বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশই উন্নত জীবনের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। অবৈধভাবে মানব পাচারকারীদের হাত ধরে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে কেউ কেউ জীবন ও হারাচ্ছেন। আবার অনেকেই অমানবিক নির্যাতন, অপহরণ ও পাচারের শিকার হন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য বলছে, স্থল ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশীদের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে ইউরোপের পাঁচটি দেশ—ইতালি, গ্রিস, মাল্টা, সাইপ্রাস ও স্পেন। এর মধ্যে ইতালি শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, মন্টেনিগ্রো ও কসোভোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন বাংলাদেশীরা। ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসন সম্পর্কে গভীর উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, চলতি বছরেই প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশী অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন। তবে এ বছর নয় হাজার বাংলাদেশী নাগরিককে ভিসা দিয়েছে ইতালি সরকার। এ ধরনের অবৈধ অভিবাসন বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ও দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছে। বাংলাদেশের জনশক্তির আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের এটাই বড় সংকট। তাই অভিবাসন হতে হবে বৈধ পথে। আর অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হবে। অবৈধ পথে অভিবাসন বন্ধ করতে হলে বৈধ পথে প্রশিক্ষিত জনশক্তি রফতানির পাশাপাশি দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে জোর দেয়া আবশ্যক।
বাংলাদেশের পাবলিক ডকুমেন্টস বা সরকারি কাগজপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ইতালির প্রশ্ন রয়েছে বলেও রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অনেক সময় এমন নথি ইতালির কনস্যুলার দপ্তরে আসে, যা বাংলাদেশের সরকারি অফিস থেকে ইস্যু করা বলে মনে হয়। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের পর দেখা যায় তাতে ভুল তথ্য বা ভুয়া উপাত্ত রয়েছে। ফলে কনস্যুলার সেবায় নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের সরকারি কাগজপত্রের দুর্বলতা, জালিয়াতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্রকেই প্রতিফলিত করছে। সরকারি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে যদি তথ্য বিকৃতির সুযোগ থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিদেশী রাষ্ট্রগুলো সরকারি নথির ওপর নির্ভর করেই ভিসা, কর্মসংস্থান বা অভিবাসন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তাই তথ্যভিত্তিক সঠিক ও স্বচ্ছ নথি প্রদান শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষার অন্যতম শর্তও। অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হলে আগে দেশের ভেতরে সরকারি কাগজপত্র ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
চলতি বছরের ৬ মে অবৈধ অভিবাসন বন্ধ ও বৈধ অভিবাসন বাড়ানোর লক্ষ্যে ইতালি ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড মোবিলিটি’ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই হলো সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইতালির চাহিদা অনুযায়ী বৈধ পথে বাংলাদেশী কর্মী পাঠানো সহজ হবে। ইতালিতে দুই লাখের বেশি বাংলাদেশী অভিবাসী আছেন, যাদের একাংশ বৈধ কাগজপত্র নিয়ে যাননি। গত বছরের নভেম্বরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ইতালিতে ৬০ হাজার পাসপোর্ট আটকে আছে—এ তথ্য জানিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের সব দেশে বৈধ পথে অভিবাসনের অনেক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আমরা যদি অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করতে না পারি তবে বৈধ পথে অভিবাসনের সুযোগ আমরা পাব না।
এ সম্ভাবনাকে অবশ্যই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। উন্নত জীবনের আশায় বহু বাংলাদেশী দালালদের খপ্পরে পড়ে বিদেশে গিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করেন। আবার অনেকে নিজেরাই দালালের মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমান। এ ধরনের অবৈধ অভিবাসন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইতালিসহ ইউরোপের দেশগুলোয় বৈধ অভিবাসন বাড়ানোর লক্ষ্যে এরই মধ্যে পর্তুগাল, অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের ছয়টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যা বিদেশে বৈধ পথে শ্রমিক যাওয়াকে উৎসাহিত করবে। এছাড়া গত ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি নতুন শ্রমচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ও সৌদি আরবের মানবসম্পদ মন্ত্রী এ চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে বিভিন্ন পেশায় দক্ষ কর্মী নিয়োগ বাড়বে এবং কর্মী ও নিয়োগকর্তার অধিকার ও স্বার্থ অধিকতর সুরক্ষিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে, যাতে অবৈধ পথে কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়। একশ্রেণীর জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান অবৈধ পথে বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে থাকে। এ কারণে ইতালিসহ জনশক্তি আমদানিকারক অনেক দেশের কাছে বাংলাদেশ বিপজ্জনক ভিসা তালিকায় আছে।
অবৈধ পথে জনশক্তি রফতানি বন্ধ করতে হলে দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদামতো দক্ষ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয় ১০৪ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান উপযোগী ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রশিক্ষিত করা হয়েছে পৌনে ১২ লাখের বেশি কর্মীকে। যদিও বিবিএসের আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপ ২০২৩-এর তথ্যমতে, সংশ্লিষ্ট কাজে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী। অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বিদেশ পাড়ি জমানোর আগে কর্মসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আবার ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশই দক্ষতা অর্জন করেন বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জনশক্তি রফতানিতে সম্ভাবনাময় গন্তব্যের নাম জাপান। আগামী ১৫ বছরে দেশটিতে এক কোটির বেশি কর্মী প্রয়োজন। কৃষিকাজ, নির্মাণ খাত, কেয়ার গিভার, অটোমোবাইল, শিপিংসহ ১৬ ক্যাটাগরিতে জাপানে জনশক্তি রফতানির সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ উল্লেখ করার মতো কর্মী পাঠাতে পারছে না। অন্যদিকে নেপাল, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যাচ্ছে দেশটিতে। ভাষা না জানা ও সংশ্লিষ্ট কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছি না আমরা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বৈধ পথে বিদেশী কর্মী পাঠানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তা কাজে লাগাতে হলে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান অবৈধ পথে বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অবৈধ পথে অভিবাসন শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে বিপদের কারণ নয়, এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ন করে। যদি দক্ষতা অর্জন ও সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায় তাহলে বৈধ পথে ইউরোপের দেশগুলোসহ মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি সহজ হবে। অবৈধ অভিবাসন রোধে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারকে দালাল চক্র দমন, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিদেশে বৈধ অভিবাসনের তথ্যপ্রবাহ জোরদার করতে হবে। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নথিপত্রের স্বচ্ছতা, সুশাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে ইতালিসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।










