বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত বাংলাদেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। অথচ দেশটি এর ভুক্তভোগী। এই চ্যালেঞ্জসহ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে কাজ করতে হবে। চলতি মৌসুমের তাপমাত্রা এরই মধ্যে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার উত্তাপ ছড়িয়েছে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। সড়ক-মহাসড়কের কোথাও কোথাও পিচ গলে গেছে। জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষের জীবন প্রায় ওষ্ঠাগত। একই সঙ্গে প্রাণিকুলেরও। এ সময় দেশের প্রাণিসম্পদ বিশেষ করে দুগ্ধখামারিরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাপপ্রবাহের কারণে সবুজ ঘাস মরে যাচ্ছে। সংকট দেখা দিয়েছে ঘাসের। গরুর খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। তাপপ্রবাহ থেকে গরুকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখতে খামারিদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। একদিকে বেড়েছে ব্যয়। অন্যদিকে কমেছে দুগ্ধ উৎপাদন। ফলে খামারিরা আর্থিকভাবেও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। 

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ না হয়েও এর নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। উন্নত বিশ্বের নানা পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। এ কারণে বাংলাদেশ নিয়মিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-জলোচ্ছ্বাস, সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, প্রবল বায়ুপ্রবাহ, বন্যা ও খরা প্রভৃতি কারণে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। 

সিরাজগঞ্জ ও পাবনা থেকে দেশে উৎপাদিত দুধের বড় অংশ আসে। বিস্তীর্ণ চারণভূমি ও উচ্চ উৎপাদনশীল বিভিন্ন জাতের গরুর আধিক্য থাকায় এ দুধ উৎপাদনে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। দেশে চলমান তাপপ্রবাহের কারণে এ দুই অঞ্চলেই দুধ উৎপাদন কমেছে।

গরমে কাঁচা ঘাস না থাকায় ও গবাদিপশু স্বাভাবিক খাবার খেতে না পারায় দুধ উৎপাদন কমেছে। তীব্র গরমে গরু মারা যাচ্ছে। নদীর পাশে যেসব খামার রয়েছে, তারা সহজেই পানি পাচ্ছে। যারা বাড়িতে খামার করেছে, সেসব খামারে গরুর উপযোগী তাপমাত্রা বজায় রাখতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। মিল্ক ভিটা সূত্র বলছে, মিল্ক ভিটার লক্ষ্য প্রতিদিন গড়ে ৯০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা। তবে প্রচণ্ড গরমের কারণে খামারিরা ৫০-৫২ হাজার লিটারের বেশি দুধ সরবরাহ করতে পারছেন না। ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন খামারিরা। 

প্রাণিসম্পদ খাতে খামারিরা তাপপ্রবাহের মতো চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতির মুখে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। তাদের সহায়তায় ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে। 

অতীতে দুধ, ডিম ও গরু আমদানি করা হতো। দেশ এখন সেই অবস্থায় নেই। মাছ, দুধ, ডিম ও মাংসে দেশ সমৃদ্ধ। আমদানির প্রয়োজন পড়ে না। অতীতে ভারতের গরু আমদানি ছাড়া কোরবানি হতো না। এখন আমদানি করতে হয় না, বরং দেশী গরুতে কোরবানি দেয়ার পর উদ্বৃত্ত থেকে যায়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে জানিয়েছে, আগামী কোরবানি ঈদে ১ কোটি ৩০ লাখ গরু প্রস্তুত রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, ভারতীয় গরু আমদানির প্রয়োজন নেই। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে মৎস্য, পোলট্রি ও ডেইরি শিল্প কঠিন সংকটে পড়েছে। 

আবহাওয়াবিদরা এরই মধ্যে পূর্বাভাস দিয়ে বলেছেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে দেশে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হতে পারে। ফলে চলমান তাপপ্রবাহের বিপর্যয়ের মধ্যেই খাতগুলো আরেকটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সুরক্ষার আগাম পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশী শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। 

পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কোনো দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ এলাকায় বনভূমি রয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন। বাংলাদেশে যে পরিমাণ বনভূমি রয়েছে তা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। বনভূমির পরিমাণ ২৫ শতাংশ বা তার কাছাকাছি রাখা না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা কঠিন হয়ে পড়বে। বনভূমি সম্প্রসারণ ও গাছ লাগাতে সরকার, বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশকে রক্ষা করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। 

তাই দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দেশের সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণসহ ব্যাপকভাবে গাছ লাগাতে হবে। এসব বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হলে জলবায়ুর পরিবর্তনে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশ তথা প্রাণিসম্পদ রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়। 

কিছু প্রতিরোধ বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেসব বনাঞ্চল বিলুপ্ত হয়েছে সেসব বনাঞ্চল পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়াও উপকূলীয় বনায়ন পরিকল্পনা, পার্বত্য চট্টগ্রামের অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চলের বনায়ন সম্প্রসারণ, দেশের নদ-নদী খাল উদ্ধার ও পুনঃখননে উদ্যোগ নিতে হবে। ছোট-বড় পাহাড় রক্ষার পরিবেশ আইন কার্যকর করতে হবে।

আমরা বিশ্বায়নের যুগে বাস করছি, তাই কাউকে পেছনে ফেলে এককভাবে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগ, সহযোগিতা, কারিগরি সহায়তা কৃষি খাতে অব্যাহত রাখতে হবে। কারিগরি সহযোগিতা, গবেষণা ও যৌথভাবে কাজ করার জন্য দেশে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

দেশের জনসাধারণ তাদের খাদ্য ও পুষ্টির জন্য কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার পূরণে সরকারের দায়িত্ব। এ খাতের উন্নয়নে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। খরা ও তাপমাত্রার ক্রমবৃদ্ধির কারণে বহু প্রজাতির ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আবার আগাছা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়চ্ছে। অঞ্চলভেদে মাটির উপাদানে তারতম্য ঘটছে। ফলে ফসলের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বোরো উৎপাদনে প্রচুর সেচের পানির প্রয়োজন পড়ে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমিগুলোয় লবণাক্ততার কারণে সেচেও বিপত্তি ঘটছে। আবার লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে চিংড়ি চাষেও ধস নেমেছে।

উত্তরাঞ্চলে সেচের পানিতে আরেক বিপত্তি ঘটছে। সেখানকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি হওয়ায় ফসলের মাধ্যমে তা মানবদেহে প্রবেশ করছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত পানি ফসলের খেতে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ কারণে ফসল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার নিচে নেমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, জলবায়ুর পরিবর্তন রোধ করা না গেলে শুধু দেশের নিম্নাঞ্চলই প্লাবিত হবে না, মরুকরণ ঝুঁকিতেও পড়বে দেশ। অন্যদিকে এর প্রভাব পড়বে আমাদের বনজ ও কৃষিজ সম্পদের ওপরও। এ পরিস্থিতি সামাল দেয়া অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

নদী দূষণ রোধ এবং নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশের আনাচে-কানাচে বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। আগ্রাসী গাছগুলো কেটে ফেলতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ দূষণ বা বায়ুদূষণ ঘটে এমন ধরনের কাজকর্ম থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে প্রামাণ্যচিত্রসহ আমাদের দাবি তুলে ধরতে হবে। রাতারাতি জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব না হলেও কিছুটা উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট ঝুঁকি ও বিপর্যয় মোকাবেলায় দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তা কমানো যাচ্ছে না। হয়তো দ্রুত কমানো সম্ভবও নয়। কিন্তু সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সবার আরো বেশি দায়িত্বশীল আচরণ ও সচেতনতা কাম্য। তা না হলে সমূহ বিপদ কমে আসার পরিবর্তে দিন দিন বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।