গত এক যুগে দেশের তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের যেমন অগ্রগতি হয়েছে, তেমনি অনেক বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। সরকার বড় ধরনের বিনিয়োগ করলেও অনেক বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত আয়ও আসেনি। হাই-টেক পার্ক, ডিজিটাল ল্যাব সেন্টার, ইনকিউবিশন সেন্টার তৈরি করলেও তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরকারের বিনিয়োগ, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. সামসুল আরেফিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরফিন শরিয়ত

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরের কথা বলেছিল। গত এক যুগে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে?

২০০৯-এর আগের সময় এবং বর্তমানের যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতের তুলনা করলে বুঝতে পারবেন কতটুকু সম্ভব হয়েছে। সামগ্রিক ডিজিটাল পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য পাবেন। ডিজিটাল মোবাইল ট্রান্সজেকশন, ইউটিলিটি বিল প্রদান, দূর যোগাযোগসহ নানা খাতের ডিজিটালাইজেশন হয়েছে। সব খাতেই যে হয়েছে তা নয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। কালকের মধ্যে যে শেষ হবে তাও নয়। সব কিছু ধীরে ধীরে ডেভেলপড হয়ে ডিজিটালাইজেশনের দিকে যাচ্ছে। আমাদের সব কার্যক্রম চলমান আছে। এ প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাচ্ছি। 

প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছানো, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ বিশেষায়িত মানদণ্ডে ডিজিটাল হয়েছে কতটুকু?

ফাইবার অ্যাক্টিভ কেবল তো আগে ছিল না। এর জন্য আইসিটি ডিভিশনে একটি প্রকল্পও আছে—ইনফো সরকার-৩। এর মাধ্যমে একদম ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল যোগাযোগ পৌঁছে দিচ্ছি। আমাদের একটি প্রকল্প আছে, এনহ্যান্স ডিজিটাল কানেক্টিভিটি। এর মাধ্যমে স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানে এ সংযোগ পৌঁছে যাচ্ছে। তাদের মাধ্যমে আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) ঘরে ঘরে সংযোগ পৌঁছে দেবে। বেসরকারি পর্যায়ে টেলিকম অপারেটররা সংযোগ পৌঁছে দিচ্ছে। সবার হাতে এ সুবিধা পৌঁছায়নি, তা ঠিক। তবে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। 

প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা বলা হচ্ছে। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য কী কী পরিকল্পনা করছেন?

আমরা যে চারটি পিলারের কথা বলছি, তার মধ্যে একটি স্মার্ট সিটিজেন। প্রতিটি নাগরিককে প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলির মধ্যে থাকবে প্রযুক্তির অবস্থান। তেমনি স্মার্ট বাংলাদেশের চারটি পিলারের প্রতিটির একটি মানদণ্ড রয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য ১৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির প্রধান করা হয়েছে মন্ত্রীদের। এর মধ্যে সব মন্ত্রণালয় চলে এসেছে। যার যার কমিটি অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছি আমরা। কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয়ে গেলেই আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য কাজ শুরু করব। এ কর্মপরিকল্পনার মধ্যে স্বল্প স্থায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেভাবে কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করব। 

সরকার হাই-টেক পার্ক, ইনকিউবেশন সেন্টার, শেখ রাসেল ল্যাব সেন্টার স্থাপন করছে। সরকারের এসব বিনিয়োগ কতটুকু কার্যকর হচ্ছে? 

ঢাকার কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে হুন্দাই, স্যামসাং, নকিয়ার মতো বড় বড় কোম্পানি বিনিয়োগ করছে। দেশে গাড়ি উৎপাদন হচ্ছে, মোবাইল উৎপাদন হচ্ছে। অনেক ইলেকট্রনিক, ইলেকট্রিক পণ্য আপনি পাবেন যেগুলো দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। আগে যেগুলো পাওয়া যেত না। সরকার অনেক বেসরকারি হাই-টেক পার্ক ঘোষণা করছে। 

অবকাঠামো তৈরি না করলে বিনিয়োগ পাওয়া যাবে না। বিনিয়োগ একদিনে আসে না, এর জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। বিনিয়োগকারীরা যাবতীয় বিষয় পর্যালোচনা করেন, বিশ্বাস তৈরির পর বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করবেন। অবকাঠামো না থাকলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখানে আসবেন না। সেজন্য আমরা অবকাঠামো তৈরি করছি। রীতিমতো এখানে অনেক বিনিয়োগ এসেছে, আরো বিনিয়োগ আসবে। অনেকেই কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন, অনেকেই সামনে শুরু করবেন। 

আইসিটি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাচ্ছে না। যে বিনিয়োগ এসেছে তা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যৎসামান্য। বড় ধরনের বিনিয়োগ আসছে না কেন?

আইসিটি খাতে পার্শ্ববর্তী ভারত, প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম উন্নতি করেছে। তারা যে একদিনে করেছে এমনটি নয়। আমাদেরও ধীরে ধীরে হবে। চীনে আগে ছোট ছোট কাজ হতো, একসময় তারা ছোট কাজ না করে আমাদের মতো দেশে চলে এল। বড় বড় কোম্পানি সেসব দেশে বিনিয়োগ শুরু করল। তারা আইটি পার্কগুলো ঘুরে দেখে গেছে। আশা করছি, শিগগিরই তারা আবার আসবেন। 

গত এক দশকে অনেক কোম্পানি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে তারা আর বিনিয়োগ করেননি। এর কারণ কী?

কোম্পানিগুলোর অনেক ব্যাপার থাকে। চুক্তি হলেই যে বিনিয়োগ করবে তা নয়, তারাও নিশ্চয়ই পর্যালোচনা করেছে। তারা না হলে অন্যরা আসবে। গত ১৫ বছরে দেশে সেই ইকোসিস্টেম, অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এটা আমাদের সক্ষমতাকে প্রকাশ করে। এ ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন। 

আইসিটি রফতানির আকার খুব আশাব্যঞ্জক নয়। আমাদের সপ্তম ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৫ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এক দশকেও তা অর্জন সম্ভব না হওয়ার কারণ কী?

আইসিটি খাতে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সফটওয়্যার খাতে রফতানির চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের শুধু সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে থাকলে হবে না, হার্ডওয়্যারের দিকে নজর দিতে হবে। সফটওয়্যার খাতটি ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দখল করে ফেলবে। অতএব, এ জায়গা নিজেদেরও তৈরি করতে হবে। যারা সফটওয়্যার তৈরি করে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে আরো দক্ষ হতে হবে এবং ভাবতে হবে। হার্ডওয়্যার খাতে আমাদের আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন। এরই মধ্যে আমাদের এখানে ল্যাপটপ, মোবাইল, মনিটর উৎপাদনের মতো অনেক বিনিয়োগ হয়েছে। আরো বিনিয়োগ আসার প্রয়োজন রয়েছে। আমদানি কমাতে পারলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং রফতানি করতে পারলে তবে তা আরো বেশি টেকসই হবে। 

দেশের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলো বেশি টেকসই নয়। অবকাঠামো নির্মাণের কিছুদিন পর সেগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া, প্রশিক্ষকের অভাবে কার্যক্রম বন্ধ থাকার মতো ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে আপনারা ভাবছেন কিনা?

টেকসইভাবে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের কিছুটা অভিজ্ঞতা থেকে নিতে হয়। একদিনে তো সবকিছু বোঝা যায় না। ল্যাবগুলো পরিচালনার জন্য আগে আমরা আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এখন আর করছি না। এখন স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি আমরা। প্রতিটি স্কুলের অন্তত পাঁচজন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে দিচ্ছি। বাইরের শিক্ষকদের দিয়ে টেকসই করা যাবে না। 

ল্যাপটপের মেয়াদ থাকে চার-পাঁচ বছর। এক্ষেত্রে চার-পাঁচ বছর পর পর আমাদের পুনরায় নতুন ল্যাপটপ রিপ্লেস করতে হয়। আমাদের দেশে তো অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতগুলোয় একসঙ্গে রিপ্লেসমেন্ট করা সম্ভব হয় না। সেজন্য আমরা ধাপে ধাপে রিপ্লেসমেন্টের চিন্তা করছি। সমস্যা আছে, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি আমরা। 

প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদের অভাবের অভিযোগ বরাবরই করা হয়। অভিযোগ থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে অনেকগুলো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলো কতটুকু কার্যকর হচ্ছে? 

আমাদের তরুণ জনশক্তি অনেক। এলইডিপি, লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক ফ্রিল্যান্সার আমরা তৈরি করেছি। কিন্তু ফ্রিল্যান্সাররা দৃশ্যমান নয়। সাধারণত ফ্রিল্যান্সাররা নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করে থাকে। সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার আমাদের ছিল, এ সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা গার্মেন্টসের কর্মজীবীদের দেখি, তারা দৃশ্যমান কিন্তু ফ্রিল্যান্সাররা দৃশ্যমান নয়। 

আমরা নারীদের জন্য ‘হার পাওয়ার’ নামে একটি কর্মসূচি শুরু করেছি। এর মাধ্যমে নারীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি একটি করে উচ্চ প্রযুক্তির ল্যাপটপও আমরা দিচ্ছি। বেসরকারি খাতকেও আমরা উৎসাহিত করছি। বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত না করলে আমাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। 

বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া রিলেশনের জন্য আপনারা কী করছেন? 

আমরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে চিহ্নিত করেছি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের গবেষণা সেন্টার তৈরি করব। এর সঙ্গে আমরা ইন্ডাস্ট্রিকে সংযুক্ত করে দেব। গবেষণা এক তরফা হয় না। গবেষণা করলে তা যদি ইন্ডাস্ট্রি না পায় তাহলে সে গবেষণার প্রায়োগিক অবস্থান থাকে না। আবার গবেষণা অবকাঠামো তৈরিতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। বেসরকারি খাত অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ করে না সাধারণত। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সেন্টার ব্যবহার করে নিজেদের আউটপুট বের করে নিতে পারবে।