতি আরো বেড়েছে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে ট্রেড ক্রেডিটের নিট ঘাটতি। সংশ্লিষ্টদের মতে, মূলত রফতানির বড় অংকের অর্থ অপ্রত্যাবাসিত থেকে যাওয়ার কারণেই ট্রেড ক্রেডিটের ঘাটতি বাড়ছে। ফলে আর্থিক হিসাবের ঘাটতিও বেড়েছে। তাই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ছাপিয়ে আলোচনার মূল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে রফতানিতে বড় অংকের অপ্রত্যাবাসিত অর্থ।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয় মূলত দুটি খাত থেকে—প্রবাসী আয় ও রফতানি আয়। এ অবস্থা্য় বলা যায়, রফতানি আয় যদি দেশে প্রত্যাবাসিত না হয় তাহলে রিজার্ভ বাড়ানো প্রায় অসম্ভব। আবার অপ্রত্যাবাসিত অর্থের কারণে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি আরো স্ফীত হতে থাকবে। বলা বাহুল্য, এ হিসাবে ঘাটতি তৈরি হলে দেশের রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়ে। আর্থিক হিসাবের ঘাটতি পূরণে রফতানি আয়ের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা তাই অতীব জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
দেশে রফতানির অপ্রত্যাবাসিত অর্থের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। তবে এরই মধ্যে রফতানির অর্থ অপ্রত্যাবাসনের পরিমাণ স্ফীত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকারের বেশকিছু সংস্থা ও মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি কমিটি করা হয়েছিল। সম্প্রতি এ কমিটি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে। গত মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কর্মকর্তাদের নিয়ে এ বিষয়ে একটি কমিটি করেছে অর্থ বিভাগ। ৮ এপ্রিল এ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রফতানি আয় কেন যথাযথভাবে প্রত্যাবাসিত হচ্ছে না, সমন্বিতভাবে এ কমিটির উচিত তা খতিয়ে দেখা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তার আগে নিশ্চিত করতে হবে রফতানি তথ্যের প্রকৃত চিত্র।
দেশের রফতানি আয় নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রয়েছে ভিন্ন তথ্য। ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২-২৩ অর্থবছরের রফতানি নিয়ে যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তার পার্থক্য প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বা ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে গত অর্থবছরে বিশ্ববাজারে ৫ হাজার ৫৫৫ কোটি বা সাড়ে ৫৫ বিলিয়নের বেশি ডলারের পণ্য রফতানি হয়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, একই সময়ে রফতানি বাবদ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৩৫৭ কোটি ২০ লাখ বা সাড়ে ৪৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। পণ্য রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের এ পার্থক্য প্রতি বছরই বাড়ছে কিন্তু পরিসংখ্যানগত তথ্যের এ অসংগতির দায় সংশ্লিষ্ট কেউ নিতে চায় না। এ দায় এড়িয়ে গেলে রফতানি আয় প্রত্যাবাসন বাড়ানো সম্ভব হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। এক্ষেত্রে ইপিবি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিতভাবে কাজ করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) ও আর্থিক হিসাবের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি পরিসংখ্যানের পার্থক্য। আইএমএফের মতে, এ পরিসংখ্যানগত অসংগতির পেছনে অর্থ পাচারের মতো বিষয়গুলোর ভূমিকা থাকতে পারে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অর্থ পাচার রোধেও রফতানির অর্থ প্রত্যাবাসন দরকার।
সামগ্রিকভাবে এ সমস্যা নিরসন না হলে তা আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। রফতানিকারকরা ব্যবসার আয় দিয়েই তাদের ব্যবসার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করে থাকেন। ফলে তারা কেন ডলার আনছেন না, সেটির প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখা দরকার। আসলেই তারা ডলার আনছেন না, নাকি বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনছেন তা দেখতে হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস জুলাই-সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। ধারণা করা যায়, অপ্রত্যাবাসিত অর্থ ডলার সংকটের তীব্রতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে রফতানি হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে আয় দেশে আনতে হয়। না হলে নতুন করে ওই রফতানিকারকের ঋণপত্র (এলসি) খুলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর রফতানি আয় ১২০ দিনের মধ্যে দেশে না এলে তা অর্থ পাচার হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ে কঠোর হওয়া জরুরি। রফতানি আয় দেশে ফিরে এলে রিজার্ভ বাড়বে, আর্থিক হিসাবের ঘাটতি দূর করাও সহজ হবে।










