গত বুধবার কর ব্যয় নীতিমালা এবং এর ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রকাশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে বলা হয়েছে, কর অব্যাহতি দিতে সংসদের অনুমোদন লাগবে। এ নীতিমালা আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। জুলাই থেকে কর অব্যাহতির ক্ষমতা হারাচ্ছে এনবিআর। ফলে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে কর অব্যাহতির পথ বন্ধ হচ্ছে। খাতির ও চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নেয়া কর অব্যাহতির দিন আর থাকছে না। এতদিন যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করা হয়েছে, সে পরিমাণ অব্যাহতি দিতে হয়েছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আহরণ করা যায়নি। আবার সমাজে যাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে তারা কর অব্যাহতি পেয়েছেন। কিন্তু যাদের প্রভাব নেই তাদের আয়কর দিতে হয়েছে। ফলে রাজস্ব আহরণে তৈরি হয়েছে বৈষম্য। এ নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হলে বৈষম্য কমবে। রাজস্ব আহরণও বাড়বে। তবে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি বা কর অবকাশের বিষয়ে কোনো কিছু বলা নেই এ নীতিমালায়। এ নীতিমালার বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কর অব্যাহতির সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ ডিসেম্বর জারি করা (এসআরও-৪০১) প্রজ্ঞাপনে বিভিন্ন সময়ে করমুক্ত সুবিধা পাওয়া ছয়টি ফাউন্ডেশনের এ সুবিধা বাতিল করা হয়। সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যানের সই করা প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ‘সুরের ধারা’, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ফাউন্ডেশন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’, সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই), ওয়াদুদ ভূইয়া স্কলারশিপ ট্রাস্ট, ললিত মোহন-ধনবতী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের আয়করমুক্ত সুবিধা বাতিল করেছে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে পাঁচ বছর ধরে তাদের সব ধরনের আয়ের ওপর করমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল। এদিকে কর অব্যাহতির সংস্কৃতি শুধু সমাজে বৈষম্য তৈরির পাশাপাশি রাজস্ব আহরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে এনবিআরের রাজস্ব আয় বাড়বে। তবে কর অব্যাহতি থেকে বের হতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক থেকেও চাপ ছিল। তারাও চেয়েছিল এমন একটি নীতিমালা হোক। এ নীতিমালার বাস্তবায়ন হলে ব্যক্তিস্বার্থে আর কর অব্যাহতির সুযোগ থাকছে না। কস্ট বেনিফিট অ্যানালাইসিস ও জাতীয় স্বার্থ হবে অব্যাহতি পাওয়ার মানদণ্ড। জাতীয় সংসদ ঠিক করে দেবে কে বা কোন প্রতিষ্ঠান পাবে কর অব্যাহতি। অব্যাহতি দিতে হলে সেটি সংসদে পাস হতে হবে।
প্রতি বছরই সরকারের বাজেটের আকার বাড়ছে। সে তুলনায় বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। ঘাটতি পূরণে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এ ঋণের কিস্তি ও সুদ টানতে গিয়ে ব্যয় চাপ আরো বেড়ে যাচ্ছে সরকারের। এ চক্র থেকে বেরোতে পারছে না সরকার। তবে দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। করজালের বিস্তৃতি না বাড়ালে এটিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া বেসরকারি খাত যত বিকশিত হবে রাজস্ব আহরণ তত বাড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সময় যেসব শর্ত বেঁধে দিয়েছিল, এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজস্ব আয় বাড়ানো। অর্থাৎ কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো। তবে গত জুন শেষে সংস্থাটির লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি সরকার। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না করা, করজাল সম্প্রসারণে জরিপ কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা ও পদ্ধতিগত সমন্বয়হীনতা; কর ব্যবস্থাপনার তথ্য বিনিময়ের অপ্রতুলতা এবং দক্ষ জনবলের স্বল্পতা ও ভৌত অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকায় অর্থ পাচারও ঠেকানো যাচ্ছে না। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এসব প্রতিবন্ধকতা নিরসনসহ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। এর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দায় পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি অনুপাতে রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ রয়েছে দেশের অর্থনীতিবিদ-বিশেষজ্ঞসহ আইএমএফের। নিজস্ব আয় থেকে ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির দায় পরিশোধে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা তার বিপরীত। এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে বরং কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা ঘোচেনি। বরং রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরো ঝুঁকিতে রয়েছে।
কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানোসহ কর অব্যাহতির সব সুযোগ বন্ধ করা জরুরি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৪ লাখ করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ছিলেন। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ। টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়লেও সেভাবে প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়েনি। অর্থাৎ নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বাড়লেও রিটার্ন জমা দেয়া ব্যক্তির সংখ্যা সেই তুলনায় কম। কমসংখ্যক রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত করদাতা জরিপের অনুপস্থিতি এবং কর প্রশাসনের অটোমেশনের ধীরগতিই দায়ী। এছাড়া রিটার্ন দাখিলের প্রমাণও (পিএসআর) যথাযথভাবে তদারকি হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে দেশে কর আহরণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ কম। প্রত্যক্ষ কর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়া কর ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। এনবিআরের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে কর কাঠামোর সংস্কার আবশ্যক। এছাড়া প্রত্যক্ষ কর আহরণের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো কর জমাদানের প্রক্রিয়াটি এখনো জটিল। করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। করারোপ, হিসাবায়ন ও জমাদান পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া করদাতাবান্ধব হতে হবে। এছাড়া করদাতা ও আহরণকারীর মধ্যে সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়া বাড়াতে হবে। আয়করযোগ্য ব্যক্তিদের করের আওতায় আনা গেলে রাজস্ব আহরণ বহুগুণে বেড়ে যাবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে রাজস্ব আহরণে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোসহ কর অব্যাহতির সুযোগ বন্ধ করতে হবে। কর অব্যাহতির সুযোগ বন্ধ করতে এরই মধ্যে একটি কর ব্যয় নীতিমালা এবং এর ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রকাশ করেছে এনবিআর। এখন দরকার নীতিমালাটির বাস্তবায়ন। যদিও নীতিমালাটি প্রকাশের দিনই গ্লাস তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এভাবে আরো বেশকিছু খাতে কর অব্যাহতি দেয়া হবে বলে জানা গেছে। নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। এছাড়া বিদ্যমান যেসব আইন রয়েছে সেসব আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতের ভার যাদের ওপর তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। করদাতাকে হয়রানি এবং অর্থের বিনিময়ে বড় বড় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির সুযোগসহ কর অব্যাহতি দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কর ফাঁকি দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেন তারা। ফলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হয় না এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ থেকে বঞ্চিত হয় দেশ। কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও সংস্কারের পাশাপাশি কর প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে কর অব্যাহতির সব সুবিধা বন্ধ করতে হবে।










