পাট আঁশের গুণাগুণ মূলত পাট পচনের ওপর নির্ভরশীল। উন্মুক্ত জলাশয়, যেমন পুকুর বা নদীর পানি পাট পচনের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। ২০২৩ সালে এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত খরা ও কম বৃষ্টিপাতের ফলে বাংলাদেশের কৃষকরা সঠিকভাবে পাট পচাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তার পরও পাটের গুণমানসম্পন্ন আঁশ পেতে হলে পাট কাটার পর বাড়ির আশপাশের পুকুর, নদী বা রাস্তার পাশের নালা ও ডোবায় পাট পচাতে হবে। পাটের বয়স ১০০-১১০ দিনের মধ্যে হলেই পাট গাছ কর্তনের পর চিকন ও মোটা গাছ বাছাই করে আলাদাভাবে আঁটি (৮-১০ কেজি ওজনের) বাঁধতে হবে। পাট কাটার পর পাতা ঝরানোর জন্য তিন-চারদিনের জন্য জমিতে পাটগাছগুলো লম্বালম্বিভাবে স্তূপ করে রাখতে হয়। পাতা ঝরানোর পর নিকটবর্তী জলাশয়ে পাট গাছের বান্ডিলের তিন-চারটি স্তর/লেয়ার দিয়ে লম্বালম্বি বা ত্রিভুজ আকৃতির জাগ তৈরি করতে হবে। এরপর কচুরিপানা, খড় দিয়ে জাগ ঢেকে দিতে হবে। আবার পলিথিন দিয়ে জাগ ঢেকে দিয়ে তার ওপর মাটি ভর্তি প্লাস্টিকের ব্যাগ বা পানি ভর্তি পলিথিন ব্যাগকে ভার হিসেবে ব্যবহার করে পাটের জাগকে পানিতে ডুবানো যেতে পারে। পাটের জাগে কখনই সরাসরি কলাগাছ ও মাটি ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এতে কলাগাছের ট্যানিন ও মাটির আয়রন মিলিতভাবে পাট আঁশের রঙকে কালো করে ফেলে। পাটের পচন ত্বরান্বিত করার জন্য জাগে প্রতি টন বা এক হাজার কেজি পাট গাছের জন্য ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে। সাত-আটদিন পর থেকে পাটের গাছকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যখন পাটগাছের পচন ভালোভাবে সম্পন্ন হবে তখনই পাট আঁশকে ছাড়িয়ে নিয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে যেন কোনো রকম পচা ছাল, ভাঙা পাট খড়ি, অন্য কোনো ময়লা, কাদা ইত্যাদি আঁশের গায়ে লেগে না থাকে। ধৌত করা আঁশ মাটিতে না শুকিয়ে বাঁশের আড়ায় বা ঘরের চালে বা ব্রিজের রেলিংয়ে আঁশকে বিছিয়ে দিয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে বাজারজাত বা গুদামজাত করতে হবে। 

তবে পাট পচন পানির অভাব প্রকট আকার ধারণ করলে সেক্ষেত্রে স্বল্প পানিতে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচানো যেতে পারে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পুরো পাটগাছ না পচিয়ে কাঁচা গাছ হতে ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে সেই ছাল আগে থেকে তৈরি করা পলিথিন বিছানো মাটির গর্তে বা পাকা ট্যাংকে বা চাড়িতে রাখা পানিতে পচাতে হবে। এক্ষেত্রে ১০৫-১১০ দিন বয়সী পাট গাছ কেটে কাল বিলম্ব না করে ডাবল রোলার বা পাওয়ার জুট রিবনারের সাহায্যে পাটগাছ থেকে ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে ছালের বান্ডিলগুলো সিমেন্টের চাড়িতে/বড় ড্রাম বা মাটির গর্তে পলিথিন ব্যবহার করে জাগ দিতে হবে। তোষা পাটের চেয়ে কেনাফ ও দেশী পাটের ছাল গাছ কর্তনের ২-৩ ঘণ্টা পরও অতি সহজেই ছাড়ানো যায়। সাধারণত প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে উৎপাদিত পাটের ছাল পচানোর জন্য ৬ মি. × ২ মি. × ১ মি. (দৈর্ঘ্য × প্রস্থ × উচ্চতা) বা (১২ হাত × ৪ হাত × ২ হাত) আকারের বা প্রয়োজনমতো গর্ত করে পলিথিন দিয়ে গর্তের তলা, চারপার্শ্ব ও কিনারা ভালোভাবে ঢেকে দিতে হবে। তারপর পাটের কাঁচা ছালগুলো গর্তের পানিতে রেখে কচুরিপানা/চট/খড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কিছু পাট পচন পানি এবং প্রয়োজনে এক হাজার কেজি ছালের জন্য ২০০-২৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার পানিতে মিশিয়ে দিলে পাটের পচন ত্বরান্বিত হয়। পানি শুকিয়ে গেলে গর্তে অতিরিক্ত পানি দিতে হবে। সাধারণত ১২-১৫ দিনের মধ্যে পচন সম্পন্ন হয়। পাট ছালের পচন সম্পন্ন হলে আঁশগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিয়ে বাঁশের আড়ায় বা ঘরের চালে বা ব্রিজের রেলিংয়ে আঁশকে ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে বাজারজাত বা গুদামজাত করতে হবে। 

পাট পচনের রিবন রেটিং প্রযুক্তি ব্যবহারে করণীয়:

 যেসব এলাকায় পাট পচন পানির সমস্যা আছে শুধু সেসব এলাকার জন্য এ প্রযুক্তি প্রযোজ্য। 

 পাট পচন পানিস্বল্প এলাকায় কেনাফ ও দেশী পাটের চাষ করুন।

 পাট চাষে অনুমোদিত মাত্রার ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি ও জিপসাম সার ব্যবহার করলে পাটের রিবনিং ভালো হয়।

 পাটখেতে রস না থাকলে পাট কর্তন ও রিবনিং করার অন্তত একদিন আগে জমিতে হালকা সেচ দিতে হবে। পাট গাছে পর্যাপ্ত রস না থাকলে ছাল ছাড়াতে বা রিবনিং করতে সমস্যা হয়। 

 দেশী, তোষা ও কেনাফ ফসলের বয়স ১০৫-১১০ দিন হলে পাট কাটতে হবে।

 পাট কাটার পর পাতা ঝরিয়ে নিন অথবা আগা থেকে ছয়-নয় ইঞ্চি পরিমাণ মাথা কেটে দিলে পাতা ঝরানোর প্রয়োজন হয় না।

 পাটগাছের গোড়ার তিন-চার ইঞ্চি পরিমাণ অংশ বাঁশের মুগুর বা হাতুড়ি দিয়ে থেঁতলিয়ে রিবনারের সাহায্যে একসঙ্গে ছয়-আটটি পাটগাছের ছাল ছাড়িয়ে নিন। 

 প্রতি বিঘায় পাট ছালের পরিমাণ তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার কেজি হতে পারে এবং পচনের জন্য আট-নয় হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। প্রতি বিঘায় ৪০০-৪৫০ কেজি উন্নতমানের পাট আঁশ পাওয়া যায়।

 প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে উৎপাদিত পাটের ছাল পচানোর জন্য একটি গর্ত (১২ হাত × ৪ হাত × ২ হাত সাইজ বা প্রয়োজনমতো) করতে হবে এবং পলিথিন দিয়ে গর্তের তলা ও কিনারা ভালোভাবে ঢেকে দিতে হবে।

 ছড়ানো ছালগুলো বান্ডিল বাঁধুন যেন পাট ধোয়ার সময় শ্রমিক সাশ্রয় হয়। ছালের বান্ডিলগুলো পুকুরে, ডোবায়, মাটি/সিমেন্টের চাড়িতে/বড় ড্রাম বা মাটির গর্তে পলিথিন ব্যবহার করে জাগ দিন।

 পাটের কাঁচা ছাল গর্তে বা পানিতে রেখে কচুরিপানা/চট/খড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

 পানির তাপমাত্রা ও অণুজীবের উপস্থিতির ওপর পচন সময় নির্ভর করে। সাধারণত ১২-১৫ দিনের মধ্যে পচন সম্পন্ন হয়। পানি শুকিয়ে গেলে গর্তে অতিরিক্ত পানি দিতে হবে।

 ছালের পচন ক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য গর্তের পানিতে কিছু পাট পচন পানি দিতে হবে। প্রয়োজনে এক হাজার কেজি ছালের জন্য ২০০-২৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার মিশিয়ে দিতে হবে।

 পচনকৃত ছাল মাটির/সিমেন্টের বড় চাড়ি বা ড্রামে রক্ষিত পানি অথবা পুকুরের পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে আঁশ সংগ্রহ করা যেতে পারে। তাছাড়া চাতাল কলে পাশাপাশি নির্মীত পাকা হাউজ দুটির একটিতে ছালের পচন ও অন্যটিতে পচনকৃত ছাল ধোয়ার কাজ সহজেই করা যেতে পারে। 

 ধোয়ার পর পাট আঁশকে অবশ্যই বাঁশের আড়ানী, টিনের চাল বা ব্রিজের রেলিংয়ে শুকাতে হবে। 

 প্রতি কেজি ছালের জন্য আড়াই থেকে তিন লিটার পানির প্রয়োজন হয়। আবার প্রয়োজনে অতিরিক্ত পানি লাগতে পারে।

অত্যাবশ্যকীয় করণীয়: 

 পাট পচনের এটি একটি আপৎকালীন প্রযুক্তি।

 পাট চাষে অনুমোদিত মাত্রার ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি ও জিপসাম সার ব্যবহার করতে হবে।

 পানির অভাবজনিত কারণে পাট পচনের জন্য বহু দূরে ভ্যান গাড়ি বা মাথা দিয়ে পাটগাছ বহনের চেয়ে জমির আইলের পাশে গর্ত করে এ পদ্ধতিতে পাট পচানো লাভজনক।

 পাট কাটার সঙ্গে সঙ্গে ‘ছালকরণ’ করতে হবে। রোদে পাটগাছ শুকিয়ে গেলে ‘ছালকরণ’ সমস্যা হবে। সম্ভব হলে মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করুন।

 পাট কাটার ১২-১৫ দিন আগে গর্ত করে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করুন।

 গর্তের চারপাশ মাটি দিয়ে উঁচু করতে হবে যাতে বাইরের ময়লা পানি গর্তে প্রবেশ না করে।

 অতিবৃষ্টিতে গর্তের পানি যাতে উপচে না পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

রিবন রেটিং পদ্ধতির সুবিধা: এতে পাট পচনের জন্য কম পানির প্রয়োজন হয়, কম জায়গা ও অল্প সময়ের প্রয়োজন হয়। পচন ব্যবস্থাটি স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব। পাট আঁশের মান এক গ্রেড উন্নত হয়। ভালো আঁশে বেশি মূল্য পাওয়া যায় এবং পাটখড়িগুলো শক্ত থাকে, জ্বালানি হিসেবে এবং বিভিন্ন কাজের ব্যবহারে অধিকতর সুবিধাজনক ও টেকসই হয়।

পাটের আঁশের শ্যামলা রঙ দূরীকরণ ও পাট আঁশের মানোন্নয়ন

বিশ্বে শুধু উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন পাট আঁশের চাহিদা বেশি, কিন্তু গত দুই দশক থেকে পাট পচন পানির অভাবে বাংলাদেশের পাটের মান ক্রমে নিম্নমানের হচ্ছে। ফলে আমাদের পাটের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পাট পচনের তারতম্যের ফলেই আঁশের মানের বা গুণাগুণের তারতম্য ঘটে। আমাদের দেশে যে পাট উৎপাদন হয়, অনেক সময় তার প্রায় ৫০ শতাংশ নিম্নমানের এবং আঁশের গোড়ায় ১০-১২ ইঞ্চি পরিমাণ শক্ত ছালযুক্ত হয়। উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন আঁশ পেতে হলে বেশকিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলা প্রয়োজন। কারণ আঁশের গুণাগুণ পাট কাটার ওপর নির্ভরশীল। পাটগাছের বয়স ১০০-১১০ দিন হলেই পাট কাটতে হবে। এ সময় পাট কাটলে আঁশের গোড়ায় শক্ত ছাল কম হবে এবং রঙ উজ্জ্বল হবে। 

আমাদের দেশের অধিকাংশ পাটচাষী কলাগাছের কাণ্ড, কাদা মাটি বা মাটির বড় ঢেলা প্রভৃতি দিয়ে জাগ পানিতে ডুবিয়ে থাকেন। এসব দ্রব্যাদির রাসায়নিক গুণাগুণের জন্য আঁশের রঙ কালো বা শ্যামলা হয়। আবার কর্দমাক্ত ঘোলা পানিতে পাট পচালে আঁশের রঙ কালো বা শ্যামলা হয়ে থাকে। আদর্শ উপায়ে পাট না পচানোর ফলে যদি আঁশের রঙ কালো হয়ে যায় তবে ৪০ কেজি পানিতে এক কেজি তেঁতুল গুলে সেই তেঁতুল গোলা পানিতে ওইসব কালো আঁশ ৩-৪ মিনিট সময় ডুবিয়ে রাখলেই আঁশের রঙ উজ্জ্বল হবে। তবে রঙ উজ্জ্বল হওয়ার পর আঁশগুলোকে আবার পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে যাতে আঁশের গায়ে কোনো তেঁতুলের রস লেগে না থাকে। অর্থাৎ ৪০ কেজি পানিতে একসঙ্গে অনেক আঁশের (৪০-৬০ কেজি) শ্যামলা রঙ দূরীকরণ এবং আঁশের মানোন্নয়ন করা সম্ভব।

আবার ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার দিয়েও পাটের কালো আঁশকে সাদা বা সোনালি আঁশে রূপান্তর ও আঁশের মানোন্নয়ন করা যায়। এক্ষেত্রে পরিষ্কার পানিতে রাসায়নিক রি-এজেন্ট হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে ছয় গ্রাম বা ৪০ লিটার পানিতে ২৪০ গ্রাম টিএসপি সার মিশিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি করে নিতে হবে। টিএসপি মিশ্রিত দ্রবণকে কালচে পাট আঁশগুলো ভেজানোর প্রায় ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা আগে তৈরি করতে হবে। মাটি/সিমেন্টের চাড়িতে বা মোটা পলিথিন বিছানো মাটির গর্তে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে। পাট পচনের পর প্রাপ্ত কালচে পাট আঁশকে টিএসপি মিশ্রিত স্বচ্ছ দ্রবণে ৪-৫ মিনিট সময় ধরে ভিজিয়ে রাখলেই আঁশের কালচে রঙ দূরীভূত হয়ে আঁশগুলো সোনালি রঙে পরিণত হবে। নির্দিষ্ট সময় ধরে ভিজিয়ে রাখার পর আঁশকে পুনরায় না ধুয়ে সরাসরি বাঁশের আড়ায়, ব্রিজের রেলিং বা টিনের চালায় ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে বাজারজাত/গুদামজাত করতে হবে। 

ড. মো. ইউনুছ আলী: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট