অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়ে তুলতে পুঁজিবাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে পুঁজিবাজার প্রায়ই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারান এবং পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়। কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও পড়েছে। সে ধারাবাহিকতায় গত বছর পুঁজিবাজারের সূচক তেমন বাড়েনি। বছরজুড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পুঁজিবাজারে মন্দা ভাব বিরাজ করেছে। যে কারণে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশা অনুযায়ী মুনাফা অর্জন করতে পারেননি।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, সদ্য বিদায় নেয়া ২০২৩ সাল দেশের পুঁজিবাজারের জন্য ভালো যায়নি। এ সময়ে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফ্লোর প্রাইসের কারণে বহুজাতিকসহ ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর এক ধরনের স্থির অবস্থায় ছিল। পুঁজিবাজার থেকে এ সময়ে যৎসামান্য রিটার্ন এসেছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। তাদের ধারণা, ডলার পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার এবং পুঁজিবাজারে সংস্কার ও সুশাসনের দিকে নজর দিলে তা পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে সহায়ক হবে।

বরাবরের মতোই বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টরা চলতি বছর সমন্বিত প্রচেষ্টায় পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো পুঁজি ফিরবে এমন প্রত্যাশাও রয়েছে। তবে আগের বছরও আশা ছিল ২০২২ সালের হতাশা কাটিয়ে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এদিকে নির্বাচনের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান। ফলে আশা করা হচ্ছে, নির্বাচনের পর সাইডলাইনে থাকা বিনিয়োগকারীরা ফের সক্রিয় হবেন এবং বিনিয়োগে ফিরবেন। বস্তুত বর্তমান অবস্থান থেকে পুঁজিবাজারের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে নির্বাচনের পর পুঁজিবাজার নিজস্ব গতিতে ফিরবে বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকেও আশা করা হচ্ছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে হলে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য দেশী-বিদেশী ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া পুঁজিবাজার কারসাজিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধানও করতে হবে। এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারের সব থেকে বড় সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট। বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের কোনো আস্থা নেই। ফলে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারবিমুখ হয়ে গেছেন। যে কারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাজারে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

পুঁজিবাজারের বড় একটি সমস্যা তারল্য সংকট। এছাড়া বর্তমানে শেয়ারবাজারে একটি বড় বাধা ফ্লোর প্রাইস। যে কারণে নতুন বিনিয়োগ আসছে না। কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানির বেশির ভাগেরই শেয়ারদর ফ্লোর প্রাইসে আটকে আছে। তবে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি বুঝে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

এখন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আশা করা হয়েছে, নতুন সরকার বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করার দিকে মনোনিবেশ করবে, যেন মন্দ কোম্পানির শেয়ার আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। এক্ষেত্রে ফ্লোর প্রাইস নিয়ে বাজারে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকার দূর করবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার সংস্কারে গুরুত্ব দেবে, এমন প্রত্যাশা শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্টদের। এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সুশাসন পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে এবং বাজারও ঘুরে দাঁড়াবে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে গতি আসে সেটি বরাবরই দেখা যায়। এবারের নির্বাচনের পরও তার পুনরাবৃত্তির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়, যা ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত গত দুটি নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে লক্ষ করা গেছে। এজন্য শেয়ারবাজারের জন্য টোটকা পদক্ষেপের পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

আমরা প্রত্যাশা করি শেয়ারবাজারে গতি ফিরুক। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় বিএসইসির সময়োপযোগী পদক্ষেপ প্রয়োজন। বেশির ভাগ বিনিয়োগকারীর ধারণা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির ঘাটতির ফলেই বাজারে নানাভাবে কারসাজির ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে একটি গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বাজারকে নানাভাবে ব্যবহার করছে, এমন অভিযোগ ২০১০ সালের বিপর্যয়ের পর থেকে বারবার উত্থাপন করা হচ্ছে। এজন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সুচিন্তিত পদক্ষেপের পাশাপাশি ভালো কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে।

দেশে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা অনেক। কিন্তু পুঁজিবাজারে কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি একেবারে কম। পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসা উচিত বলে সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী মত দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বর্তমান কমিশন আইনগত সংস্কারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

২০১০ সালের ধসের পর পুঁজিবাজারের প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, যা এখনো অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এজন্য বিনিয়োগকারীরা ফিরলে পুঁজিবাজারে গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে পুঁজিবাজার নিয়ে অনেকে গুজব ছড়ায়। এতে কান না দিয়ে প্রকৃত তথ্য যাচাই করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এজন্য জেনে-শুনে বিনিয়োগ করতে হবে। পরিশেষে নতুন সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করে পুঁজিবাজারে গতি ফিরিয়ে আনবে এটিই আমাদের কাম্য।