পৃথিবীতে যে কয়েকটি মহান পেশা রয়েছে তার মধ্যে চিকিৎসসেবা অন্যতম। ডাক্তারি ও মানবসেবা—শব্দ দুটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। চিকিৎসার সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িত। তাই এ পেশা অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশে মহামারী বা প্রতিটি দুঃসময়ে মানবতার পরিচয় দিয়েছেন এ মহান পেশার মানুষ। মানুষকে সুস্থ করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তারা। তাই তাদের প্রতি রোগীদের আস্থাও অনেক। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসকদের মধ্যে বাণিজ্যিক মনোভাব ও দায়িত্বে অবহেলা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে চিকিৎসকদের অদক্ষতা, অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় রোগীরা অঙ্গহানি বা অন্য কোনো জটিলতা কিংবা মৃত্যুবরণের শিকার হচ্ছে। নিরীক্ষা করতে গিয়েও নিয়মিত রোগীদের আর্থিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ফলে দেশের চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের ক্রমেই আস্থা কমছে। এ কারণে যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাদের অনেকেই প্রতিবেশী দেশ ভারতে চিকিৎসা নিতে পাড়ি জমাচ্ছে। কিন্তু দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বরাবরই ভালো স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই দেশের স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এ খাতের আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়াতে এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মধ্যে চিকিৎসা নৈতিকতার চর্চা সন্তোষজনক নয় বলে বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রোগীকে পর্যাপ্ত সময় না দেয়া, নির্দিষ্ট রোগ নিরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠানো, অপ্রয়োজনীয় ওষুধের পরামর্শ ও কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ, অভিযোগ না শোনা এবং বৈষম্যের বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। চিকিৎসা অবহেলা প্রতিকারে আইনগত দুর্বলতাও তাদের পেশাগত নৈতিকতাকে প্রভাবিত করছে। অথচ এর অনুশীলন রোগীর অধিকার রক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসকের সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রত্যেক নাগরিকের চিকিৎসাসেবা পাওয়া সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। তাই চিকিৎসকদের মধ্যে নীতিনিষ্ঠা, মানবিকতা, সদাচার, কর্তব্যপরায়ণতা এসব গুণাবলির সমন্বয় থাকা অতি জরুরি। রোগীর প্রতি চিকিৎসকের আচরণ রোগীকে যেমন আত্মবিশ্বাস ও সাহস জোগায়, তেমনি হতাশাগ্রস্তও করতে পারে। তাই চিকিৎসকদের উচিত রোগীর প্রতি রূঢ় ব্যবহার পরিহার করে দায়িত্বশীল আচরণ করা। তাদের সৌজন্যপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল আচরণই রোগীকে আত্মবিশ্বাসী হতে সহায়তা করে। চিকিৎসকদের কর্তব্য সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় আইনগুলো মেনে চলা, বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো রোগীর পাশে দাঁড়ানো।

এদিকে বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও আধুনিক রোগনির্ণায়ক যন্ত্রপাতির বদৌলতে অভিজ্ঞ না হয়ে হচ্ছে আনাড়ি চিকিৎসক বা হাতুড়ে চিকিৎসক। ফলে পদে পদে রোগীরা হয়রানি ও ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছে। 

চিকিৎসা ও সেবার মান নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন উঠছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসার বেহাল দশা। এ অবস্থা একদিনে গড়ে ওঠেনি। হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থা না নেয়ায় স্বাস্থ্য খাতে অরাজকতা তৈরি হয়েছে। 

দেশে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞ চিকিৎসকও রয়েছেন। তাদের কাজে লাগাতে সরকারকে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতে আস্থা না থাকায় রোগীরা ভারতে চিকিৎসা নিতে যায়। ভারত চিকিৎসা খাত থেকে প্রচুর অর্থ আয় করে। এক্ষেত্রে ভারতের চিকিৎসাসেবার মতো আমাদের চিকিৎসাসেবা গড়ে তুলতে পারি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

আমাদের বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও অবকাঠামোর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসাসেবার শৃঙ্খলা ফেরাতে পারিনি। চিকিৎসকের ডায়াগনস্টিক ও ওষুধ বাণিজ্যের কারণে রোগীরা প্রতিনিয়তই হয়রানির শিকার হচ্ছে। ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুবরণও করেছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ইচ্ছামতো রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। এক্ষেত্রে বরাবরই প্রশ্ন থেকেছে স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে। বেশ কয়েক বছর আগে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি বেশি হয় বলে প্রকাশ করা হয়। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ে কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। ‘শক্তিশালী’ এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ওষুধ, সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ‘সিন্ডিকেট’ গঠন করে স্বাস্থ্য খাতে জনসাধারণের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাজেটের একটি বড় অংশ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে জনগণ তাদের প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যবিদরা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৩৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের তুলনায় এবার বরাদ্দ বেড়েছে ১ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। এবার বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। গত বাজেটে এর আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এবার তা হয়েছে ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এবার মোট বাজেটের নিরিখে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। তবে এ বাজেট সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দেখাতে পারেনি।

চিকিৎসা খাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেনের ভালো অভিজ্ঞতা ও সুনাম রয়েছে। তার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে আস্থা ফিরে আসবে এবং সাধারণ জনগণের চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। আশা করছি, তার এ অভিজ্ঞতা ও সুনাম কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।