ঋণ বিতরণে যে ভারসাম্যপূর্ণ শৃঙ্খলা থাকা দরকার সেটি ভেঙে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে। বড় গ্রহীতাদের আগ্রাসী ঋণ দিয়েছে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকই। এতে লঙ্ঘিত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া সীমা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র উল্লেখপূর্বক বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক—সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক লিমিটেড নির্ধারিত সীমার বেশি ঋণ দিয়েছে বড় গ্রহীতাদের। দুঃখজনক বিষয় হলো, কয়েক বছর ধরেই এমন প্রবণতা বিদ্যমান থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। দুই বা তিনটি বড় গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে পুরো ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়বে। সীমার বাইরে ঋণ দেয়ায় ঋণ শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ের চিত্রও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বড় অংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অধিকারে। এ অবস্থায়  বড় গ্রহীতাদের অতিরিক্ত ঋণ দিয়ে খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে গেলে ব্যাংকের পাশাপাশি আমানতকারীদেরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো ঘটেছে। ফলে এ বিষয়ে আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ঋণ প্রদানে বিদ্যমান বিধান পরিপালনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উদাসীনতা কাম্য নয়। এতে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়বে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। 

গত এক যুগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে। কোনো ঘটনার সম্পূর্ণ বিচার হয়নি। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বড় সমস্যা রাজনৈতিক প্রভাব। পরিচালনা পর্ষদ গঠন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ থেকে শুরু করে ব্যাংকঋণ প্রদানে রাজনৈতিক প্রভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদকের কাছে একাধিক শীর্ষ নির্বাহী ক্ষমতাবানদের নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রভাবশালীদের ঋণ দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দৈন্যদশাকেই তুলে ধরে। সোনালী ব্যাংক ছাড়া বাকি তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বেসরকারি খাতের বড় গ্রহীতার কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এটি ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।  

গত এক দশকে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে দেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কতগুলো বিধিনিষেধ রয়েছে। একটি ব্যাংক মোট আমানতের কতটুকু ঋণ দেবে, তা নির্ধারিত। বিধান আছে, নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য ঋণ নিতে পারবেন না। সিঙ্গেল এক্সপোজার লিমিটও আছে, অর্থাৎ একটা প্রতিষ্ঠানকে কত ঋণ দেয়া যাবে। অনেক ব্যাংকই এটি যথাযথভাবে পরিপালন করছে না। এ কারণেই একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে অনেক ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণ অনেক বেশি। ব্যাংক পরিশোধিত মূলধনের ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ঋণ দিতে পারবে, তাও রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনে। বড় ঋণগ্রহীতাসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং কৃষি খাতে ঋণের কত শতাংশ দিতে হবে, সেটিও নির্দিষ্ট করা রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যেন এর কোনো কিছুই অনুসরণ করছে না। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন ব্যবস্থা নেয় না। এক্ষেত্রে বাধা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ। অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা না নেয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় অনিয়ম স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। এটি ব্যাংক খাতের জন্য ভালো উদাহরণ নয়। 

ব্যাংকের ঋণ শৃঙ্খলা ভেঙে যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বেনামে ঋণ। দেশে খেলাপি ঋণ বিস্তারের অন্যতম কারণ অব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ। আধিপত্যের কারণে ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি ঋণখেলাপির ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এসব ঘটনা ব্যাংক খাতে বিরাজমান বিশৃঙ্খলারই নামান্তর। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংককে অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে দূরে রাখতে আইনের কঠোর প্রয়োগ, জবাবদিহি ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক খাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠন করারও দাবি রয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। ব্যাংকগুলোর কর্মকাণ্ড সূক্ষ্মভাবে তদারক করতে হবে। ২০১৪ সালে আর্থিক খাতে দুর্নীতি রোধ ও শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকে জরুরি সংস্কারের সুপারিশ করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবদিহি, দক্ষতা ও নজরদারি কী করে আরো শক্তিশালী করা যায়, সেটাই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

ব্যাংক ব্যবস্থাকে দ্বৈত শাসনের কবল থেকে উদ্ধার করে একক রেগুলেটরি বডি অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেয়া দরকার। হলমার্ক কেলেঙ্কারি প্রথম উদ্ঘাটন হওয়ার পর করণীয় নির্ধারণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছিল। অর্থাৎ দুর্ঘটনার দায় কেউ নিতে চায় না। কিন্তু একক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না। আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি ব্যাংকগুলোর অডিট রিপোর্ট পায়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। শুধু বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। একই দেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের জন্য দুই ধরনের আইন থাকা অনুচিত। পাশাপাশি জাতীয় সংসদের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জবাবদিহি করার বিধানও রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুপারিশই বাস্তবায়ন করা হয়নি। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বিবেচনায় আনা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা আরো বাড়ত, বাড়ত স্বচ্ছতাও। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্তিশালী করতে আরো দুই দফা বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানো হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক শেষ পর্যন্ত ওই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেনি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, শক্তিশালী আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট তৈরিসহ সার্বিক কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। 

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার বড় চ্যালেঞ্জ এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা সরকারের সামনে। শক্ত হাতে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য সর্বপ্রথম ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দ্রুতই আর্থিক খাতের বিদ্যমান অবস্থার উন্নতি না ঘটলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় ভূমিকা রয়েছে। ব্যাংক খাতের সুশাসন একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের নিয়মনীতি আরোপ করে, বিধিমালা প্রয়োগ করে ও কিছু সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ব্যাংক খাতকে মোটামুটি একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তী সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতিকে নানাভাবে প্রশ্রয় দিয়ে এ শৃঙ্খলাকে শিথিল করে ফেলা হয়, তৈরি করা হয় একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি। শেষ পর্যন্ত যদিও সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু কঠোরতা আরোপের চেষ্টা করেছে, তার পরও যে বিরাট ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাই  সত্যিকারভাবে সক্রিয় হতে হবে,  যেন ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর গৌরব ফেরাতে হলে সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বন্ধ করতে হবে তদবির বা সুপারিশে ঋণ অনুমোদন।