১৯৯১ সালে প্রবর্তিত ভ্যাট বহু বছর ধরেই দেশের রাজস্ব আহরণের প্রধানতম খাত। যতই দিন যাচ্ছে অর্থনীতিতে ভ্যাটের অবদান বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ভ্যাট আদায় হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা যা এনবিআর আহরিত রাজস্ব কাস্টমস শুল্ক, আয়কর ও ভ্যাটের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা যা এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার (৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা) ৩৭ শতাংশ।
এ বিপুল পরিমাণ ভ্যাট আহরণে এনবিআর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানা যায়। ভোক্তা হিসেবে দেখতে পাই পণ্য বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে (সব দোকানে না হলেও) ভ্যাট চালান বা মূসক রসিদ ৬ দশমিক ৩ দিতে ইএফডি (ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস) মেশিন ব্যবহার করা হয়, যা কিনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিনামূল্যে পাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নানা স্থানে একাধিক আউটলেট রয়েছে তাদের কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরের বিপরীতে চালান দিতে বিনামূল্যে সেলস ডাটা কন্ট্রোলার (এসডিসি) প্রদান শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জিজ্ঞাস্য ও অভিযোগ গ্রহণ করতে ভ্যাট কল সেন্টার ১৬৫৫৫ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে সারা মাসের ভ্যাট চালান নম্বরগুলো লটারির মাধ্যমে নগদ অর্থ পুরস্কার প্রদানের মতো সরকারি কাঠামোতে বিরল ও অত্যন্ত অভিনব একটি উদ্যোগ, যদিও পত্রিকান্তরে জানা যায় সিংহভাগ লটারি জয়ী চালানের বিপরীতে পুরস্কার দাবি করা হয়নি, অদাবিকৃত প্রথম পুরস্কারের (১ লাখ টাকা) সংখ্যাও অনেক।
এবার ভ্যাটের চালান বিষয়ে একজন ভোক্তা হিসেবে কয়েকটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। এখন অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গেছে যে ত্রুটি ধরা পড়লে বদল করার সুযোগ দেয়া হয় এমন পণ্য (যেমন স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের পোশাক-পরিচ্ছদ) এবং সুপার শপ ছাড়া অন্যান্য বেলায় না চাইলেও ভ্যাট চালান পাওয়া যাবে এমন ঘটনা এখনো অনেকটাই বিরল। অনেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড চেইন আউটলেটও না চাইলে আমাকে চালান দেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে চালান চাইলে শুনতে হয়েছে, ইন্টারনেট কানেকশনে ডিস্টার্ব, থার্মাল পেপার শেষ হয়ে গেছে, নাছোড়বান্দার মতো আচরণ করলে প্রিন্টেড ফরমে হাতে লেখা চালান ধরিয়ে দিয়েছে। কখনো বলা হয়েছে মেশিন নষ্ট, মেরামত করতে দেয়া হয়েছে। প্রবণতাটি কোম্পানির আউটলেটের চেয়ে ডিলার বা ফ্র্যাঞ্চাইজির ক্ষেত্রে অধিক প্রবল বলে লক্ষ করা গেছে। প্রবণতাগুলোর সাক্ষী বেশি হয়েছি যখন বেশি টাকার পণ্য বা সেবা কেনা হয়েছে, আবার একেবারে কম টাকার হলে না চাইতেই চালান পাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। প্রয়োজনে ভ্যাট কল সেন্টার ১৬৫৫৫-এ কল করে সংযোগ পাওয়া গেছে এমন ঘটনাও বিরল। একবার এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে যে ইএফডি থেকে চালান ইস্যু করা হয়েছে, লটারির কুপন নম্বর আছে, কিউআর কোড আছে, বাসায় গিয়ে কৌতুহলবশত কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকার যে পরিমাণ পাওয়া গেছে তা চালানে লেখা টাকার চেয়ে কম। হতে পারে এটি একটি কারিগরি ত্রুটি কিংবা অন্য কিছু। মোট কথা, এ ঘটনাগুলো থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে ভ্যাট আদায়ে ভোক্তাদের সচেতন হওয়া ও সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই। আর এজন্যই বোধ করি, এবারের প্রতিপাদ্যে চালান চেয়ে নেয়ার ওপর এত জোর দেয়া হয়েছে। ভোক্তাদের জানতে হবে, রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুড, মিষ্টি, তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, ফার্নিচার, সুপার শপ, আবাসিক হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, বিউটি পার্লারসহ মোটাদাগে ২৪ ধরনের পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে ইএফডি বা এসডিসি বা পয়েন্ট অব সেলস (পস) সফটওয়্যার থেকে ইস্যু করা ভ্যাট চালান পণ্যের ক্রেতা বা সেবা গ্রহীতাকে দেয়া বাধ্যতামূলক, আর তা পাওয়া ক্রেতা বা সেবা গ্রহীতার অধিকার। আর তা না হলে তার দেয়া ভ্যাট রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ঢুকছে না অন্য কারো পকেট ভারী করছে তা জানতে গবেষণা শুরু করতে হবে।
এবার কয়েকটি সমাধান সূত্র নিয়ে কথা বলি। প্রথমত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর যেখানে পেমেন্ট করা হয় তার পেছনে দৃষ্টিগ্রাহ্য স্থানে ক্রেতা বা সেবা গ্রহীতাকে স্মরণ করাতে বড় করে লেখা থাকতে পারে ‘বিক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট চালান বুঝে নিন। চালান না নিলে আপনার দেয়া ভ্যাট রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পৌঁছচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত নয়। প্রয়োজনে ভ্যাট কল সেন্টারে (১৬৫৫৫) যোগাযোগ করুন।’ প্রয়োজনে ভ্যাট বিধিমালায় এ বিধান সংযোজন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, লটারির বিকল্প কোনো প্রণোদনার কথা ভাবা যেতে পারে, চিরস্থায়ী না হলেও নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্য। যেমন দেশে-বিদেশে বিশেষ করে সুপারশপে মেম্বারশিপ কার্ড, লয়ালটি কার্ড, ক্লাব কার্ড প্রভৃতি নামের কার্ডে কেনাকাটার বিপরীতে ১ শতাংশ বা তারও কম পরিমাণে পয়েন্ট জমা এবং তা ভাঙিয়ে আবার কেনাকাটার কথা আমরা জানি। একই ধারণায় ভ্যাট কার্ড চালু করা যেতে পারে। এটি যে প্লাস্টিকের কার্ডই হতে হবে, অনেক খরচ হবে এমন কোনো প্রয়োজন নেই। একটি মোবাইল নম্বরের বিপরীতে চার-পাঁচটি তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করলেই একটি কিউআর কোড পাওয়া যাবে, আর তাই হবে ভ্যাট কার্ড যা স্ক্যান করলে কেনাকাটার বিপরীতে পয়েন্ট যোগ হবে, যা নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে ভাঙানো যাবে। যাদের স্মার্টফোন নেই, তারা মোবাইল নম্বর বললে ওই নম্বরের বিপরীতে পয়েন্ট যোগ হবে। এক্ষেত্রে ভ্যাট অনলাইন সিস্টেমে কিছু কাজ করতে হতে পারে। লটারি কেবল ভাগ্যবানদের জন্য, কিন্তু ভ্যাট কার্ডের সুবিধা সবাই পাবে; লটারিতে চালানগুলো জমিয়ে রাখতে হয়, মাস শেষে মেলাতে হয়, আর এক্ষেত্রে সবকিছু স্মার্ট। ভোক্তাদের আগ্রহী করতে প্রয়োজনে শুরুর দিকে পয়েন্ট বেশি দেয়া যেতে পারে। ভোক্তারা একবার সুবিধা পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, যেসব দোকানে ইএফডি বা এসডিসি আছে কেনাকাটা করতে সেগুলোই হবে তাদের প্রথম পছন্দ। আর এভাবে একসময় ভ্যাট চালান চাওয়া ও পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের যে অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে, তা হরণকারীদের বিরুদ্ধে তারাই একক ও সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
সবশেষে, জনগণকে আরো বেশি করে বোঝা ও বোঝানো দরকার যে তাদের কষ্টের টাকায় দেয়া ভ্যাট রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ঢুকছে কিনা তা নিশ্চিত করতে তাদের ভূমিকা অনেক। আর এ ভূমিকা পালনে তখনই তারা বেশি উৎসাহিত হবে, যখন দেখবে এতে তাদের ক্ষতি তো নেইই, বরং আছে লাভ। তখন তারাই ভ্যাট আদায়ে সহযোগী শক্তি হিসেবে সম্পৃক্ত করবে নিজেদের।
আ আ ম আমীমুল ইহসান খান: সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার, ইউএসডিএ
বাংলাদেশ ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন প্রজেক্ট (বিটিএফ)










