প্লাস্টিক হলো কৃত্রিমভাবে তৈরি পলিমার, যা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে রাসায়নিকভাবে তৈরি করা হয়। আলেকজান্ডার পার্কস ১৮৫৫ সালে প্রথম প্লাস্টিক আবিষ্কার করে এর নাম দেন পার্কেসিন। পরবর্তী সময়ে লিও বেকল্যান্ড ১৯০৭ সালে সম্পূর্ণ সিনথেটিক প্লাস্টিক আবিষ্কার করে নাম দেন বেকেলাইট। তিনিই প্রথম প্লাস্টিক শব্দটি ব্যবহার করেন। ব্যবহারের বহুমুখিতা, স্বল্প খরচ, সহজ উৎপাদন, সুলভ ইত্যাদি কারণে প্লাস্টিক আবিষ্কারের পর থেকেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মানুষের নানাবিধ ব্যবহারের ফলে জীবনযাত্রা সহজ করা প্লাস্টিক পণ্যসামগ্রী এখন পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্লাস্টিক দূষণ হলো পরিবেশ কর্তৃক প্লাস্টিক বর্জ্যের আহরণ, যা পরবর্তী সময়ে সামুদ্রিক ও বন্যপ্রাণীসহ তাদের আবাসস্থল, জল, স্থল এবং সর্বোপরি মানবগোষ্ঠীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। গত ৫০ বছরে পৃথিবীতে মাথাপিছু এক টনের বেশি প্লাস্টিক পণ্য উৎপন্ন করা হয়েছে। এসব অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে ৪০০ থেকে প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে, যা প্রতিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। প্লাস্টিক দূষণকে আকারের ওপর ভিত্তি করে মাইক্রো, ম্যাক্রো ও মেসো তিনভাবে শ্রেণীবিভাগ করা হয়। আকৃতিগত কারণে এগুলো দ্রুত পরিবেশের সঙ্গে মিশে দূষণের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্লাস্টিক কারখানার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার এবং প্রতিদিন প্রায় আট লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে ৩৬ শতাংশ পুনর্চক্রায়ন, ৩৯ শতাংশ ভূমি ভরাট এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ সরাসরি পরিবেশে দূষক হিসেবে যোগ হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে (২০২১), বাংলাদেশে ২০০৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত শহর এলাকায় বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার (নয় কেজি) বেড়েছে তিন গুণ।

এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ১৫-৩৫ বছর বয়সীরা সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ৬৮ শতাংশ ব্যবহার করছে। যেসব খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিক রয়েছে সেগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী হচ্ছে তরুণ ও যুবকরা। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৭ হাজার টন সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্য রিসাইকেল হয় না বলে বছরের পর বছর নালা, খাল-বিল তথা প্রকৃতিতে বিরাজমান থেকে যায়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০২১ সালের বর্জ্যবিষয়ক রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন খাল হয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৮৫ টন বর্জ্য প্রতিনিয়ত মিশছে বাংলাদেশের লাইফলাইন খ্যাত কর্ণফুলী নদীতে, যার মধ্যে অধিকাংশ থাকে পরিবেশর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্লাস্টিক ও পলিথিন। ফলে কর্ণফুলী নদী দূষণের সঙ্গে সঙ্গে কমছে এর গভীরতা, যা নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। কর্ণফুলী নদীতে ২০১৮ সালের ড্রেজিংয়ের সময় ৪৮ লাখ ঘনমিটার বালিযুক্ত মাটি উত্তোলন করা হয়, এর মধ্যে ২২ লাখ ঘনমিটার ছিল পলিথিনযুক্ত বালি মাটি। বাংলাদেশে ২০০২ সালে আইন করে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দেশে প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানায় নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরি হচ্ছে এবং এগুলোর অধিকাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক।

প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রতম কণাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা মূলত শূন্য দশমিক ২ ইঞ্চি বা ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ক্ষুদ্র কণার প্লাস্টিক। মাইক্রোপ্লাস্টিক বড় আকৃতির প্লাস্টিকগুলো থেকে তৈরি হয়, যা নারডল নামে পরিচিত। প্লাস্টিক দূষণের মধ্যে ভয়াবহ হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। এক ইঞ্চির প্রায় পাঁচ ভাগ ছোট আকৃতির প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলো আরো ক্ষুদ্রাকৃতির, যা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বাতাসে ছড়িয়ে আছে। জীববিজ্ঞানী রিচার্ড থম্পসন ১৯৯৩ সালে যুক্তরাজ্যের সৈকত পরিষ্কারের সময় বিভিন্ন রঙিন বালির সন্ধান পান এবং সেই বালির রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা আবিষ্কার করেন। নিত্যব্যবহার্য বিভিন্ন প্লাস্টিকসামগ্রী মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান উৎস। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, গ্রাম-শহরে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত শ্যাম্পু, সাবান, ফেসওয়াশ, বডিওয়াশ, সেভিং ফোম, পাউডার, ডিটারজেন্ট, পেস্ট, নেইলপলিশ, মিনারেল ওয়াটার, প্লাস্টিক মোড়কজাত খাবার ইত্যাদি সামগ্রীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি লক্ষণীয়। বর্তমানে বোতলজাত পানিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সমুদ্রে ভাসমান প্লাস্টিক বর্জ্যকে ভেঙে ছোট আকৃতিতে পরিণত করে, যা পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এছাড়া মাইক্রোপ্লাস্টিক নদী, নালা, খাল-বিল, পুকুর-জলাশয়ে প্রতিনিয়ত মিশ্রিত হচ্ছে, যা মাছ খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বলেছেন, সমুদ্রে বর্তমানে ৫ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন মাইক্রো ও ম্যাক্রোপ্লাস্টিকের কণা জমা হয়েছে এবং প্রতি বর্গমাইল সমুদ্রে রয়েছে ৪৬ হাজার প্লাস্টিক কণা এবং সমুদ্রে প্রতিদিন জমা হচ্ছে ৮০ লাখ টুকরা প্লাস্টিক। সমুদ্রের ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর বিভিন্ন বড় মাছ এবং খাদ্য শিকলের ধারাবাহিকতায় মানবশরীরে প্রবেশ করে। বিভিন্ন স্তর অতিক্রমকালে কোনো জায়গায় এগুলো হজম হয় না, পাকস্থলীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে যায়। প্লাস্টিক মাইক্রোকণা সহজে ও নিয়মিতভাবে মানুষসহ প্রাণীর খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে পানিচক্রের মাধ্যমে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এভাবে ন্যানোপ্লাস্টিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর কোষের ভেতর অবস্থিত ডিএনএ ও আরএনএ অণুর মধ্যে মিউটেশন ঘটিয়ে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। প্লাস্টিক অপাচ্য পদার্থ হওয়ায় পুনর্চক্রায়ন না হওয়া পর্যন্ত এটি পরিবেশে বিদ্যমান থাকে। মানবদেহের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক খুবই ক্ষতিকর। বিভিন্ন মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে যায়। ফলে থাইরয়েড ও কিডনিজনিত সমস্যা ছাড়াও হতে পারে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য অসুখ। মাইক্রোপ্লাস্টিকে ‘ফেতালেটস’ নামক একটি রাসায়নিক শরীরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কোষের বিভাজনে নানা পরিবর্তন হতে শুরু করে, যা থেকে লিভার ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। মানবদেহে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর বিভিন্ন ক্ষতিকর অণুজীব বাসা বাঁধে এবং মানুষের শরীরে থাকা হরমোনে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্লাস্টিকের বিভিন্ন উপকরণ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরের রক্তে মিশে যাচ্ছে। মানুষের শরীরে যত প্রকার মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে তার মধ্যে বেশি পরিমাণ হলো পিইটি প্লাস্টিক। সাধারণত পানির বোতল এ ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিকে থাকা একাধিক রাসায়নিক আমাদের শরীরের রক্তে মিশে যাওয়ার পর বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারায়। একই সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হারিয়ে বিভিন্ন সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি করে। যত্রতত্র প্লাস্টিক নিক্ষেপের ফলে এখান থেকে সৃষ্ট মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে মাটির উর্বরতা হ্রাস করে। এছাড়া চোয়ানোর মাধ্যমে ভূগর্ভের পানির সঙ্গে মিশে পানিকে দূষিত করছে। মানুষের জীবনধারণের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান হলো বিশুদ্ধ বাতাস। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বায়ুদূষণের ব্যাপকতা বৃদ্ধি করছে প্রতিনিয়ত। এছাড়া নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জ্য ক্রমাগত পরিবেশকে করে তুলছে বিপন্ন। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য পরে তাপমাত্রা, অণুজীব ও নানা কারণে ভেঙে রূপান্তরিত হয় মাইক্রোপ্লাস্টিকে। নীরব ঘাতক মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবসভ্যতাকে এক নজিরবিহীন খারাপ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম একটি উৎস হলো কৃষিজমিতে ব্যবহৃত সার। এসব সার শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে মিশে যায়। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বায়ুদূষণ ত্বরান্বিত হচ্ছে। এমনকি সিনথেটিক কার্পেট ও কাপড় থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ও ভারতের এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, পানি ও পলির সঙ্গে মিশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা জমা হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে। গঙ্গা অববাহিকার নদীর প্রতি ২০ লিটার পানিতে অন্তত একটি মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা বিদ্যমান রয়েছে। অব্যবস্থাপনার কারণে সাগরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান ৩১তম।

প্লাস্টিক বর্জ্য এমন একটি ক্ষতিকর পদার্থ, যা পরিবেশের সঙ্গে মিশতে অথবা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন, যার ফলে এটি পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় প্লাস্টিক দূষণ রোধে সচেতন নাগরিক হিসেবে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দৈনন্দিন বাজারের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ইউজ পলিথিনের পরিবর্তে কাপড় অথবা পাটের ব্যাগের বাধ্যতামূলক; লন্ড্রি ও অনলাইন কেনাকাটায় প্লাস্টিক ব্যাগের পরিবর্তে কাগজের ব্যাগ; দুগ্ধ ও পানীয় জাতীয় দ্রব্যে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচের বোতল ব্যবহার; প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকার, নাগরিক সমাজ, উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ; ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া, সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক সম্বন্ধে প্রচারণা; প্লাস্টিক দূষণ সম্পর্কে স্কুলের পাঠ্যসূচিতে প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সচেতন নাগরিক তৈরির উদ্যোগ; প্লাস্টিক দূষণ ব্যবস্থাপনায় প্রণীত আইন ও বিধিমালাকে হালনাগাদ এবং সময়োপযোগী করা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা; পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাড়াতে ও খরচ কমাতে পাটের উৎপাদন বাড়ানো; প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার, বর্জনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনে নাগরিকদের সচেষ্ট হতে হবে এবং সর্বোপরি প্লাস্টিক দূষণ হ্রাসে একটি সুষ্ঠু জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন।

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়