যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে নানা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য অভিন্ন থাকলেও সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে প্রকল্পের খরচ ও ভোগান্তি বাড়ছে, সময়ক্ষেপণও হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে। বর্ধিত মেয়াদেও কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে না। অন্যদিকে একই স্থানে একাধিক প্রকল্পের খুঁটি স্থাপন করায় সড়কের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মূলত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ঢাকার আশুলিয়া থেকে বিমানবন্দর হয়ে কমলাপুর রুটে বর্তমানে একই সঙ্গে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের চারটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে আশুলিয়া-আবদুল্লাহপুর-বিমানবন্দর রুটে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। গাজীপুর-আবদুল্লাহপুর-বিমানবন্দরের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বাস রÅাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। বিমানবন্দর-তেজগাঁও-কমলাপুর রুটে চলছে ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’র কাজ। আর টঙ্গী থেকে কমলাপুরের মধ্যে বিদ্যমান রেলপথের সমান্তরালে নির্মাণ করা হচ্ছে তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ। আশুলিয়া-বিমানবন্দর-কমলাপুরের মধ্যে একসঙ্গে চার প্রকল্প চলমান থাকায় সবক’টির নির্মাণকাজে তৈরি হয়েছে ধীরগতি। এজন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি একই স্থানে প্রত্যেক প্রকল্পের জন্য আলাদা খুঁটি তৈরি করে বিদ্যমান সড়কের সক্ষমতাও কমিয়ে ফেলা হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
একই করিডোরে একই সময়ে এ চার প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে সবচেয়ে বেশি জটিলতায় পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ সম্প্রসারণ প্রকল্প। এ প্রকল্পের কাজ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য কয়েক দফায় পিছিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, যে অংশে নতুন দুটি রেলপথ নির্মিত হবে, তার একটি বড় অংশজুড়ে বর্তমানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে। ফলে রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ আপাতত স্থগিত রয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ কাজ শেষ করে জায়গা বুঝিয়ে দেয়ার পর তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হবে। রেলপথ সম্প্রসারণের এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের কারণে বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়ার মধ্যে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজও বিঘ্নিত হচ্ছে। এদিকে বিমানবন্দর গোলচত্বরে বিআরটি প্রকল্পের একটি ডিপো নির্মাণে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ডিপোর জন্য বিআরটি কর্তৃপক্ষ যে জায়গা নির্বাচন করেছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বাংলাদেশ রেলওয়ে তার মালিকানা দাবি করছে।
চলমান এ চার প্রকল্পের মধ্যে বিশেষজ্ঞরা সমন্বয়ের ঘাটতি দেখতে পাচ্ছেন। প্রতিটি প্রকল্প আলাদাভাবে করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সব প্রকল্প বিলম্বিত হচ্ছে। আবার প্রকল্পগুলোর জন্য আলাদা খুঁটি তৈরি করা হয়েছে। এভাবে একাধিক খুঁটি বানিয়ে রাস্তার সক্ষমতা নষ্ট করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় দেখা যায় একটি খুঁটির ওপর একাধিক কাঠামো রয়েছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে এভাবে উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও এ উদাহরণ অনুসরণ করা যেত। এজন্য পরিকল্পনা কমিশনের মুখ্য ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল। বস্তুত বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত সড়কটি ঢাকার সবচেয়ে প্রশস্ত রাস্তা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের নির্মাণকাজের জন্য বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়ক সরু হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটও ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা। সড়কে গর্তের কারণে ঝাঁকুনিতে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। সেতু বিভাগের সচিব পরিদর্শনের সময় তিনদিনের মধ্যে খানাখন্দ মেরামতের কথা বলেছিলেন। এরপর কোনো রকমে মেরামত করা হয়। পরবর্তী সময়ে আবার খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ভাষ্য, প্রকল্পগুলো ব্যস্ত সড়কে হওয়ায় কাজের গতি কম। এছাড়া জমি অধিগ্রহণসহ আরো কিছুটা জটিলতা ছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে শুরুর দিকের গাফিলতিতে পদে পদে সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে যথাযথ সমীক্ষাও করা হয়নি। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নির্মাণকাজ করার সময় দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে যাচ্ছে। সেবা সংস্থার লাইন কীভাবে সরানো হবে, সেটিও আগে থেকে ঠিক করা হয়নি। এছাড়া ব্যস্ততম সড়কে নির্মাণকাজের সময় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিকল্প চিন্তারও ঘাটতি ছিল।
উন্নত দেশগুলোয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটি যোগাযোগ ব্যবস্থায় অসামান্য অবদান রাখছে। পাশাপাশি দেশগুলো রেল পরিবহনের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের দেশেও সে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্পগুলো শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু খামখেয়ালি, অদূরদর্শিতা ও পরিকল্পনাহীনতার ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কাজ শেষ হচ্ছে না। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে রাস্তার সক্ষমতাও কমছে। ফলে প্রকল্প শেষে কাঙ্ক্ষিত উপকার কতটুকু মিলবে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ বেশ পুরনো। এ রকম অব্যবস্থাপনার বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে যেকোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রেই অনেক ভোগান্তি পোহাতে হবে।
আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রত্যাশা করি। কিন্তু উন্নয়ন করতে গিয়ে সড়কের সক্ষমতা যদি কমিয়ে ফেলা হয়, তাহলে এতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। এজন্য সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। এ চার প্রকল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে অদূরভবিষ্যতে কোনো বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে অবশ্যই পারস্পরিক সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে, সেটিই সবার কাম্য।










