তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্সে ভর করে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। ২০২৬ সালে এলডিসিভুক্ত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসবে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির তালিকায় নাম লেখাবে। বাংলাদেশের স্বপ্ন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া। উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরে আমাদের শিল্প খাতে বৈচিত্র্য সময়ের দাবি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো চালু হলেও নতুন শিল্প খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। এতে সম্প্রসারমাণ শিল্প খাতের রূপকল্প নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে তার সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে ২০১৬ সালে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। ওই পরিকল্পনায় ২০৪১ সাল পর্যন্ত বছরভিত্তিক বিদ্যুৎ চাহিদার একটি প্রক্ষেপণ করা হয়। সেখানে চলতি বছর বিদ্যুৎ চাহিদার (পিক ডিমান্ডের ভিত্তিতে) যে প্রক্ষেপণ করা হয় তার প্রায় ২১ শতাংশের কম বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিগত বছরগুলোয়ও বিদ্যুৎ চাহিদার প্রক্ষেপণ ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। 

বাজারে চাহিদা না থাকলে উৎপাদনে প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বড় চাহিদা আসে শিল্প-কারখানা থেকে। গত কয়েক বছরে পুরনো কারখানা যে হারে বন্ধ হয়েছে তার বিপরীতে নতুন শিল্প-কারখানা চালু হয়নি। মাঝখানে করোনা মহামারীর কারণে দুই বছরের মতো অনেক কারখানা বন্ধ ছিল এবং অনেকে আবার স্বল্প সক্ষমতা নিয়ে কাজ করেছে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা তুলনামূলক কম ছিল। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে শিল্প সম্প্রসারণ আরো বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। এতে নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ পাচ্ছেন না দেশীয় বিনিয়োগকারীরা। বরং অনেকেই দেশের অর্থ বৈধ ও অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার করে অন্য দেশে বিনিয়োগ করছে। সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তায় আশা পাচ্ছেন না বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও। এতে শিল্প খাতে কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণ হচ্ছে না এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে না। তৈরি পোশাকসহ বেশ কয়েকটি খাতে আমরা যে বিশেষ অঞ্চল সৃষ্টি করে বিদেশী বিনিয়োগ এনেছি নতুন খাতগুলোকে সে রকম আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে পারছি না। তাছাড়া বাংলাদেশের ঋণমান সূচক কমিয়েছে তিনটি প্রধান রেটিং সংস্থা—ফিচ, এসঅ্যান্ডপি ও মুডি’স। এতে বৈদেশিক বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে আকর্ষণ কমেছে বাংলাদেশের। নতুন কল-কারখানা চালু ও শিল্প খাতে প্রত্যাশিত সম্প্রসারণ না হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে না। 

বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৭ হাজার ৭৯ মেগাওয়াট। সেখানে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ গড় সরবরাহ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫৫৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রক্ষেপণের চেয়ে প্রকৃত চাহিদা প্রায় ২১ শতাংশ কম। ২০২২ সালে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রাক্কলন ছিল ১৫ হাজার ৭৪৬ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে প্রকৃত চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৭৯১ মেগাওয়াট। ২০২১ সালে চাহিদার প্রক্ষেপণ ছিল ১৪ হাজার ৪৬০ মেগাওয়াট, সেখানে প্রকৃত চাহিদা দাঁড়িয়েছিল ১৩ হাজার ৫৫৪ মেগাওয়াটে। বিদ্যুতের এ চাহিদা জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হলেও আদৌ তা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী মেলাতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা ছিল শিল্প খাতের উন্নয়ন ও বিস্তৃতি। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন হলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। যে কারণে গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ ও ক্যাপাসিটি সক্ষমতা তৈরির পরও শিল্প মালিকরা এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেননি। সরকারের কাছ থেকে গ্যাস নিয়ে নিজস্ব ক্যাপটিভ চালিয়ে কারখানা সচল রেখেছেন। অন্যদিকে সরকার দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। কিন্তু এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা ও চাহিদা অনুযায়ী বিনিয়োগ আসেনি। যে কারণে বাড়েনি শিল্পায়ন। কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় যথাসময়ে বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি করা যায়নি।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের মাথাব্যথার কারণ হিসেবে আছে মূল্যস্ফীতি এবং টাকার অবনমন। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। এর সঙ্গে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তাদের মাঝে ব্যবহারের প্রবণতা কমে গেছে। বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী না হওয়ায় বড় সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হয় (বেজ লোডভিত্তিক) এমন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অর্ধেক সক্ষমতাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকা বৃহৎ সক্ষমতার (১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের ওপরে) বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে অর্ধেক সক্ষমতায়ও চলছে না। 

শিল্প খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়বে এমন পরিকল্পনা সামনে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানির জন্য বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বড় বড় শিল্প খাত হুমকিতে রয়েছে। 

বিদ্যুৎ ব্যবহার ও চাহিদার সাম্প্রতিক উপাত্তে এটা স্পষ্ট যে দেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রক্ষেপণ যথাযথ ছিল না। এ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে ব্যাপক হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব কেন্দ্র চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি কোত্থেকে আসবে তার সংস্থানের কথা চিন্তা করা হয়নি। স্রেফ জিডিপি প্রবৃদ্ধি সামনে রেখে বিদ্যুতের এসব পরিকল্পনা দাঁড় করানো ভুল অনুসিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। 

শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনতে হলে এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ টানতে চলমান অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। যে রাজনৈতিক সংকটের কারণে আমরা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছি তার রাজনৈতিক সমাধানের পথ অনুসন্ধান করতে হবে সব পক্ষকে। তাহলে দেশে একটি ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যা হবে শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব। এতে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়িয়ে দেবে। তখন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো।