পরিবেশ দূষণ বেড়ে চলেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়ার পরও প্রতিকার মিলছে না। এক্ষেত্রে গৃহীত এনফোর্সমেন্টও দুর্বল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়। জনজীবনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সব মিলিয়ে দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, পরিবেশ দূষণ রোধে দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ ধার্যের আইন রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ক্ষতিপূরণ ধার্য করে। তবে দুর্বল এনফোর্সমেন্ট ও আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যাচ্ছে দূষণকারী। দূষণকারীদের বড় অংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট আওতার বাইরে। যাদের এনফোর্সমেন্ট করে ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হচ্ছে, তারাও যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না।
এ রকম অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের দুর্বল এনফোর্সমেন্টকেই দায়ী করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে ধার্যকৃত ক্ষতিপূরণের অর্ধেকই আদায় করতে পারেনি সংস্থাটি। দুর্বল এনফোর্সমেন্ট ও আপিলের সুযোগে দূষণকারীরা আরো বেশি দূষণে উৎসাহিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংস্থাটি ক্ষতিপূরণের অর্ধেকও আদায় করতে পারছে না। দূষণকারীরা মন্ত্রণালয়ে আপিল করে ক্ষতিপূরণের অর্থ কমিয়ে ফেলে। আবার দূষণের তুলনায় জরিমানার পরিমাণ কম ও সেটি মওকুফের সুযোগও আছে। দেখা যায়, এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যাদের একাধিকবার জরিমানা করা হলেও তারা দূষণ বন্ধ করে না। এমনকি বারবার ক্ষতিপূরণ দিয়েও মালিকরা কারখানা সচল রাখছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এনফোর্সমেন্ট শাখায় পর্যাপ্ত পরিমাণ জনবল নেই। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জরিমানার টাকা আলাদা করে রেখেই পরিবেশ দূষণ কার্যক্রমসহ কারখানা সচল রাখে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ৭ ধারা মোতাবেক কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দ্বারা পরিবেশের ক্ষতি সাধিত হলে উক্ত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তা আদায়ের বিধান রয়েছে। এটি Polluters Pay Principle নামে বহুল পরিচিত। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে পরিবেশ সংরক্ষণে এর বহুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। পরিবেশ দূষণ রোধ করার জন্য এ জরিমানা করা হলেও পরিবেশবিদদের মতে, পরিবেশ অধিদপ্তর যে ক্যাটাগরিতে জরিমানা করে তা মোটেও যথেষ্ট নয়। সংস্থাটির অতীত কার্যক্রম বিবেচনা করে দেখা গেছে, ১০ বছরে ৩৮৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে। অথচ বহির্বিশ্বে পরিবেশ দূষণের দায়ে একটি কোম্পানিকেই এর চেয়ে বেশি পরিমাণ টাকা ধার্যের নজির রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংস্থাটি ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৫৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে। এ সময়ের মধ্যে ধার্যকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে মাত্র ২৪১ কোটি টাকা আদায় হয়। অর্থাৎ ধার্যকৃত ক্ষতিপূরণের অর্ধেকই সংস্থাটি আদায় করতে পারেনি। অন্যদিকে সংস্থাটির বিপক্ষে বিভিন্ন সময় দুর্নীতির অভিযোগও তোলা হয়েছে।
২০২২ সালে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘পরিবেশ অধিদপ্তরে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবেশসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা ও প্রয়োগের ব্যর্থতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অনিয়মসহ সুশাসনের সব সূচকে ঘাটতির কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে। সে সময় সংকট উত্তরণে ১০ দফা সুপারিশও করে সংস্থাটি।
বস্তুত অনিয়ম, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। এছাড়া সংকট উত্তরণে দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা, প্রভাবশালী শিল্প-কারখানার মালিকদের প্রভাব থেকে মুক্ত করে পরিবেশ অধিদপ্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পরিবেশ মন্ত্রণালয়েরও উপযুক্ত ভূমিকা আবশ্যক। সেই সঙ্গে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ধার্য করতে হবে। নাহলে উন্নয়নের ডামাডোলে পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে তা কোনো কিছুর বিনিময়েই পূরণীয় নয়। এক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানার ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকার বিকল্প নেই। এজন্য এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম বাড়াতে হবে। কারখানা মালিকদের জন্য নামমাত্র ক্ষতিপূরণ ধার্য ও কমানোর জন্য আপিল ও মওকুফের ব্যবস্থা থাকায় এনফোর্সমেন্ট কার্যত ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট শক্তিশালী করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।










