নিজ পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অর্থকষ্টে জীবন অতিবাহিত করছে দেশের মানুষ। বাড়তি ব্যয়ের কারণে বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৭৩ শতাংশ স্বাস্থ্য ব্যয় মানুষের নিজস্ব পকেট (আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার) থেকে মেটাতে হয়। ফলে প্রতি বছর গড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। আর দেশের মোট দারিদ্র্যের হার চলে যাচ্ছে ২২ শতাংশের ওপরে। প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিজ পকেট ব্যয় সবচেয়ে বেশি। এর অর্থ হলো দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ব্যয় কম; বিআইডিএসের উল্লিখিত হিসাবে মাত্র ২৭ শতাংশ। এছাড়া এ পরিসংখ্যান থেকে এটিও প্রতীয়মান হয় যে দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। এজন্য মূলত দায়ী স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিতভাবে অর্থ ব্যয়। এমনিতেও দেশে প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম। তার ওপর বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহারে রয়েছে প্রশাসনিক অক্ষমতা, অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতা। ফলে বরাদ্দের অর্থও অর্থবছর শেষে ফিরে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এদিকে মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ছে; দরিদ্র বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি বিফলে যাচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম রাখা এক ধরনের প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ। 

সদ্য বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। এ হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৩ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। দেশে বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এ বরাদ্দ বাড়েইনি বললে সেটি অত্যুক্তি হওয়ার কথা নয়। ‍যদিও বিদায়ী অর্থবছর বরাদ্দের পুরো অর্থ খরচ করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছর তাই বরাদ্দ কমানো হয়েছে বলে দাবি সরকারের।

প্রায় ১৭ কোটির বেশি মানুষের বাস যে দেশে, সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ বরাদ্দ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। করোনা মহামারী বিবেচনায় ২০২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ১০০ কোটি টাকা গবেষণার জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। সেই বরাদ্দের যথাযথ ব্যয় না হওয়া বাজেট সঠিক ব্যবহারে ব্যর্থ হওয়ার একটি মাত্র উদাহরণ। বলা যায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অর্থ ব্যয় না হওয়ার অন্যতম কারণ। ডাক্তার আর আমলাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এ জটিলতার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। তবে তার আগে বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারাটা জরুরি। এজন্য প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। ডাক্তার ও আমলাদের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। তা না হলে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর আর্থিক চাপ আরো বাড়বে। 

স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। এ মৌলিক অধিকার পূরণ করতে গিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ নিঃস্ব হবে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন জানায়, গত এক বছরে হাসপাতালগুলোয় সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়া রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার ফি বেড়েছে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৪০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। একই সময়ের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ ফি ও ওষুধের ব্যয় বেড়েছে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালে, এ ব্যয় বেড়েছে ৫০-১০০ শতাংশেরও বেশি। 

সুতরাং সরকারের এ বিষয়ে আরো আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। কোনো দেশের উন্নয়নে নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের স্বাস্থ্য যদি ঠিক না থাকে তাহলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের চিকিৎসা খাতের ৬২ শতাংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এ খাতে সরকারের অবদান বাড়লে মানুষের ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয় কমবে বলে আশা করা যায়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে ভালো করতে হলে বেসরকারি খাতের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি। ১৯৮২ সালে প্রণীত বেসরকারি হাসপাতাল অর্ডিন্যান্সের আধুনিকায়ন করা দরকার। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়কে শক্তিশালী করতে হবে। তাদের ক্ষমতায়ন করে জেলা ও উপজেলার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি সরকারিভাবে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এজন্য স্বাস্থ্য বীমার পরিসর বাড়ানো জরুরি। স্বাস্থ্যসেবা প্রদান রাষ্ট্রের দায়িত্বও বটে। কিউবা স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে জনগণের চিকিৎসার শতভাগ খরচ বহন করে। যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্য বীমা ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৫-৮৫ শতাংশ বহন করে। বাংলাদেশের জন্য এদের বীমা ব্যবস্থা অনুসরণীয় হতে পারে। 

দিন দিন দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। কিছু অসংক্রামক রোগ যেমন হৃদরোগ, কিডনি বিকল, নানা ধরনের ক্যান্সার ইত্যাদির চিকিৎসা ব্যয় অধিকাংশের সামর্থ্যের বাইরে। এসব ব্যয়বহুল রোগের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বীমা অত্যন্ত জরুরি। তাহলে স্বল্প আয়ের মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখান থেকে মেটাতে পারবে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস প্রভৃতি অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদেরও স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষায় জোর দিতে হবে। কেবল শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে নির্দেশ করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো শিশু কোনো রোগ নিয়ে জন্মানোর অর্থ হলো সে জিনগতভাবে রোগাক্রান্ত। সুতরাং শিশু জন্মানোর আগে তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাও আবশ্যক। এতে দারিদ্র্য কমবে, সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।