বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাতের অন্যতম প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আবার বিদেশে পাঠানো আমাদের জনশক্তির বড় অংশই অপ্রশিক্ষিত ও নিম্ন আয়ের পেশায় কর্মরত। আমরা যদি সুপ্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি তাহলে বিদেশে উচ্চ আয়কারী পেশায় যুক্ত হতে পারবে তারা। এছাড়া দেশেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সে লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে আরো ৫০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হচ্ছে, যা গতকাল একনেকের বৈঠকে অনুমোদিত হয়েছে। উদ্যোগটি সাফল্যের মুখ দেখুক এমনটাই প্রত্যাশা সবার। কিন্তু এর আগেও কয়েকশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হলেও সেখান থেকে দক্ষ জনশক্তি বের হওয়ার সংখ্যা খুব কম, আবার অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তা বিশ্ববাজারে ততটা কার্যকর নয়।
চার দশক আগে বাংলাদেশ থেকে সরকারিভাবে জনশক্তি রফতানি শুরু হয়। সময়ের ধারাবাহিকতায় নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এজন্য দেশে গড়ে তোলা হয় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বিদেশে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ ও দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য সারা দেশে উপজেলা পর্যায়ে আরো ৫০ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। স্বল্প ও অর্ধশিক্ষিত তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিতে ব্যয় করা হবে ৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এ বছর শুরু হয়ে ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রমতে, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে টিটিসি নির্মাণের কথা রয়েছে, যার মাধ্যমে ১ কোটি ১৩ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। বিএমইটির তথ্যমতে, এখন দেশে ১১০টি টিটিসি চলমান রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে আরো ৫০টি যুক্ত হতে যাচ্ছে।
বস্তুত দেশে এরই মধ্যে শতাধিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও দক্ষ কর্মীর হার বাড়েনি—নিকট অতীতে এমন অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর প্রশিক্ষণের মান যুগোপযোগী করার তাগিদ জোরালো হচ্ছে। এমনকি পরিকল্পনাধীন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর জন্য নতুন কোনো সিলেবাস তৈরি হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাহলে এ টিটিসিগুলো কি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবে—এমন প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনে এটিও উঠে এসেছে যে বিদ্যমান টিটিসিগুলোর মানোন্নয়ন না করে নতুন করে সেন্টার স্থাপন না করার সুপারিশ করেছিল সরকারের প্রকল্প মনিটরিং প্রতিষ্ঠান আইএমইডি। কিন্তু তাদের সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। এভাবে অদূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন করে টিটিসি নির্মাণ করলে তা আখেরে ভালো ফল বয়ে আনবে না—এমনটিই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাই এখন টিটিসিগুলোয় উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাই প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
মূলত প্রশিক্ষণে কোন বিষয়গুলোতে নজর দেয়া প্রয়োজন, বর্তমানে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। আবার যারা প্রশিক্ষণ দেবেন, তাদেরও মানসম্মত প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। এছাড়া গতানুগতিক প্রশিক্ষণ না দিয়ে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। এজন্য প্রশিক্ষণার্থীদের ভাষাগত দক্ষতাসহ কারিগরি দক্ষতায় যেন গড়ে তোলা যায়, সেদিকে আলোকপাতের বিকল্প নেই।
আমরা প্রত্যাশা করি আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো হবে বিশ্বমানের। কারণ যুগের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ না দেয়া গেলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে পিছিয়ে পড়তে হবে। এটি এরই মধ্যে প্রতীয়মানও হচ্ছে। সুদক্ষ জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যমে ভারত, ফিলিপাইন ও শ্রীলংকার মতো দেশ বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে যাচ্ছে। এজন্য তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। এজন্য আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজিসহ সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শিখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষককেও ভালোভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। যেহেতু জনশক্তি রফতানির সঙ্গে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয়টি জড়িত, সে হিসেবে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া অনুচিত। তাই নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে যেন শুধু অর্থ ব্যয় না হয়, ব্যয়কৃত অর্থ যেন কাজে লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়।
সেহেতু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোয় শুধু তত্ত্ব না পড়িয়ে হাতেকলমে ব্যবহারিক শিক্ষা দিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কাজে আত্মবিশ্বাস পাবে। এছাড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর জন্য নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করা উচিত, যেন সর্বশেষ প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রশিক্ষণার্থীদের আয়ত্তে থাকে। প্রশিক্ষক সংকটের যে অভিযোগ রয়েছে, সেটিও দূর করতে হবে। সব মিলিয়ে টিটিসিগুলো যেন দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলে সেটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষতা অর্জন ছাড়া বিদেশে গেলে দুর্দশার মুখে পড়তে হবে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। এছাড়া দক্ষ কর্মীরা অদক্ষ কর্মীদের তুলনায় বেশি উপার্জন করতে সক্ষম হয়। এসব বিষয়ে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক জনশক্তিদের বোঝাতে হবে। প্রযুক্তির নিত্যনতুন উৎকর্ষের ফলে বর্তমানে শ্রমবাজারে নতুন চাহিদাসম্পন্ন জনশক্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এদিকে মনোযোগী হতে হবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব, বিদেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের ফলে বিভিন্ন দেশে অর্থনীতির নতুন দুয়ার উন্মোচন হয়েছে। এটিকে ধরে রাখতে হবে। কারণ বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কর্মীদের দক্ষতা অর্জনে পদক্ষেপ না নিলে অন্য দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে পড়ব। আমাদের যে জনসংখ্যা রয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ফলে একদিকে যেমন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন সম্ভব হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বাড়বে। আমরা প্রত্যাশা করব টিটিসিগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো আন্তরিক থাকবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো যে লক্ষ্যে চালু হচ্ছে তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।










