দেশে প্রতি বছর রমজানের সময় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লেও ঈদের পর তা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এ বছর দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদের ছুটির পর আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে বাজারদর। পাইকারি ও খুচরা বাজারে গত এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে আলু, পেঁয়াজ, আটাসহ আরো অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের। এর পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দায়ী বলে মনে করেন আমদানিকারক ও ট্রেডাররা। আশঙ্কা রয়েছে রিজার্ভ সংকট, ডলারের বাজারে অস্থিতিশীলতা, ব্যাংকে এলসি ও তারল্য সংকট এবং ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবণতার কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘকাল ধরে যে অস্থিতিশীলতা চলছে, তা সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া উত্তেজনার কারণে আরো বাড়বে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারদর কমেছে, কিন্তু বাংলাদেশে দাম কমানো সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ দেশে একবার কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা কমিয়ে আনা বেশ দুষ্কর। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি কমে এলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। এমনকি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া শ্রীলংকাও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে পেরেছে, যা বাংলাদেশ পারেনি। এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল ভূমিকা, ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকিতে ব্যর্থতার কারণেই যে দ্রুত হারে দাম বাড়ে, তত দ্রুততার সঙ্গে দাম কমে না। তবে মোটাদাগে বলতে গেলে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনাই অনিয়ন্ত্রিত বাজারদরের পেছনে দায়ী। সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের কাঁধে দায় চাপিয়ে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ইচ্ছামাফিক বাজারদর নির্ধারণ করে থাকে। বাজারদর স্থিতিশীল রাখার জন্য অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা জরুরি। চাহিদা, জোগান, ঘাটতি, আমদানি—এগুলো বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারকদের ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। পাশাপাশি বাজারের ওপর কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এ বিষয়ে তৎপরতা প্রয়োজন। 

বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণে রোজা শুরুর আগেই কিছু পণ্যের শুল্ককর কমিয়েছে সরকার। কিন্তু শুল্কহার হ্রাসের পর দফায় দফায় দাম বেড়ে চলছে। চলতি বছর ৮ ফেব্রুয়ারি শুল্ক হ্রাসের পর চিনির দাম বেড়ে দাঁড়ায় মণপ্রতি ৫০ টাকা। এছাড়া খেজুর, তেল ইত্যাদি পণ্যের দামও বেড়েছে। কেবল শুল্ক কমিয়ে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এটি তার নজির। 

আবার ঈদের আগে ১৫ মার্চ ২৯টি পণ্যের দাম বেঁধে দেয় সরকার। এ ঘটনায় বিক্রেতারা উল্টো ক্ষিপ্ত হয়েছেন বেঁধে দেয়া দামে তাদের পোষাবে না বলে। ফলে পাইকারি থেকে খুচরা বিক্রির পর্যায়ে দামের হেরফের হয় অনেক এবং অনেক ক্ষেত্রে দাম নির্ধারিত দামের বেশি ছিল। সুতরাং এ বিশৃঙ্খলা দূর করতে হলে অবশ্যই অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হতে হবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। বাজার ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাজারদর স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। 

সরকার নির্ধারিত পণ্যের দাম বাস্তবায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কাজ হয়ে থাকে। কিন্তু তাদের কাজের প্রতিফলন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কেন পড়ছে না বা পড়ে না সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। 

বাজারে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের তাদের সক্ষমতা সীমিত পরিমাণে থাকার কথা বলা হয়ে থাকে। ভোক্তা স্বার্থ দেখার জন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং আরো নানা সংস্থা রয়েছে। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় এসব সংস্থার সক্ষমতা সীমিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারে অকার্যকর বলা যায়। ফলে বাজার ক্রমাগত ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, ভোগান্তিতে পড়তে হয় স্বল্প আয়ের মানুষকে। 

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার সুযোগে বাজারে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য বিরাজমান রয়েছে। এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে বাজার থেকে অত্যধিক মুনাফা তুলে নেয়। নিত্যপণ্যের বাজারদর ক্রমেই বেড়ে চলে। 

আবার সিন্ডিকেট করে হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে লুফে নেয়া ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতেও ব্যর্থ হয় সরকারি সংস্থাগুলো। একদিকে বাজারে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল অবস্থানে নেই, অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ছুতোয় সরবরাহ সামান্য হ্রাস পেলেই দাম বাড়িয়ে দেন অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। খাদ্যদ্রব্যের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে খাদ্য বিভাগ ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিত্যপণ্য সরবরাহ ও বিক্রির ব্যবস্থা আরো জোরদার করা উচিত। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে তা মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টানতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা যায়।

তবে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে নিয়ামকগুলো প্রভাব বিস্তার করে, যেমন উৎপাদন, আমদানি, শুল্ক ইত্যাদি খাতে তীব্র সংকট রয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। আবার ডলার সংকটের দরুন আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহও বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে আমদানির অভাবে বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়ছে না। গুটিকয়েক আমদানিকারক শুল্ক হ্রাসের সুবিধা লুফে নিচ্ছে এবং বাজার সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে।

এসব কারণে দাম বেড়েই চলেছে এবং মূল্যস্ফীতি চড়াও হয়েছে। চলতি অর্থবছর গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে। আশঙ্কা করা যায়, দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে। রাতারাতি মূল্যস্ফীতি কমানো না গেলেও সাময়িকভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করাটা জরুরি। এজন্য বাজার তদারকি জোরদার করা উচিত।

তদারকি শুরু করতে হবে শুরু থেকেই। কোন সময় শুল্ক কমিয়ে রমজানে বা ঈদের মতো উৎসবের সময় মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব তা যাচাই-বাছাই করতে হবে, যেন আমদানিকারকরা আমদানির দোহাই দিয়ে দাম বাড়াতে না পারেন। আমদানির বিষয়ে সতর্ক না হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সরজমিনে বাজার তদারকি করতে হবে।

বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকিতে সরকারকে আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন। অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের আইনের আওতায় আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে বিভিন্ন পণ্য মজুদ করতে এগিয়ে আসতে হবে। বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে সরকারি মজুদ থেকে বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। ফলে সরকারের মজুদ থাকলে কৃত্রিম মজুদকারীরা ভবিষ্যতে পণ্য মজুদ করতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। আমদানিকারকের সংখ্যাও বাড়ানো জরুরি এক্ষেত্রে এবং কোনো ধরনের প্রভাব ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ছোট-বড় সব আমদানিকারক যাতে পণ্য আমদানি করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা সবচেয়ে জরুরি বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে। দেশে উৎপাদন বাড়লে আমদানির প্রয়োজন কমে আসবে। তখন সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটবে কম এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।