বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চাহিদা মেটাতে নিয়মিত ডলার বিক্রির মধ্যে আমদানি দায় মেটাতে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) সর্বশেষ অর্থ পরিশোধের পর দেশের বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘদিন ডলার রেটকে আটকে রাখা এবং হঠাৎ করেই ২৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং, বিভিন্ন উপায়ে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স না এনে হুন্ডির ব্যবহার বেড়ে যাওয়াই দেশে রিজার্ভ সংকটের অন্যতম কারণ। ডলার আয়ের উৎস এবং ডলার খরচের খাতগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা নিশ্চিত করতে হবে। হুন্ডি লেনদেন বন্ধ করতে হবে। এছাড়া রফতানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি অযাচিত আমদানি কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সরকার ডলার ব্যয়ে রাশ টেনে ধরতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু ডলার আয় বাড়াতে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্স, এমনকি রফতানি আয় আসা কমে এসেছে। ডলারের একাধিক মূল্য থাকায়ও রিজার্ভ বৃদ্ধি ও ডলারপ্রবাহে জটিলতা তৈরি করছে। ডলারের চাহিদা-জোগান ও মূল্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংক, সর্বোপরি সরকারকে আরো দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।

মহামারী ও ইউক্রেন সংকটের ফলে ধেয়ে আসা ‘কমোডিটি শক’ এবং বিশ্ববাজারে আমদানি পণ্যের উচ্চমূল্যের ফলে মাত্রাতিরিক্ত আমদানি ব্যয় ডলার সংকটের জন্য দায়ী। এছাড়া প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব কিছু অভ্যন্তরীণ কারণ আছে। সংকট মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বৃদ্ধিসহ বেশকিছু পদক্ষেপও নিচ্ছে, যার মধ্যে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধন বা মিতব্যয়িতার নীতিও নেয়া হচ্ছে। তাতে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন না হলেও সংকট মোকাবেলায় কিছুটা স্বস্তি মিলছে। কিন্তু বাংলাদেশে ডলারের দাম বাজারের হাতে ছেড়ে না দিয়ে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে, যা সঠিক পদক্ষেপ নয় বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন। এতে রেমিট্যান্স, রফতানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ডলারের দাম পুরোপুরি না হলেও আংশিকভাবে বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন। নইলে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করে কুলিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলার আয় বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে হুন্ডিতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমাতে হবে। প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে মাঝে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়ে উঠলেও ডলার মূল্যের ব্যাপক পতনে তাতে ভাটা পড়েছে। এক্ষেত্রে ডলার মূল্য বাজারভিত্তিক বা রিয়েল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট অনুযায়ী নির্ধারণ হলে ইতিবাচক ফল মিলতে পারে। বাংলাদেশের ডলার আয়ের অন্যতম খাত রফতানি আয়। রফতানি আয় বাড়াতে জোর প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে। ডলার আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ডলার ব্যয়েও কৃচ্ছ্রতা অনুসরণ করতে হবে। এখন সরকার ডলার ব্যয়ের রাশ টেনে ধরছে, আয় বাড়াতে বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা অর্থনীতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।  

স্থিতিশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে অনেক বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এ কারণে বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সময়ে ওইসব দেশের জনগণকে চড়া মূল্য দিতে হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলো গত কয়েক বছর উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে ডলারের দাম সমন্বয় করার দরকার ছিল। কিন্তু সেটি না করে টাকার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখা হয়েছে। সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে। এজন্য বিদেশী ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। দেশের আমদানি ব্যয় ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অথচ রেকর্ড এ আমদানির কোনো প্রতিফলন অর্থনীতিতে নেই। আমদানি-রফতানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকানো যায়নি। কী পণ্য আমদানি হয়েছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। 

রিজার্ভ কমে ২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে—বিষয়টি আমলে নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়নে কাজ করা। স্মর্তব্য যে রিজার্ভে ধাক্কা, অর্থনৈতিক চাপ—এ বিষয়গুলো এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। প্রসঙ্গত এটাও বলা দরকার, আকু হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা। এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রফতানি হয় আকুর মাধ্যমে দুই মাস পরপর তা নিষ্পত্তি হয়। তবে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয়। আকুর সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। যদিও দেনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলংকা আকু থেকে বাদ পড়েছে। এটা বিবেচনায় নেয়া দরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ২০২১ সালের আগস্টে। কিন্তু একটা সময় ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পর রিজার্ভ কমতে শুরু করে। সরকারের ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি দায় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিয়ত রিজার্ভ থেকে ডলারও বিক্রি করছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে মার্কিন এ মুদ্রার দামও বাড়তে শুরু করে। ডলারের ওপর চাপ কমাতে ঋণপত্র খোলায় কড়াকড়ি আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শতাধিক পণ্যে বাড়তি শুল্ক বসায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এতে ঋণপত্র খোলা কমেছে। তবে আমদানি দায় পরিশোধ কমেনি। কারণ আগের ঋণপত্র এখন নিষ্পত্তি হচ্ছে। আবার বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপও আছে। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নেয়া জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির দেনা ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করায় এবং রফতানি ও রেমিট্যান্স খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে এমন বিষয়ও জানা গেছে। এটাও লক্ষণীয়, রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তার পরও রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো যাচ্ছে না। আমদানি কমার কারণে দেশের শিল্প ও পণ্যমূল্য খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে গেছে—এসব বিষয় সামনে আসছে যা এড়ানোর সুযোগ নেই। রিজার্ভ কমে আসা এবং অর্থনৈতিক চাপ—এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এমনটি কাম্য।

রিজার্ভ ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাপকভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণের নীতি অনুসরণ করার পরও রিজার্ভ হ্রাস দুশ্চিন্তার। সব মিলিয়ে রিজার্ভের বর্তমান অবস্থা যে সন্তোষজনক নয়, এটি বলা যায়। কাজেই এ ব্যাপারে এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় বন্ধ করার পাশাপাশি রফতানি ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি। বস্তুত দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশই আসে রফতানি ও প্রবাসী আয় থেকে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে নিট প্রবাসী আয় কমেছে। রফতানি আয়ও খুব সন্তোষজনক নয়। এছাড়া ভ্রমণ, চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া—এসব খাতেও বৈদেশিক মুদ্রা খরচের পরিমাণ বেড়েছে বলে ধারণা করা যায়। 

বস্তুত সারা বিশ্বের মতো এ দেশের অর্থনীতিও একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। দেশের অর্থনীতিতে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে রিজার্ভ সংকট অন্যতম। রিজার্ভ সংকটের কারণে দেশে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে। একদিকে অর্থনীতির নানামুখী সমস্যা রিজার্ভ সংকট সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে রিজার্ভ সংকট অর্থনীতির অন্যান্য সমস্যাকে তীব্রতর করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার খোঁজার পাশাপাশি চলমান শ্রমবাজারগুলোয় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন রফতানি বাজার অনুসন্ধান ও পণ্যে বৈচিত্র্যকরণে জোর দিতে হবে।