বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তিনি জনগণ ও শাসক শ্রেণীর অভিপ্রায় বুঝতেন। বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবন থেকে রাজনৈতিক জীবনে অনেক ভাষণ দিয়েছেন। ৭ মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণ। এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু সুকৌশলে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস, সমসাময়িক অরাজকতার কথা, রাজনীতির কথা, বাংলার মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। ভাষণটি শোষক ও শোষিতের সংগ্রামে শোষিত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিই ছিল প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার ঘোষণা। 

মানবতার পূজারি বঙ্গবন্ধু ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ফেডারেশনের সদস্য হয়ে রাজনৈতিক জীবনের গোড়াপত্তন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, এখান থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র ও মহাত্মা গান্ধীজির সান্নিধ্য লাভ করেন। দুই মহান নেতার রাজনৈতিক প্রভাব বঙ্গবন্ধুর মাঝে পরবর্তীকালে দেখা যায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত। ১৯৫৫ সালে তিনিই প্রস্তাব করেন দলের নাম ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘আওয়ামী লীগ’-এ পরিবর্তনের জন্য। ফলে আওয়ামী লীগ দলটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফার মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করতে থাকে। পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে ছয় দফা আন্দোলন, অবশেষে বাঙালির স্বাধিকার চেতনা ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বাঙালির স্বাধিকারের ন্যায্য দাবিকে চিরতরে নির্মূল করার জন্য পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীরা নীলনকশা করতে থাকে। 

তাছাড়া পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক অন্যায়ভাবে এবং বিনা কারণে বাংলার মানুষের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, গুলি করে রক্তপাত ঘটায়। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও পাঁচটি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে বিজয় লাভ করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচনের পর পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক শাসকগোষ্ঠী নানা কূটকৌশল করে আওয়ামী লীগের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর না করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কিন্তু তারা তা না করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে গুলি চালিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে হতাহত করেছে। এরূপ রক্তের করুণ ইতিহাস সমগ্র পাকিস্তানি শাসনকালজুড়ে বিরাজমান ছিল। সর্বোপরি ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে জাতির পিতা শেখ মুজিব ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তার চিত্র তিনি তুলে ধরেন।

বঙ্গবন্ধু বাংলাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। তার আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল বাঙালি জাতির জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড এবং ক্ষুধামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ একটি দেশ গঠন করা। তিনি এক সুখী ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে তিনি তৈরি করবেন দক্ষ মানবসম্পদ আর তারা হবে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান, সুশিক্ষিত নাগরিক। একটি সামাজিক পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন তিনি। ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তা প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন, ৭ মার্চ রেসকোর্সে ভাষণ দেবেন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার ঢল নামে। সবাই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার অপেক্ষায়। সেই দিন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে জেগে উঠেছিল পুরো জাতি। তার ঐতিহাসিক এ ভাষণের মাধ্যমে সেদিন ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের। তাতে ছিল নির্দেশনা আর সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতির কথা।

পৃথিবীতে অনেক মহান মানুষ ইতিহাসখ্যাত ভাষণ দিয়ে অমর হয়ে আছেন। গ্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্সের রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোনান্ড রিগ্যান পর্যন্ত আড়াই হাজার বছরের বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে অধিক প্রভাব বিস্তারকারী ৪১ জন জাতীয় বীরের ভাষণ নিয়ে ‘জ্যাকব এফ ফিল্ড’ সম্পাদিত ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস: দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্ট্রি’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ইতিহাসের অন্যতম ভাষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবরে তাদের ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ কর্মসূচির আওতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে যা আমাদের অনেক গর্বের ও সম্মানের।

৭ মার্চের ভাষণকে বলা যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক দিকনির্দেশনা। পাকিস্তানিদের ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা দেখেই আওয়ামী লীগের নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে জাতীয় পরিষদে সরকার গঠন করতে দেবে না পশ্চিমারা। নির্বাচনে বিজয়ী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরাসরি স্বাধীনতার ডাকও দিতে পারছিলেন না। আবার পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র মুখ বুজে সহ্য করাও ছিল কঠিন। সে জন্যই বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে একটি নির্দেশনামূলক ভাষণ দিলেন। ভাষণের একপর্যায়ে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগালেন। তাই তো বাংলার দামাল ছেলেরা নয় মাস যুদ্ধ করার মনোবল পেয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি তার লিখিত ভাষণ না হলেও ভাষণের মাঝে ছন্দপতন বা পুনরাবৃত্তির কোনো ঘটনা ঘটেনি। আবার শব্দ নির্বাচনের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু যথেষ্ট মার্জিত, দৃঢ় ছিলেন। ১৮ মিনিটের এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু এমনভাবে শব্দ প্রয়োগ করেছেন, যাতে শত্রুপক্ষ বুঝতে না পারে তিনি সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলছেন, অথচ বাঙালিরা তা সহজেই বুঝতে পেরেছিল। ৭ মার্চের ভাষণের আর একটি দিক হচ্ছে, ভাষণটিতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রবাহ অনুসারে সবকিছু উচ্চারিত হয়েছে। ভাষণের শুরুর দিকে পেছনের ইতিহাস, মাঝের দিকে নিপীড়ন, নির্যাতন ও অন্যায়ের কথা আর শেষের দিকে তার প্রাণপ্রিয় জনগণের মুক্তির জন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণা দেন। এখানে তিনি অত্যন্ত কৌশলী ও নিপুণতার সঙ্গে স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেন। তিনি তার ভাষণের শেষ লাইনে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই বাক্যই ছিল ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা শোনার জন্য লাখ লাখ জনতা অধীর আগ্রহে ছিলেন। এরপর স্বাধীনতার ঘোষণার আর প্রয়োজন পড়ে না। তবে বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণার এমন এক কৌশল ছিল যাতে স্বাধীনতার ঘোষণার কিছু বাকিও থাকে না।

বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ১৯৭১ ইতিহাসে অনন্য ভাষণটি অধিকারবঞ্চিত বাঙালির শত-সহস্র আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের উচ্চারণে সমৃদ্ধ। রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ঊষালগ্নে ৭ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মানসিক প্রস্তুতির সব দিক-নির্দেশনামূলক কালজয়ী ভাষণ দেন ৭ মার্চে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণে সারা দেশের মানুষ অভিভূত-উজ্জীবিত হয়েছিল। এ ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু জনগণকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন—যে স্বপ্ন স্বাধীনতার। এ দীপ্তময়ী ভাষণে যেন বাঙালি সত্যিকার দিকনির্দেশনা পেয়ে যায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে। অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম সোনার বাংলাদেশ। তাই ৭ মার্চের ভাষণই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের মূল শক্তি।

অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর: ট্রেজারার, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়