দক্ষিণ আফ্রিকায় সম্প্রতি শেষ হওয়া ব্রিকস সম্মেলনে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার নতুন ধাপ উন্মোচন করেছে। অনেকটা চীনের চাপাচাপিতে গ্রুপটিতে যুক্ত হয়েছে আরো ছয়টি দেশ। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সম্মিলনে যাত্রা হয়েছিল ব্রিকসের। সদ্য যুক্ত হওয়া নতুন ছয় সদস্যরাষ্ট্র হচ্ছে আর্জেন্টিনা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। অর্থনৈতিক উৎপাদনের দিক থেকে জি৭ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিতে পারে নয়া ব্লকটি। উল্লেখ্য, অগ্রসর প্রধান সাতটি অর্থনীতি নিয়ে গঠিত জি৭; যার সদস্যরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি। 

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘোষণা থেকে স্পষ্ট, পশ্চিমা বলয়ের প্রভাবমুক্ত একটি নতুন বলয় সৃষ্টি করতে চায় ব্রিকস। এর মাধ্যমে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যও কমাতে চায় তারা। সামনের বছরগুলোয় ব্রিকসের অভীপ্সা আরো স্পষ্ট রূপ নেবে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে হাজির হতে পারে। কিন্তু বিশ্ব ব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে ব্রিকস প্লাস সক্ষম নাও হতে পারে তিন কারণে।

প্রথমত, ব্রিকস সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমআগ্রহের জায়গা সীমিত। সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, চীনের অতিক্ষমতাধর হয়ে ওঠায় তালি দেবে না ভারত। এছাড়া যে জোটে ব্রাজিল, রাশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও ইউএইর মতো জ্বালানি তেল ও গ্যাস রফতানিনির্ভর দেশ রয়েছে তাতে মৌলিক গলদ থেকে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিদ্যুৎবিভ্রাট ও জ্বালানিস্বল্পতার ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতিতে। জ্বালানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের মতো অর্থ নেই তাদের কোষাগারে। কিন্তু যেসব দেশ তেল-গ্যাস রফতানি করে তাদের কোষাগারের বৃহৎ অংশ আসে এসব থেকে। 

দ্বিতীয়ত, কয়েক দশক ধরেই বৈদেশিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ডলারের স্থলে অন্য মুদ্রা আনার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আপনি একটি শক্তিশালী মুদ্রাকে পাল্টে দুর্বল কোনো মুদ্রা আনতে পারেন না। বিকল্প হিসেবে চীনা ইউয়ানের কথা বলতে চাইলে চীনের অর্থনীতি আস্থা রাখার মতো হতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নানামুখী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতিটি। পরিস্থিতি খারাপ হলে বিনা বাধায় ইউয়ান কি বিক্রি করে দিতে পারবে বিদেশীরা? 

তৃতীয়ত, এ মুহূর্তে রাশিয়ার সঙ্গে মিত্রতা যেকোনো বিপদের ইঙ্গিতবাহী। রাশিয়ার নেতৃত্ব অস্থিরমনা ও অবোধগম্য মনে হয়। ইউক্রেনে আগ্রাসন থেকে পিছু হটার চেয়ে মনে হচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পুতিন। এটা জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য অস্বস্তিকর। এছাড়া মিসরের মতো যেসব দেশ খাদ্য আমদানির ওপর বড় আকারে নির্ভরশীল তারাও বিপাকে আছে। 

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন উভয় দেশের জন্যই বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। কিন্তু পুতিন সেসব স্বৈরশাসকের একজন যিনি ভুল স্বীকার করেন না। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানগুলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কীভাবে এ ধরনের শাসকগোষ্ঠীর ইতি ঘটে।

কয়েক শতাব্দী ধরে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার রূপটা কেমন ছিল? দেখা যেত, কোনো এক শাসকগোষ্ঠী একাধিক ভূখণ্ড করায়ত্ত করে নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করত। এ প্রক্রিয়া পরিচালিত হতো সামরিক উপায়ে, ঘুস ও উপঢৌকনের মাধ্যমে এবং অন্যায্য বাণিজ্য সম্পর্কের মারফতে। ১৭০০ সালের শুরু থেকে ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত সব দিক থেকে বিশ্বে নেতৃত্বের আসনে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। তবে স্পেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোরও প্রভাববলয় ছিল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব ব্যবস্থা পরিবর্তন হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা বিশ্বের শিল্পশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। অধিকতর সমতাপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্কের মাধ্যমে পুরনো সাম্রাজ্য ব্যবস্থার জায়গা দখল করে নেয়। এ ব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে শুরু থেকেই নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে এসেছে। কিন্তু এ ব্যবস্থায় কামিয়াব হয়েছে পশ্চিম ইউরোপ। সফলতা ঘরে তুলেছে জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ। সাম্প্রতিক দশকগুলোয় নিম্ন মজুরির দেশে উৎপাদিত পণ্য উচ্চ-আয়ের বাজারে রফতানির এ ব্যবস্থার সুফল ভোগ করছে চীনও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন নেতৃত্বাধীন যে বিকল্প জোট ছিল তার মূল ভিত্তি ছিল মূলত পূর্ব ইউরোপের সামরিক নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার দুই বছর আগে ১৯৮৯ সালে বিকল্প এ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে মূল বিষয়বস্তু হিসেবে বাণিজ্যের জায়গা নিয়েছে প্রযুক্তি। পেছনের দিকে তাকালে আমরা দেখব, এ প্রক্রিয়া আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতেই শুরু হয়েছে। এ সময় ব্রিটিশরা রাডার ও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রাথমিক চিন্তা হাজির করেছিল। ম্যানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মাধ্যমে সে অস্ত্র সামনে নিয়ে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ডিজিটাল কম্পিউটার, সেমিকন্ডাক্টর চিপ, দ্রুতগামী বিমান, প্রাণরক্ষাকারী ওষুধ, টিকা ও ইন্টারনেট পশ্চিম থেকে এসেছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বড় অংকের বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে।

১৯৫৭ সালের অক্টোবরে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু নিপীড়ন ও নিষ্পেষণমূলক ব্যবস্থার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ততটা বিকশিত হতে পারেনি। এছাড়া ভালো আইডিয়াকে ভালো পণ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটা এত সহজ নয়। মানুষ আসলে অত্যাধুনিক অস্ত্রের বাইরেও বেশি কিছু চায়। 

বর্তমানে নতুন প্রযুক্তিতে পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চায় চীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নজরদারির সমন্বয়ে নিজ ভূখণ্ডে কঠোর রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ আনতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। বিশ্বের জন্য ব্রিকসের সম্প্রসারিত রূপ নয়, বরং বড় হুমকি চীন। 

ওয়াশিংটনে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা চাক শুমারের নেতৃত্বে দ্বিদলীয় আইন পাসের চেষ্টা চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কতটুকু উন্নয়ন হবে এবং তার নিরাপত্তাবেষ্টনী কেমন হবে সে ব্যাপারে চলছে আলোচনা। এটি একটি স্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া এবং তা ভালো ফল নিয়ে আসবে এমনটা আশা করাই যায়। ভোক্তা সুরক্ষা ও চাকরি হারানোর চলমান উদ্বেগ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে তাও আমলে নেয়ার মতো বিষয়। 

বিপরীত মোর্চায় তাকালে দেখব, চীন কোন প্রযুক্তি আনতে চায় এবং কোন উদ্ভাবন করতে চায় সে ব্যাপারে সেখানে উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ নেই। স্নায়ুযুদ্ধকালীন রাশিয়ার মতোই অনমনীয় ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থায় পরিচালিত দেশটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রয়োগ ও প্রসারে নেতৃত্ব দেবে? 

সোভিয়েত ইউনিয়ন যেখানে ব্যর্থ হলো সেখানে চীন কি সাফল্যের মুখ দেখবে? পশ্চিমা বিশ্ব যতদিন উদ্ভাবনী ক্ষমতায় জোর দেবে এবং দায়িত্বপরায়ণতার সঙ্গে তার ব্যবহার করবে ততদিন পর্যন্ত সে লড়াইয়ে চীনের জয়ী হওয়াটা সম্ভবপর নয়। সে হিসেবে বলতে হয়, পশ্চিমা বিশ্বের নিয়তি তাদের নিজের হাতেই। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

সাইমন জনসন: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ। এমআইটির স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক। 

ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম