প্রতি বছর ধানের মৌসুমে সরকারের পক্ষ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়। সরকারের এ সংগ্রহ অভিযানের উদ্দেশ্য হচ্ছে সরাসরি কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো। কৃষক যাতে কোনোভাবেই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতেই কৃষকের কাছ থেকে কেনা হয় ধান ও চাল। অন্যদিকে দেশের রাইস মিলগুলো থেকেও সরকার চাল কিনে থাকে। সরকার প্রয়োজনের সময় এ চাল খোলাবাজারে বিক্রি করে। তাতে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর বোরো মৌসুমে চার লাখ টন ধান, সাড়ে ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও এক লাখ টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বোরো মৌসুমে আমনের চেয়ে দাম কেজিপ্রতি ২ টাকা বাড়িয়ে ৩০ টাকা এবং চালের দাম ৩ টাকা বাড়িয়ে ৪৪ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে সরকারিভাবে ধানের নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় কৃষক বরাবরই খাদ্যগুদামে চাল বিক্রি করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এছাড়া চালকল মালিকরাও নির্ধারিত দামে সরকারের কাছে চাল বিক্রি করতে চান না। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে এবারের বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল করতে খাদ্য অধিদপ্তর সক্রিয় হবে বলে প্রত্যাশা। 

সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখা অন্যতম উদ্দেশ্য। দেশে ধানচাষীদের বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। তারা ধারদেনা করে ফসল ফলান। এছাড়া তাদের সংসারে নানা অভাব-অনটন লেগেই থাকে। ফলে ধান কাটার পর পরই বহু কষ্টে ফলানো ফসল বিক্রি করতে বাজারে নিতে হয়। মৌসুমের শুরুতে ধানচাষীরা যাতে ধানের ন্যায্য দাম পান, তা যতটা সম্ভব নিশ্চিত করতে সরকার মাঠ পর্যায়ে চাষীর কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনে। আরেকটি উদ্দেশ্য হলো সরকারি গুদামে চালের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তোলা। সরকারি খাদ্যগুদামে যথেষ্ট পরিমাণে ধান-চাল মজুদ থাকলে তা চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের চালের দাম বাড়াতে নিরুৎসাহিত করে। তাছাড়া বাজারে চালের দাম বাড়লে সরকারি মজুদ থেকে খোলাবাজারে ও ন্যায্যমূল্যের দোকানে চাল বিক্রির মাধ্যমে সরকার চালের দাম স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ডিজেল ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ যেমন সার, কীটনাশক, বীজ ইত্যাদির দাম বেড়েই চলেছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই কৃষি উৎপাদনের সবচেয়ে মৌলিক দুটি উপকরণ ডিজেল ও সারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। বেড়েছে কৃষি মজুরদের দাম। সব মিলিয়ে কৃষক পর্যায়ে বেড়ে চলেছে ধানের উৎপাদন ব্যয়। ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং যেকোনো দুর্যোগের প্রস্তুতি হিসেবে মজুদ নিশ্চিত করতেই সরকারকে চাল আমদানি করতে হয়। সরকারের সুরক্ষা কর্মসূচি ওএমএস ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির জন্যও সরকারের কাছে চালের মজুদ থাকতে হয়। কিন্তু যখন ধান-চাল লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সংগ্রহ না হয় তখন মজুদের ওপর তার প্রভাব পড়ে।

ধান-চাল ক্রয় কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য কৃষকদের আয় সহায়তা প্রদান করা, যা মূলত দাম সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। বাজার দাম ও উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে সরকার সংগ্রহ দাম নির্ধারণ করে থাকে। বাজারের চেয়ে কম মূল্য নির্ধারণের কারণেও কৃষকরা সরকারকে ধান দিতে আগ্রহ দেখায় না। বাস্তবতার নিরিখে খাদ্য বিভাগের পক্ষে অসংখ্য কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান কেনা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে কৃষককে পরিবহন খরচ ও সময় ব্যয় করে সংগ্রহ কেন্দ্রে এসে ধান বিক্রি করতে হয়। তবে বিক্রি করতে না পারার অনেক উদাহরণও আছে। এক্ষেত্রে কৃষক ধানের ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা বজায় রাখতে না পারার বিষয়টি অন্যতম একটি কারণ। এ অবস্থায় কৃষক দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি হলো ধান বিক্রি করতে না পারা এবং অন্যটি পরিবহন ব্যয় ও সময়। বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। সংগ্রহ কেন্দ্রে ধান কেনার জন্য ন্যূনতম ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার বিষয়টি কৃষককে জানানোর পাশাপাশি আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য নিকটবর্তী খাদ্য অফিস বা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সহযোগিতা করতে পারে। যে অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয় অথবা পরিবহন খরচ বেশি (যেমন হাওর এলাকা, চর এলাকা) সেক্ষেত্রে বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সব দেশেই রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচি রয়েছে। কিছু দেশে কার্যকর সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া বিদ্যমান। যেমন আমাদের পাশের দেশ ভারত। দেশটির কৃষকরা একটি মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসে (এমএসপি) সরকারের কাছে নিজেদের পণ্য, প্রধানত ধান ও গম বিক্রি করতে পারেন, যা পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রতি বছর নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এমএসপির আওতায় ভারতের কৃষক রাজ্যের নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোয় ধান, চাল, গম সরবরাহ করে থাকেন। ন্যায্য দাম পাওয়ার কারণে কৃষক আগ্রহের সঙ্গে সরকারের কাছে খাদ্যশস্য বিক্রি করেন। ফলে বরাবরই দেশটিতে মৌসুমভিত্তিক সংগ্রহ অভিযান সফল হয়। পদ্ধতিটি আমলে নিয়ে আমাদের মতো করে দেশে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। জাপান সরকারও কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ধান-চাল কিনে থাকে। কৃষকদের সহায়তা দেয়াই তার মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ সরকার জাপান ও ভারতের মডেলটি অনুসরণ করতে পারে। 

খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, নতুন উদ্যমে চলমান বোরো সংগ্রহ শতভাগ সফল করা হবে। অতীতের মতো হলে চলবে না। বলা নিষ্প্রয়োজন, গতবার ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল, টার্গেট পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এবার সংগ্রহ অভিযান সফল করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ধান কেনার লক্ষ্য অর্জিত না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। এ চিঠিতে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতার সুবাদে যাতে কোনোক্রমেই সংগ্রহ কার্যক্রম বিলম্বিত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে। কৃষক যাতে কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হয়, তাও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে চিঠিতে। গত কয়েকটি সংগ্রহ অভিযানে লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় অধিদপ্তর এবার অনেক বেশি সতর্ক। আমরাও মনে করি, ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শতভাগ সফল হওয়াই বাঞ্ছনীয়। বস্তুত এবারের বোরো সংগ্রহ অভিযানের সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। প্রথমত, এতে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা পাবে কিনা। দ্বিতীয়ত, সংগ্রহ অভিযান সফল হবে কিনা। তৃতীয়ত, বর্তমানে চালের দামের যে ঊর্ধ্বগতি, তা নিম্নগামী হয়ে ভোক্তার জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে কিনা। এ বিষয়গুলোর ইতিবাচক মীমাংসা হলেই ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল হয়েছে বলা যাবে। গত মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় এবং ধান-চালের উৎপাদন খরচের তুলনায় সরকারি সংগ্রহ মূল্য সন্তোষজনক না হওয়ায় সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল, লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ হয়নি।

দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে চালের মজুদ ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা আরো শক্তিশালী করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারি গুদামে চালের মজুদ সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে যে পরিমাণ বোরো ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এবার নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। কারণ সরকারি খাদ্যগুদামে যথেষ্ট পরিমাণে ধান-চাল মজুদ থাকলে তা চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের চালের দাম বাড়াতে নিরুৎসাহিত করে। তাছাড়া সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান-চাল মজুদ থাকলে ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও লক্ষ্যমুখী খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি (ভিজিডি, ভিজিএফ) বাস্তবায়ন সরকারের জন্য অনেকটা সহজ হয়। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রথমেই গুদামগুলোকে উন্নত করতে হবে। খাদ্যশস্য মজুদের জন্য সরকারের তরফ থেকে খাদ্যগুদামের সংকটের কথাও বলা হয়; যা স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। সরকারি গুদামে ছোট কৃষকদের ফসল সংরক্ষণ করার সুযোগ করে দিতে হবে যেন ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে অল্প দামে ফসল বিক্রি না করতে হয়। সরকারের ধান-চাল মজুদ করার সক্ষমতা কম হওয়ায় কারণে বেশির ভাগ সময়ই সরকারের পক্ষে বাজার প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে না। এছাড়া তুলনামূলক ছোট কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে জোর দিতে হবে। কারণ ছোট ও মাঝারি কৃষকের টিকে থাকার সক্ষমতা কম।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বিদ্যমান। চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে। নিত্যপণ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আমাদের জনজীবনে হিমশিম অবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনসহ আগামীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়তি উদ্বিগ্নতা নিয়ে হাজির হয়েছে। সুতরাং ধান-চালের মজুদ না বাড়ালে আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে। এমনটি হলে খাদ্য সংকটের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থতায় সরকারি মজুদে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খাদ্য মজুদ নজিরবিহীনভাবে কমেছে, বেড়েছে চালের দাম। কাজেই সংগ্রহ অভিযানে প্রাধান্য দিতে হবে মিলার নয়, প্রকৃত কৃষককে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ পরিকল্পনা সফল করতে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে।