বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। দুর্যোগ মোকাবেলা দেশের উপকূলবাসীর জীবনযাপনের একটি অংশ। এজন্য ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়। কিন্তু এ প্রস্তুতি দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কতটা কমাতে পারছে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। সময়ের ধারাবাহিকতায় আরেকটি দুর্যোগ যখন এসেই গেছে, এ মুহূর্তে প্রস্তুতি যতটুকু রয়েছে, তার আলোকেই ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’কে মোকাবেলা করতে হবে।
ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাবে বৃষ্টির ধারাবাহিকতায় আজ সন্ধ্যা নাগাদ ‘মোখা’ কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্টি হতে পারে জলোচ্ছ্বাস। বণিক বার্তায় প্রকাশ, ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রবর্তী অংশ ও বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৮ থেকে ১২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অফিস থেকে বলা হয়েছে, অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর ও উত্তর-পূর্বদিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হয়ে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কক্সবাজার-উত্তর মিয়ানমার উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড় চলাকালীন উপকূলীয় জেলা ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পাঁচ-সাত ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। এ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের তৎপরতা রয়েছে। তবে দেখা যায়, অনেক মানুষই নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। যে কারণে উপকূলে গত বছরের অক্টোবরে মাঝারি শক্তির ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ আঘাত হানার পর বিভিন্ন স্থানে গাছ ও দেয়ালচাপায় সাতজনের মৃত্যু হয়। এজন্য ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় আশ্রয় কেন্দ্রে আক্রান্ত এলাকার সবাইকে যেন আগেই পাঠানো সম্ভব হয়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া যে আশঙ্কা থেকে স্থানীয় জনসাধারণ নিজ ভিটা থেকে যেতে চান না, সেক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। সেখানে ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরাও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কাজ করছেন, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। এদিকে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে চলমান বৃহৎ অবকাঠামোগুলোর কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সাইক্লোনের মুখোমুখি হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়াও মাতারবাড়ীতে এলএনজি টার্মিনাল, এলপিজি টার্মিনাল, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, সমুদ্রবন্দর, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ ৩৭টি বৃহৎ প্রকল্পের কাজ চলমান। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য অবকাঠামোয় সাইক্লোন মোখার প্রভাব কতটা পড়বে তা দেখার বিষয়। যদিও প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রতিরোধের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এখানকার বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন। তবে ভবিষ্যতে যে অবকাঠামোগুলো নির্মাণ হবে সেগুলোও যেন ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ বিবেচনায় রেখেই নির্মাণ করা হয়। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামীতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৫ সালে হারিকেন ক্যাটরিনার আঘাতে ১ হাজার ৮০০ মানুষ মারা যাওয়ার পর নিউ অরলিন্সে বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে হারিকেন আইডা আঘাত হানার সময় সে ব্যবস্থার কার্যকারিতা দেখা যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৯৯ সালে এক ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ মারা যায়। সে সময় ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সরকারের যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না বলে সমালোচনা হয়। যে কারণে ২০১৩ সালে ঘূর্ণিঝড় পাইলিন আঘাত হানার আগেই ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় দেশটির সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি অনেক বড় ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে সামান্য অবহেলা অনেক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য সাধারণ মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পৌঁছে দিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরো বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে উদ্ধারকাজ ও পুনর্বাসন দ্রুত সময়ের ভেতর শেষ করতে হবে। এ সময় আশ্রয় কেন্দ্রে শুকনো খাবার এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহে ঘাটতি রাখা যাবে না। সামরিক বাহিনী ও কোস্টগার্ডকে কাজে লাগাতে হবে। ফায়ার সার্ভিস এবং তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণমূলক ভূমিকাও এ সময় জরুরি। আপৎকালীন সময়ে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকেও এগিয়ে আসতে হবে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকা ঘূর্ণিঝড়প্রবণ হওয়ায় এ এলাকাকে দুর্যোগ মোকাবেলায় আরো প্রস্তুত করতে হবে। উপকূলের বেড়িবাঁধগুলো পরিপূর্ণভাবে মেরামত করতে হবে। যেসব এলাকা ও দ্বীপে বেড়িবাঁধ নেই, সেসব জায়গায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বরিশাল, নোয়াখালী, সন্দ্বীপ উপকূল ও মেঘনার মোহনায় সুন্দরবনের মতো বড় বনভূমি নেই। আবার সেখানকার নদীগুলোও অনেক বড়। ফলে জলোচ্ছ্বাস দ্রুত বসতি এলাকা প্লাবিত করে। যে কারণে এ এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। তাই চট্টগ্রাম ও বরিশাল অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত করলে এমনিতেই ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে। এমন পরিস্থিতিতে বলা যায় যে দেশের সব উপকূলীয় এলাকাকে প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করতে হতে পারে। এজন্য সরকারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে।
এছাড়া ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের আরো জোরালো তৎপরতা প্রয়োজন। দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে আমাদের দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচতে হবে। এজন্য দুর্যোগ প্রতিরোধে যথাযথ প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে উপকূলবাসীর জান, মাল ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে হবে। ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া সর্বাত্মক প্রস্তুতিতে আমরা আশাবাদী। পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে, আমরা সে প্রত্যাশাই করি।










