অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে প্রতিনিয়ত রাজধানী ঢাকার জলাধার কমছে। পাশাপাশি সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান সংকুচিত হওয়ায় ঢাকা বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৮ বছরের ব্যবধানে জলাধারের পরিমাণ ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। স্থাপনা নির্মাণ করায় রাজধানীর অনেক পুকুর হারিয়ে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে আসে।
প্রতিনিয়ত জলাধার ভরাটের পেছনে বেসরকারি আবাসিক কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৯৯৫ সালে দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় জলাধার ও জলাভূমি ছিল ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হয়। ২০১৫ সালে তা আরো কমে ৩ দশমিক ২১ শতাংশে নামে। ২০২৩ সালে ২ দশমিক ৯১ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। একইভাবে ১৯৯৫ সালে সবুজ এলাকা ছিল ২০ দশমিক শূন্য ২, ২০০৫ সালে ১৫ দশমিক ৮৭, ২০১৫ সালে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১২ শতাংশে।
ঢাকা শহরের জলাধার ভরাট ও সবুজ নিধনের পেছনে খাল-নালা-জলাশয় ও নিম্নভূমি দখল এবং ভরাট, সবুজ এলাকা নষ্ট করে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, বনায়ন না করাসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। একই সঙ্গে জনসাধারণের জন্য পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরি করা, জলাশয় ও নদীর যথাযথ প্রবাহ ও সীমানা নির্ধারণ নিশ্চিত করা, জলাধার ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রণীত সব আইনের সফল বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ঢাকার জলাধার ও সবুজ নিধন সমস্যা দূর করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।
বস্তুত বসবাসযোগ্যতার তালিকায় ঢাকা এখন নিচের দিক থেকে সপ্তম স্থানে রয়েছে, এটি মোটেও ইতিবাচক লক্ষণ নয়। এমনটি চলতে থাকলে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় খুব সহসাই শীর্ষে অবস্থান করবে। এমন আশঙ্কা মোটেও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
পরিবেশবিদদের মতে, জলাধারের পাশাপাশি সবুজ নিধন ও সংরক্ষণের বিষয়টি শুধু টেকনিক্যাল এবং সাংস্কৃতিক নয়, রাজনৈতিকও বটে। এ দায়িত্ব সবার হলেও মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পালন করতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এ দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা দেখা যায়। ফলে জলাধার রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) জলাধার রক্ষায়ও প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানও ভূমিকা রাখছে।
যেমন গাবতলীতে একটি জলাশয় ভরাট করে সেখানে অবকাঠামো তৈরি করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বর্তমান ভবনটিও জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে। কুড়িলে রেলওয়ের মালিকানাধীন জলাধার ভরাট করে অবকাঠামো তৈরি করেছে মিলেনিয়াম হোল্ডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ হাতিরঝিলের কিছু অংশ ভরাট করেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আশকোনায় জলাধার ভরাট করে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এভাবে আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানই প্রতিনিয়ত জলাধার ভরাট করছে, যা খুবই দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলো জলাধার রক্ষা করে নগরায়ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইতালির ভেনিস, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এর জীবন্ত উদাহরণ। কিন্তু আমাদের দেশে যেখানে নদী দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়, সেখানে জলাধার দখল করা হয়তো তুচ্ছ বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু এতে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, উষ্ণতা বাড়ছে। তার ফলাফল মোটেও ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। তাই জলাধার যত ছোট আয়তনের হোক না কেন, সেটি রক্ষায় অবহেলা কাম্য নয়।
আমরা প্রত্যাশা করব, পরিবেশ রক্ষা ও বসবাসযোগ্যতার স্বার্থে ঢাকার জলাধারগুলো রক্ষা করা হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে, শহরের উষ্ণতা হ্রাসেও ভূমিকা রাখবে। এটি না করে নগরায়ণের দোহাই দিয়ে শুধু স্থাপনা গড়ে তোলা হলে ঢাকা শহরের বসবাসযোগ্যতা ক্রমশ কমতে থাকবে। আর ঢাকাকে পুরো দেশের একক কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করলে এ শহরের জনসংখ্যা কমবে না। এজন্য প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে। ঢাকার বাইরের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করতে হবে। এ সবকিছুই বৃহত্তর পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে অগ্রসর হলে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হবে না। এজন্য পরিবেশবিদ ও স্থপতিদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সর্বোপরি জলাধার রক্ষা করতে হলে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে জলাধার রক্ষা করা কঠিন। জনগণকে আইন মানতে বাধ্য করার জন্য আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা প্রয়োগ করছে, তা বন্ধ করা জরুরি। না হলে ঢাকা শহরের জলাধারগুলো আর রক্ষা করা সম্ভব হবে না। একবার কোনো জলাধার ভরাট হয়ে গেলে তা উদ্ধার করা খুব কঠিন। তাই এখনো যেটুকু জলাধার অবশিষ্ট আছে, তা রক্ষা করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।










