মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিগগিরই অতিবিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ বাতিল হয়ে এর পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণীত হতে যাচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি নিয়ে মূলত শুরু থেকেই যথেষ্ট আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছিল, বিশেষ করে এখানে শিক্ষক, চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিরোধী রাজনীতিকসহ অন্যান্য পেশাজীবীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করতে এবং কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনটি ব্যবহৃত হবে এ মর্মে। এ আইনের সমালোচনা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ, এমনকি বিভিন্ন সংস্থাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সময়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এ বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকে ‘সাংবাদিকদের জন্য কালো আইন’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আইনটির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমনকি সরকারের কাছে আইনের নির্দিষ্ট ধারা এবং উপধারার বিষয়েও মতামত দিয়েছিল। আইনটির বিতর্কের বিষয়গুলোর মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, ধর্মীয় ইস্যুতে মামলাসহ বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়গুলোতেও সমালোচনা ছিল।
প্রস্তাবিত আইনটি প্রণীত হওয়ার আগে যতটা সম্ভব বিভিন্ন মহলে আলোচিত বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে সাইবার জগতের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নেয়া প্রয়োজন। কারণ আইনটি প্রণীত হওয়ার পর তার মধ্যে অসংগতিপূর্ণ বিষয়গুলো উদিত হলে আবার সংশোধনীর জন্য প্রথমত, সময়ের প্রয়োজন এবং দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন সদিচ্ছার যা তখনকার সময়ে কতটুকু সম্ভব সেটি বিবেচনার বিষয়। কাজেই বর্তমান সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক সমাজ এবং নীতি বিশ্লেষকরা বিভিন্ন ফোরামে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলো বলতে শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন নতুন আইনটিতে আমূল পরিবর্তন না নিয়ে এলে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মতোই অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রস্তাবিত আইনটি নাগরিক সমাজে না থাকার ফলে ওই আইনের বিষয়ে কেউ গভীর মন্তব্য করতে পারছেন না। তবে যতটুকুই আলোচনা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের এ বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে একটি অর্থপূর্ণ আইন যেন বাংলাদেশের জনগণের জন্য প্রণীত হয় সে বিষয়ে যত্নবান হবেন বলে আমরা আশা করি। যেহেতু প্রস্তাবিত আইনটি এখনো পাইনি, তাই ওই আইনের অভ্যন্তরে ধারা বা উপধারার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। তবে পূর্বে প্রণীত আইসিটি আইন ২০০৬ এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ২০১৮-এর প্রয়োগের অভিজ্ঞতার আলোকে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন।
বলা প্রয়োজন যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সনদগুলোয় যেসব রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের কথা বলা আছে এবং যেগুলো বাংলাদেশ আরো আগেই অনুমোদন করে আসছে, সেই মানদণ্ডের বিবেচনায় যথেষ্ট ঘাটতি ছিল ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে। ফলে ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের পরিবর্তে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি ২০১৮ সালে প্রণীত হলে জনমনে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির পরিবর্তে যথেষ্ট উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে তা প্রতিফলিত হয়েছিল। প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইনটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন যাতে এ আইন জনমনে উদ্বেগের পরিবর্তে আশার সঞ্চার করে।
বর্তমানে আইনটি বিলুপ্ত করার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা বা অবদান হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দরকার ছিল আরো কয়েক বছর আগেই গুরুত্ব দিয়ে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এবং ওই আইনের আওতায় বিচার প্রক্রিয়ার যে অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র লাভ করেছিল তার ওপর ভিত্তি করে নতুনভাবে আইনে পরিবর্তন এনে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা। এখনকার পরিবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু পর মুহূর্তেই এ প্রশ্ন জাগ্রত হয়—প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনটি আসলে কতটুকু কার্যকর হবে ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে? অনেকেই ২০০৬ সালের আইনের তুলনায় ২০১৮ সালের আইনের অপপ্রয়োগের আধিক্যকে আগামী দিনেও সম্ভাবনা মনে করছেন।
বর্তমানে উল্লিখিত বিতর্কের বিষয়গুলোর মধ্যে অনেকেই নতুন আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তা’ শব্দের পরিবর্তে ‘সুরক্ষা’ শব্দের ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন, আমার কাছে মনে হয় শাব্দিক ব্যবহার ততটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়, বরং জনগণের জন্য আইনটি কতটুকু হয়রানিমূলক না হয়ে নিরাপদ বা নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে তা লক্ষণীয়।
এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আইনমন্ত্রী প্রস্তাবিত আইনের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। তাতে মনে হচ্ছে যে আইনটি ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের তুলনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিতর্ক সৃষ্টি করবে না। যেহেতু বলা হচ্ছে অতিবিতর্কিত ধারাগুলো বাদ যাবে, বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তুলনায় সাইবার নিরাপত্তা আইনটিতে শাস্তির পরিমাণ কম থাকবে, মানহানি মামলার বিষয়গুলোয় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিধান থাকবে, সব ধরনের আর্থিক জরিমানার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হবে, মানহানির ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কারাদণ্ডের বিধান থাকবে না।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে আইনটি প্রণীত হওয়ার পর থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর কিছু সংখ্যকের ব্যাপারে অভিযোগ ছিল যে নির্দিষ্ট কিছু পেশার মানুষের ওপর হয়রানি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। আগামী দিনে উল্লিখিত মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কী পদক্ষেপ—এ বিষয়েও নাগরিক সমাজে বেশ আলোচনা হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন আইনটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় আনবে।
প্রথমত, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-তে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ কী তা সংজ্ঞায়িত করলেও ‘নিরাপত্তা’ বলতে আসলে কী বোঝায় এর কোনো সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। এমনকি বাংলাদেশের অন্য কোনো আইনেও সরাসরি নিরাপত্তা বলতে কী বোঝায় তা সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা বলতে ২০১৮ সালের আইনে নিরাপত্তা শব্দের কোনো বিশ্লেষণ করা হয়নি। প্রস্তাবিত নতুন আইনে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। সংজ্ঞায়িত থাকা বা না থাকা যদিও তেমন গুরুত্ব বহন করে না, বিশেষ করে যেসব দেশের আদালত ব্যবস্থায় আইন বিজ্ঞানের যথেষ্ট উন্নতি সাধন হয়েছে সেখানে। কিন্তু আমাদের এখানে সংজ্ঞায়িত থাকাটা খুবই প্রয়োজন যেহেতু বিভিন্নভাবে আইনের অপপ্রয়োগের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখতে পাই। তাই নির্দিষ্ট করে সংজ্ঞায়িত থাকলে অন্তত অপব্যবহারের জায়গা থেকে এটি যথেষ্ট ফলপ্রসূ হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ যেহেতু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে স্বাক্ষর করে অনুমোদন করেছে, ওই সনদের ১৪ নং ধারায় উল্লিখিত বিচার প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক ব্যক্তির যে অধিকারগুলো নিশ্চিতের জন্য রাষ্ট্রগুলোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ওই অধিকারগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিতে বাধ্য। কাজেই বাংলাদেশের পর্যালোচনা করা দরকার যে প্রস্তাবিত আইনে ব্যক্তির অধিকার বলতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সনদগুলোয় উল্লিখিত অধিকারগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিভিন্ন সংস্থা যে মতামত দিয়েছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে যতটুকু সম্ভব অন্তর্ভুক্ত করা। এক্ষেত্রে অবশ্যই দেশের স্বার্থ বিবেচনায় রাখা খুবই প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও এ আইনগুলোর আলোকে বিচার প্রক্রিয়ার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা পর্যালোচনা করে আমাদের আইনে সম্ভব হলে কিছু অন্তর্ভুক্ত করা। তবে পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে যে সেখানে নাগরিকদের অধিকারচর্চার ক্ষেত্রে সাইবার বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কতটুকু সহায়ক। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে আইনি এবং কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে সেগুলোর পর্যালোচনা হতে পারে।
আরেকটি অত্যধিক প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে, দেশের সাধারণ জনগণ, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের মতামত গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয়া। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিগত দিনগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে সাইবার নিরাপত্তা আইনকে সাজানো। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতামতের আলোকে বোঝা যাচ্ছে যে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতাটুকুই বিবেচনায় নিয়েছে সরকার। তবে নাগরিক সমাজের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে নতুন আইনটিতে তাদের মতামত নেয়া হয়নি। সর্বমহলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে, নতুন আইনটি যেন ‘যেই লাউ সেই কদু’ না হয়। বিশেষ করে জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে, তদন্ত চলাকালীন আটকে রাখার বিধান, সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আর্থিক জরিমানার সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ এবং কারাদণ্ডের বিধান সে আলোকে পর্যালোচনা করে যথাযথ মানদণ্ড ঠিক করা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং তার পরবর্তী স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কোনোভাবেই কমানোর সুযোগ নেই, বরং আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর এক্ষেত্রে অবশ্যই জনগণকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারের সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দিতে হবে।
মোস্তফা হুছাইন: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি মালয়া, মালয়েশিয়া; সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়










