বছর দেড়েক ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নানা সংকট চলছে। রিজার্ভ পতন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম, বৈদেশিক ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোসহ অর্থ পাচার বেলাগাম। এর সঙ্গে যুক্ত আছে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাসের প্রবণতা। গত বছরের শেষের দিকে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করেছেন তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা। এ নিয়ে পশ্চিমা ক্রেতা দেশগুলো থেকে নিষেধাজ্ঞার ভয় জেঁকে বসেছে। এমন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন বয়কট করেছে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল। 

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা আনয়ন। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। অর্থনীতির ভিতকে ক্রমাগত দুর্বল করছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমাগত ক্ষয়। শ্লথ হয়ে এসেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দুই প্রধান উৎস রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও। এতে প্রায় দুই বছর ধরে চলে আসা ডলার সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। 

আমদানি এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমিয়েও ডলার সংকট কাটাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতে তীব্র হয়ে উঠেছে তারল্য বা নগদ টাকার সংকট। স্থবিরতা চলছে বেসরকারি বিনিয়োগেও। দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ বাড়ছে সরকারের। বিপরীতে কমছে রাজস্ব আহরণ। অর্থ সংকটে পড়ে বিদ্যুৎ, সারসহ বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি ও প্রণোদনার অর্থও পরিশোধ করতে পারছে না সরকার। সরকারের তরফ থেকে বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে ভর্তুকির দায় পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। স্থবিরতা চলছে দেশের পুঁজিবাজারেও।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ‘বাধা প্রদানকারী’ বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচন কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞারও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের রফতানির ৬২ শতাংশই হয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোয়। এসব দেশ এখন বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রধানতম উৎসও। এ অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ বাড়লে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট আরো তীব্র হয়ে ওঠার বড় আশঙ্কা রয়েছে। 

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামীর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচন কেন্দ্র করে পশ্চিমাদের কাছ থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধের মতো কঠোর কোনো পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) পরিস্থিতির ওপর। সরকার যদি নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াবে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল চাঙ্গা। কিন্তু দুই বছরের করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া অনেক সংকট ২০২৩ সালে এসে আরো গভীর হয়েছে। এর অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সব দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি ও ফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ওই সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের তুলনায় স্থিতিশীল ছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকায় সীমাবদ্ধ। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হারও ছিল ৫ শতাংশের ঘরে। সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার। 

কিন্তু বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রায় সবক’টি সূচকই নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের স্থিতি এখন প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। বিপরীতে আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের গ্রস রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর থেকে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। গত ৩০ নভেম্বর দেশের গ্রস রিজার্ভ ২৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত ঋণ ও বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৭ ডিসেম্বর গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ২৬ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে। ওইদিন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। তবে একই দিন দেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। মূলত আইএমএফ থেকে ঋণ প্রাপ্তির শর্ত পূরণ করার জন্যই বাজার থেকে ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

রাজনৈতিক অস্থিরতার এ সময়ে দেশের অর্থনীতি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এর ধাক্কাটা সবচেয়ে বেশি পড়ছে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন ঋণমান পূর্বাভাসদাতা প্রতিষ্ঠান এখন দেশের ঋণমান নামিয়ে দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ও সরবরাহ কমার পাশাপাশি টাকার টানা অবমূল্যায়ন অর্থনীতিতে নিম্নমুখী চাপকে আরো জোরালো করে তুলেছে। ‌অর্থনীতির এখনকার চ্যালেঞ্জগুলো আগেও নানা মাত্রায় ছিল। কিন্তু সে সময় এগুলো মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এখন এমন এক পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে যখন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‌দ্রুত ও জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নেয়া হলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে হুমকিতে পড়তে পারে। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৩ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। আর বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এ সময় খাদ্যশস্যের দামও কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয়ও এ সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে এর কোনোটিরই ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। পণ্যের দাম না কমে উল্টো গত এক বছরে দেশে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। গত বছরজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল ছিল দেশের সাধারণ মানুষ। বছর শুরুর মাস তথা জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর নভেম্বরে এসে সে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়। মাঝে অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার সরকার প্রকাশিত এ পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।

নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটগুলো প্রশমনে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি নতুন সরকারের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‌রিজার্ভ বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। সেজন্য অর্থনীতির চাকা আরো সচল রাখতে হবে। অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দরকার হবে এবং সেগুলোর দিকে নজর বেশি দিতে হবে। অনেক সংস্কারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। দেশের ভেতরের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বহিঃঅর্থনীতির জায়গাটাও চ্যালেঞ্জিং। রেমিট্যান্স কীভাবে বাড়ানো যায়, রফতানিকে আরো কীভাবে গতিময় করা যায়; সেটির উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টকে ইতিবাচক ধারায় আনতে হবে। দেশের নিজস্ব অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী থাকলে আন্তর্জাতিক চাপ যতই থাকুক না কেন, সেটি মোকাবেলা করা যাবে। 

অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূরীকরণও জরুরি। রাজনীতিতে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকলে অর্থনীতি চাঙ্গা করা বেশ দুরূহই হবে। সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট কাটবে এবং অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসবে—নতুন সরকারের কাছে এমন প্রত্যাশাই থাকবে সবার।