বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেড়েছে গড় তাপমাত্রা। এতে জনজীবন অস্থির হয়ে পড়েছে। এমন গরমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হবে, নাকি বিদ্যালয় বন্ধ রেখে শিশুদের এ তাপপ্রবাহ থেকে স্বস্তি দেয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার ও জনস্বাস্থ্যবিদরা। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাব নিয়ে ২০২২ সালে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। সতর্কবার্তা দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে পরিবেশগত বিপর্যয়। ইউনিসেফ অনেক আগেই শিক্ষা খাতের পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করলেও বাংলাদেশে চলমান তাপপ্রবাহ বিষয়ে পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে, নাকি বন্ধ থাকবে তা নিয়ে দোটানায় পড়তে হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে শিক্ষা খাতে আরো আগেই পূর্বপ্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল। যেসব এলাকায় বেশির ভাগ স্কুলে বৈদ্যুতিক পাখা নেই, বায়ু চলাচলের মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই, সেখানে এমন তাপপ্রবাহে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বিপজ্জনক। এসব এলাকায় পাঠদানের উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার। যাতে শিক্ষার্থীরা সুস্থভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। তবে অনলাইনে পাঠদান কার্যক্রম পরিচলনা করলে সব শিক্ষার্থীর অনলাইন প্লাটফর্মের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের অনেক শিক্ষার্থীর ইন্টারেনট ও ডিভাইস সুবিধা নেই। ফলে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে অনলাইনে ক্লাসে অংশ নিতে পারে না। 

আগে থেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। যথাযথ প্রস্তুতি না থাকলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘসময় বন্ধ থাকলে শিশুরা শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে পড়তে পারে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে। এর বড় প্রভাব পড়ে শিশুশিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। তার ওপর বিদ্যালয় বন্ধ হলে এ কার্যক্ষমতা আরো কমতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতির ঘাটতি ফুটে উঠেছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও, যা অনভিপ্রেত। বাংলাদেশ এ ধরনের তাপমাত্রা আগে মোকাবেলা করেনি সত্য। এ ধরনের পরিস্থিতির বিষয়ে আরো আগেই ইউনিসেফ সতর্ক করেছে। সেই অনুসারে সরকারের তরফ থেকে প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন ছিল। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথাযথ প্রস্তুতি না থাকায় শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও অভিভাবকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা দুঃখজনক। 

কভিড-১৯ মহামারীকালে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে দেশে পুরোদমে শুরু হয়েছিল অনলাইন ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে লেখাপড়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত হয়ে লেখাপড়া বন্ধ ছিল। এজন্য বিকল্প মাধ্যমে ঘরে বসে এ লেখাপড়া দিন দিন জনপ্রিয় ওঠে। নিয়মিত শ্রেণী কার্যক্রমের পাশাপাশি কোচিং-প্রাইভেট-টিউশনও চলছে অনলাইনে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও দিন দিন যুক্ত হচ্ছে এ প্রক্রিয়ায়। বেতারেও পাঠদান চালুর কাজ চলছে। কভিড মহামারীর সময়ে বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতি প্রবেশ করলেও ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা—ইন্টারনেটের ধীরগতি, স্মার্টফোন ও টেলিভিশনের অভাব এবং আর্থিক সংকটসহ অন্য বিষয়গুলো। ৪০-৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ও দূরশিক্ষণ মাধ্যমের লেখাপড়ায় যোগ দিতে পারেনি। তাই বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতিতে যাওয়ার আগে বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। 

এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলে। এসব অঞ্চলের অধিকাংশ দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে শিখন ঘাটতির মুখে পড়েছে চার কোটি শিক্ষার্থী। গত মার্চে দক্ষিণ সুদানে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে ২২ লাখ শিক্ষার্থী শিক্ষার বাইরে চলে গেছে। তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে গত এপ্রিলেও ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় হাজার হাজার বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশেও ৩ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থী শিক্ষার বাইরে। 

জাতিসংঘের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী বিশ্বের ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ হার আরো বেশি। তাপপ্রবাহে এ পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে। 

ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সম্প্রতি এক দল গবেষক ২৯টি ভিন্ন দেশ থেকে জলবায়ু এবং জনসমীক্ষার প্রতিবেদনে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৩০টি দেশ থেকে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে চরম তাপমাত্রা এবং জলবায়ুর পরিবর্তন প্রতিকূলতা হিসেবে শিশুর স্কুলশিক্ষাকেও প্রভাবিত করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকস্বল্পতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দুর্যোগকালে ও পরবর্তী সময়ে করণীয় সম্পর্কে প্রস্তুতির অভাব, তদারকির অভাব প্রভৃতি সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দুর্যোগ-ক্ষত কাটিয়ে ওঠার জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পর্যায়ে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুপাতে ভারসাম্য, শিখন পদ্ধতি, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন, নতুন পাঠ্যক্রম ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই আসে শিক্ষা। শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দ বেড়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। গুণগত শিক্ষায় আমরা এখনো পিছিয়ে আছি এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে গুণগত মান কমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে বেকারত্ব। 

এদিকে টাকার অংকে বাড়লেও মোট বাজেট আর জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আরো কমেছে। কয়েক বছর ধরেই বাজেটে অন্যান্য খাতের তুলনায় শিক্ষায় গুরুত্ব কমে আসছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত থাকায় হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষা খাতকে ‘মেগা প্রকল্প’ হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৯৯ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি দেশের শিক্ষা খাত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ পেলে তা আদর্শ ধরা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশের সমান। বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ ছিল জিডিপির ২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং সংশোধিত বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৯১ শতাংশ। ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষায় সংস্কার আনতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। ২০৩০ সালে যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। কারিগরি শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করতে হবে। 

বাংলাদেশ ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বে পরিণত হবে। উন্নত বিশ্ব হতে হলে অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে শিক্ষায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে। শিক্ষায় জোর না দিলে পরনির্ভরই হয়ে থাকতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে পড়তে হবে। শিক্ষার জন্য মহা মেগা প্রকল্প হওয়া উচিত। কিন্তু শিক্ষায় বরাদ্দ প্রতি বছরই কমছে, যা দুঃখজনক। 

কারণ মূল উন্নয়ন হওয়া উচিত শিক্ষায়, অবকাঠামোয় নয়। ভালো শিক্ষক না থাকলে ভালো শিক্ষার্থী তৈরি হবে না। সেজন্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে। সরকারের কাছে শিক্ষা অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের স্মার্ট বাংলাদেশের উপযোগী করার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। 

জলবায়ু অভিঘাত, উষ্ণায়ন, শিক্ষা ও দারিদ্র্যের কারণে সামগ্রিক দুর্যোগে দেশ। তবে এসব দুর্যোগ একত্রিতভাবে মোকাবেলা করতে হবে। তথ্যগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।