নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। নদীর তীরঘেঁষে সভ্যতার বিকাশ হয়েছে এ অঞ্চলে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ভূমিকা রেখেছে নৌপথ। কৃষি ও মৎস্য খাতে রয়েছে নদীর অপরিসীম অবদান। নদী এভাবে নিঃস্বার্থ অবদান রাখলেও সবসময়ই অবহেলিত থেকে গেছে। যার ফলে নিত্য দখল, দূষণ ও ভাগাড়ে পরিণত হওয়াই যেন নদীর ভাগ্য ছিল। সবচেয়ে বড় কথা এখন পর্যন্ত নদীর সঠিক তালিকা গড়ে তোলা যায়নি। তার পরও দেশের নদ-নদীর অবস্থা যাচাই, পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ কৌশল এবং দূষণমুক্ত করার পদক্ষেপের অংশ হিসেবে একটি প্রকল্প নেয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। এক বছরের বেশি সময় অতিক্রম হলেও প্রকল্পের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, এনআরসিসির প্রকল্পের আওতায় ৪৮ নদ-নদীর সমীক্ষা করা হয়, যেখানে দূষণকারী ও দখলদারদের তালিকাসহ বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিবেদনটি আলোর মুখ দেখেনি। এনআরসিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আরো যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে অভিযোগ করছেন, মূলত দখলদারদের বাঁচাতেই তালিকা প্রকাশে বিলম্ব করা হচ্ছে। কিন্তু এ অভিযোগ অস্বীকার করছে এনআরসিসি।
বস্তুত আমাদের দেশে কোনো স্পর্শকাতর প্রকল্পের প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ না করার প্রবণতা রয়েছে। এনআরসিসির প্রতিবেদনেও এমনটি হয়েছে বলে ধারণা হওয়াটা অমূলক নয়। এজন্য স্বচ্ছতার স্বার্থেই কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিবেদনটি যত দ্রুত সম্ভব প্রকাশ করা। এক্ষেত্রে বিলম্ব প্রকল্পের উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করবে। নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান কোনো তথ্য মুছে ফেলা হয়নি বলে যে দৃঢ়তা ব্যক্ত করেছেন আমরা তাতে আশ্বাস রাখতে চাই। কিন্তু এজন্য প্রতিবেদনের মাধ্যমেই বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন। না হলে এক্ষেত্রে সৃষ্ট ধোঁয়াশা কাটবে না। বিশেষ করে প্রায় ৩৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পে নদী দখলকারী প্রায় ৩৭ হাজার ৩৯৬ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেও তা সার্ভার থেকে বাদ দেয়ার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা প্রতিবেদন প্রকাশ করার আগ পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই থেকে যাবে। এদিকে এক বছর হয়ে যাওয়ায় প্রতিবেদনটি আদৌ প্রকাশ করা হবে কিনা তা নিয়ে খোদ প্রকল্পসংশ্লিষ্টরাই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্বের কারণে নদী রক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হবে, দখলদাররা আরো উৎসাহ পাবে। এতে নদীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠনের সার্থকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলো নদীকে কেন্দ্র করে যেভাবে উন্নতির শীর্ষে আরোহণ করেছে, আমাদের দেশে ঠিক ততটাই নদীকে অবহেলা করা হয়। এজন্য প্রভাবশালী দখলদারদের রক্ষার স্বার্থে প্রকৃত তথ্য আড়াল করার অভিযোগও পাওয়া যায়। অথচ নদী রক্ষা করার জন্য এনআরসিসি আরো শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, এটিই কাম্য ছিল। এমনকি নদী রক্ষা কমিশন সংশ্লিষ্টদের প্রতিবেদনের কোথায় ভুল ছিল সেটি সুনির্দিষ্ট করে বলেনি, যা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের উদ্ভব করেছে।
তবে সব যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে—এ আশ্বাসের বাস্তবায়ন এখন জরুরি। কারণ নদীসংক্রান্ত সব তথ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। না হলে নদীগুলো একসময় হারিয়ে যাবে। দখলদারদের কাছে মৃত্যুবরণই নদীর পরিণতি হবে, যা প্রকৃতিপ্রেমী কোনো মানুষই প্রত্যাশা করে না। এক্ষেত্রে যদি নদী রক্ষা কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যানও অপরাধী হন, তাহলে তাকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। কারণ নদী রক্ষার স্বার্থে কোনো অবহেলা করা যাবে না।
নদী বিশেষজ্ঞরা ৪৮ নদ-নদী সমীক্ষা প্রকল্পের কাজের প্রক্রিয়া সঠিক ছিল বলে দাবি করছেন। তাদের দাবিকে অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না। জানা যায়, নদী রক্ষা কমিশন এর আগেও দুবার সারা দেশের নদী দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে প্রায় ৬৫ হাজার দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছিল। অথচ ঢাকার নদীগুলোর দখলদারের সংখ্যাও এর চেয়ে বেশি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। অর্থাৎ কমিশনের তালিকায় দখলদারদের পুরো তথ্য আগেও পাওয়া যায়নি। তার ওপর এবার ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্পের তালিকাও প্রকাশ হচ্ছে না।
এভাবে নদীর পক্ষে কাজ না করা প্রকৃতপক্ষে উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার নামান্তর। তাই কমিশনের উচিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে দখলদারদের নাম ও তালিকা দ্রুত প্রকাশ করা এবং তাদের উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেয়া। আমাদের নদীগুলো দখলদারমুক্ত হোক, এটিই আমাদের কাম্য। এজন্য নদী রক্ষা কমিশনের যথোপযুক্ত সাহসী ভূমিকা প্রয়োজন।










