খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। এজন্য রাষ্ট্রের যেকোনো পরিকল্পনার সুফল পেতে খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। কারণ সুস্থ, সবল জনগোষ্ঠীর মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন পাওয়া সম্ভব। তবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত। এক্ষেত্রে চলমান উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির ফলে নিম্নমধ্যবিত্তরা খাদ্যের তালিকা কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের মোট জনসংখ্যার ২১ দশমিক ১১ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের একজন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। শহর-গ্রামের তুলনা করলে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা গ্রামেই বেশি। সবচেয়ে বেশি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা সিলেট ও রংপুর বিভাগে। এছাড়া ২০১৬ সালের তুলনায় মানুষের ভাত ও ডিম গ্রহণের হারও কমেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে প্রকাশিত ‘খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রথমবারের মতো সংস্থাটি তাদের জরিপে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে।
জরিপের বিভাগভিত্তিক বিভাজনে দেখা গেছে, সিলেট ও রংপুরে সবচেয়ে বেশি যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৭৯ ও ২৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এ দুই বিভাগের ২৭ শতাংশের বেশি খানায় এমন নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। বরিশাল ও চট্টগ্রামে এ হার প্রায় ২২ শতাংশ। তবে সবচেয়ে কম (১৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ) খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা রয়েছে খুলনা বিভাগে। এছাড়া খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বলছে, ছয় বছরের ব্যবধানে মানুষের মাথাপিছু দৈনিক খাবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়লেও কমেছে ভাত, ডিম ও পেঁয়াজ গ্রহণের হার। দেশের মানুষ এখন প্রতিদিন গড়ে ৩২৮ গ্রাম ভাত গ্রহণ করে। কিন্তু ২০১৬ সালে ভাত গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৩৬৭ গ্রাম। ওই সময় দৈনিক ১৩ দশমিক ৬ গ্রাম ডিম গ্রহণ করা হলেও এখন তা কমে ১২ দশমিক ৭ গ্রামে নেমে এসেছে। একই সময়ে পেঁয়াজ গ্রহণের পরিমাণও কমে এসেছে। তবে মাছ, মাংস ও সবজি গ্রহণের হার বেড়েছে। আর দৈনিক ফল গ্রহণ ৩৫ গ্রাম থেকে দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বেড়ে ৯৫ গ্রামে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ঘরের বাইরে খাবার গ্রহণও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০১৬ সালে গড়ে দৈনিক ৩০ গ্রাম খাবার ঘরের বাইরে গ্রহণ করলেও এখন তা ৬৩ গ্রামে উঠে এসেছে। মূলত কর্মস্থলে বেশির ভাগ সময় কাটানোর ফলে বাইরের খাবার গ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি হয়েছে। তবে এখন হোটেলে খাবারের দামও বেড়েছে। এমনকি এখন ফুটপাতের দোকানেও উচ্চমূল্যে খাবার কিনে খেতে হয়। অর্থনীতি বিভাগের সচিবের মতে, মানুষের আয় যত বাড়ে তত বেশি খাদ্যবহির্ভূত খাতের ব্যয় বাড়ে। এজন্য টাইট ফিসকল স্পেসের মধ্যেও সরকার সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে সামাজিক নিরাপত্তায় জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয় হলেও বৈষম্য বাড়ায় সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, ৩৭ শতাংশ খানা বা পরিবার সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় এসেছে।
এদিকে দেশে বৈষম্য অ্যালার্মিং লেভেলে পৌঁছে গেছে বলে মত দিয়েছেন ব্র্যাকের চেয়ারপারসন। বর্তমানে দেশের ৫ শতাংশ উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে মোট আয়ের ৩০ শতাংশ আবদ্ধ হয়ে আছে। যেখানে নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে আছে মাত্র ১৮ শতাংশ আয়। শহরে দারিদ্র্য কমলেও আর্থিক দুর্বলতা বেড়েছে। মধ্যবিত্তের আয় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে, একই সঙ্গে কমেছে খাদ্য গ্রহণও। তাই বৈষম্য এখন দারিদ্র্যের চেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাকে হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি।
দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের ক্যালোরি গ্রহণ কমছে। আবার শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরিশালেও দারিদ্র্য বাড়ছে। এক্ষেত্রে বৈষম্য বৃদ্ধির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ সমাজে আর্থিক খাতে বৈষম্য বিরাজ করলে তাতে দারিদ্র্য আরো বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় ঋণ ৭৩ হাজার ৯৮০ টাকা। ঋণগ্রস্ত পরিবার হিসেবে এ অংক আরো অনেক বেশি। বিশেষ করে শহরের মানুষকে বেশি ঋণ করতে হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারের জন্য সরকারকে অবশ্যই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, খোলাবাজারে বিক্রয় (ওএমএস), পুষ্টি চাল বিতরণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), ভিজিএফ, টিআর, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান এসব কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। এছাড়া ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রমও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপগুলোও সুচিন্তিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি গুদামে কৃষকদের ফসল জমাদানে উদ্বুদ্ধ করাসহ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা দরকার। অন্যদিকে হিমাগার বৃদ্ধিসহ উন্নত প্রজাতির কৃষিপণ্য উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। সব মিলিয়ে দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ প্রয়োজন। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কৃষিপণ্যবাহী পরিবহনও আক্রান্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে অবশ্যই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর আন্তরিক ভূমিকা কাম্য।










