পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে বাড়ছে কম্পিউটার ও প্রযুক্তির আওতা। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে, বিশেষ করে চাকরির প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিতে প্রয়োজন কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা। বর্তমানে যেকোনো বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কমবেশি এ-সংক্রান্ত দক্ষতা থাকা বাঞ্ছনীয়। তবে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ও ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইটি) বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মৌলিক কোডিংয়ের দক্ষতা থাকা অতি আবশ্যক; তাদের ডিগ্রি অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো কোডিংয়ে দক্ষতা অর্জন। কিন্তু বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোডিংয়ের মৌলিক দক্ষতা অর্জন ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে বেরিয়ে আসছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী। যদিও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এসব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের অন্তত চারটি কোডিং সংক্রান্ত কোর্স (কমপক্ষে ১৬-১৮ ক্রেডিটের) পড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দক্ষতার অভাবে চাহিদা থাকলেও প্রয়োজনীয় মাত্রায় সিএসই ও আইটি স্নাতকদের নিয়োগ দিতে পারছেন না চাকরির বাজারের নিয়োগদাতারা। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) এক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএস বা আইটি কোর্সে উত্তীর্ণ হয়ে এলেও চাকরির লিখিত পরীক্ষায় মৌলিক কোডিং, ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়ে ফেল করছেন ৮০ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে মৌলিক কোডিংয়ে ফেল করা প্রার্থীর সংখ্যাই তুলনামূলকভাবে বেশি। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক প্রোগ্রামিং সম্পর্কিত কোর্সগুলোর যথাযথ পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর দিকেও নজর দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া চাকরির বাজারের জন্য শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত করতে হলে পেশাগত ক্ষেত্র বিবেচনায় সিএসই ও আইটি বিষয়ক পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজানো উচিত। সময়োপযোগী ও হাতে-কলমে প্রকৃত কারিগরি শিক্ষাদান ছাড়া স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলা সম্ভবপর বলে প্রতীয়মান হয় না।  

জাতিসংঘের হিসাবমতে, আগামী ১৫ বছরে তরুণদের জন্য অন্তত ৬০০ মিলিয়ন নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে, যার অনেকগুলোই হয়তো এখন আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। তবে সেসব কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য দরকার পড়বে নতুন দক্ষতার। তার মধ্যে হার্ড স্কিল তথা নির্দিষ্ট চাকরিকে টার্গেট করে বিষয়ভিত্তিক কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন সর্বাপেক্ষা বেশি। জার্মান উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেডেরিক-ইবার্ট-স্টিফটাংয়ের (এফইএস) ও বাংলাদেশের সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘স্কিলস গ্যাপ ও ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়ার পর নিয়োগ দিতে গিয়ে কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন আবেদনকারী খুঁজে পেতে। অর্থাৎ যুবকদের কর্মসংস্থানে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় বাধা দক্ষতা। বিশ্বব্যাংকের জরিপও একই কথা বলছে—শতকরা ৪৬ ভাগ চাকরিদাতা চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা পান না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও সমপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারী উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে ১২ শতাংশ বেকার। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএসের) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে স্নাতক পাস করা বেকার শতকরা ৬৬ ভাগ।

শিক্ষিত তরুণদের এ বেকারত্বের জন্য অন্যতম কারণ দক্ষতার অভাব। এছাড়া এ পরিসংখ্যান প্রশ্ন তুলছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান নিয়ে; যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শ্রমবাজারে যুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা আবশ্যক। 

উন্নত দেশগুলোয় শিল্পের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পাঠ্যক্রম তৈরি হলেও আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলাম সেভাবে তৈরীকৃত নয়। ফলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের স্কিল চায় সেগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে ওঠে না। শিক্ষার্থীদের শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে পাঠ্যক্রম বাস্তব চাহিদাকে মাথায় রেখে সাজানো উচিত এবং তা অব্যশই সময়োপযোগী হওয়া দরকার। 

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিএসই, আইসিটি, আইটি ও আইসিই বিষয়ের পাঠ্যক্রম নিয়ে ২০২২ সালে একটি নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এ নির্দেশনায় অত্যাবশ্যকীয় প্রোগ্রামিং কোর্সে রাখা হয় ১৬-১৮ ক্রেডিট। কিন্তু শিক্ষার্থীসহ খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ‘বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই এ নির্দেশনা মানা হয় না কিংবা যারা পরিপালন করছে তারাও দায়সারাভাবে কাজটি করে থাকে। এডিবির পর্যবেক্ষণ জানাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলামে হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগ ও প্রোগ্রামিংয়ের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (প্রবলেম সলভিং স্কিল) বাড়ানোর মতো কোর্স কম। সিএসই ও আইটিতে যে পরিমাণ ক্রেডিট বরাদ্দ থাকার কথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার মাত্র ৩০ শতাংশ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চেয়েও কম বরাদ্দ রাখা হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক ও ল্যাব সংকটও রয়েছে। আবার কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড সফটওয়্যারের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের চিত্র নিয়ে ২০১৯ সালেও একটি জরিপ করেছিল এডিবি। ওই জরিপে দেখা যায়, সিএসই ও সফটওয়্যারের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই স্নাতক-পরবর্তী এক বছর বেকার থাকেন। স্নাতক শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে চাকরি পান মাত্র ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। 

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী সিএসই ও আইটিতে অধ্যয়ন করছেন। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে প্রতি বছরই স্নাতক সম্পন্ন করেন ১২ হাজারের মতো শিক্ষার্থী। তবে এর বিপরীতে দেশের আইটি শিল্পে প্রতি বছর জনবল নিয়োগ হয় কেবল পাঁচ হাজার। অর্থাৎ প্রতি বছর চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি শিক্ষার্থী এ দুই বিষয়ে স্নাতক করছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে চাকরিপ্রত্যাশীদের সিংহভাগই বেকার থাকছেন। এ সমস্যা সমাধানে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন করতে হবে পেশাগত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে; হাতে-কলমে মৌলিক কোডিংয়ে দক্ষতা বাড়নোয় জোর দিতে হবে। মৌলিক কোডিং শেখানোর পাশাপাশি গণিত ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

শিক্ষকদের পাঠদানের কৌশল ও দক্ষতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছাড়া কেবল পাঠক্রমে পরিবর্তন আনয়নে সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে শিক্ষকরা যদি পরীক্ষার প্রশ্নে সৃজনশীলতার ছাপ রাখেন, সেটিও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।