ড. বিরূপাক্ষ পাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টল্যান্ডের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অর্থনীতির অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ করার পর নিউইয়র্কের বিংহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। অতিথি শিক্ষক হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। গবেষণার কাজে বিআইডিএসের ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। দেশের ব্যাংক খাত, অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা, আর্থিক নীতিমালা ও ‘ভাইব্রেন্ট বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম
ব্যাংকে সব মাধ্যমে লেনদেন কমেছে বলে সম্প্রতি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এটি কি অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবে হচ্ছে না ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার ফলে হচ্ছে বলে মনে করেন?
ব্যাংক খাতে লেনদেন কমার কথা নয়। কারণ ব্যাংকের বিকল্প কোনো প্রতিষ্ঠান আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কেউ সৃষ্টি করতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে যেটি হয়েছে, লেনদেনের ক্ষেত্রগুলো কমে গেছে। একটা বিষয়ে আলোকপাত করা যাক, এখন বলা হচ্ছে খেলাপি ঋণ ১০ ভাগের মতো, আসলে খেলাপি ঋণ সার্বিকভাবে ২৫ ভাগ। এর বেশিও হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকে এটা ৩০ থেকে ৫০ ভাগে উপনীত হয়েছে। এ ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বলা যায়, এদের একটা কিডনি নেই। এমন অবস্থায় তারা ব্যাংকগুলো চালাচ্ছে। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে কিডনিতে পচন শুরু হয়েছে। এবং সেটার ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। ফলে ব্যাংক খাত নিয়ে কারো শ্রদ্ধা অবশিষ্ট নেই। তবু মানুষ নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যাংকে কিছু টাকা রাখে। আমরা অতীতে দেখেছি, একটি শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকে সংকট শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে গ্রাহকরা ৯০ হাজার কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন। সরকারি সংস্থা থেকে এটি স্বীকার করা হয়েছে। সরকারের একটা গ্যারান্টি থাকলেও এ রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে গ্রাহকরা আমানত তুলে নেন। সম্প্রতি নির্বাচন কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে। মানুষ অনিশ্চয়তার সময় বালিশের নিচে টাকা রাখে। এতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। আবার এ সময় আমাদের রেমিট্যান্সের বড় অংশ গ্রামের মানুষ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে জমা দিতে চায় না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, নির্বাচন কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা বন্যার পানির মতো ছড়িয়ে দেয়া হবে। সে টাকা যখন মানুষের হাতে যাবে, সেটি মানুষ ব্যাংকে রাখবে না। এ টাকাগুলো যেহেতু তোলা হয়েছে, এতে হুন্ডির সম্পৃক্ততাও রয়েছে। অবৈধ চ্যানেলে টাকা আসায় এ সময় ব্যাংকে লেনদেন কমে যাওয়া স্বাভাবিক। আর নির্বাচনের সময় মানুষ হাতে টাকা রাখে, খরচ করে এবং সে টাকা ব্যাংকে ডিপোজিট করে না। আর ব্যাংকে লেনদেন কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক খাতের বিষয়ও জড়িত। এই যে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলো সর্বোচ্চ করদাতা হয়েছেন একজন জর্দা ব্যবসায়ী। এটি কিন্তু আমাদের আর্থিক খাতের জন্য এক ধরনের পরিহাস। কারণ এত বড় বড় শিল্পপতি থাকার পরও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ করদাতা হচ্ছেন। ব্যাংক লুটেরাদের নাম এখানে নেই। যাদের লেনদেন অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বৈধ করে দিয়েছে। ৫ শতাংশ টাকা জমা দিলেও খেলাপি নয়, এমনটি বলা হচ্ছে। এভাবে ‘কালো’ খাতা থেকে তাদের নাম ‘সাদা’ খাতায় তোলা হয়েছে। এসব কারণে আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। এ অভিযোগ প্রায়ই তোলা হয়েছে, কথাটি কি সত্য না মিথ?
১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ২০০৩ সালে ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ একটি পরিবর্তন এনেছিলেন। সে পরিবর্তনগুলোও গণ্য করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কর্তৃত্ব রয়েছে। এজন্য নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত মুখ্য, নেতৃত্ব যদি মনে করে যেকোনো মূল্যে পদ টিকিয়ে রাখতে হবে। তাহলে তারা স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারবে না। এটা আমরা আগের গভর্নরের সময় দেখেছি। তিনি হোটেলে বসে মুদ্রানীতি মেনে নিতেন। মুদ্রানীতি প্রণয়নে তার কোনো ভূমিকা ছিল না, ব্যবসায়ীরা ঠিক করে দিতেন। অর্থাৎ যারা নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকবেন, তারা ঠিক করে দিতেন কী কী রেগুলেশন হবে। এদিকে এবার মনিটারি পলিসির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে থেকে তিনজন অর্থনীতিবিদ নেয়া হয়েছে। তাদের কথা শোনা হবে কিনা সেটি পরের প্রশ্ন। কিন্তু এ ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়ার জন্য বর্তমান গভর্নর ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। আমি বাজারে শুনতে পাই, গভর্নর স্বাধীনভাবে কাজ করছেন। অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ে কথা বলেন না। তিনি কীভাবে যেন বুঝে গেছেন এটা তার এরিয়া নয় বা তিনি আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বাজেটে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখেননি।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলুন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব যিনি গ্রহণ করবেন, তাকে এ প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তিনি দায়িত্ব পেলে দেশের স্বার্থে কাজ করবেন। এই যে ২৭ মাস ধরে ক্রমাগত রিজার্ভ ক্ষয় হচ্ছে, এটা কিন্তু গভর্নরের নীতিমালার ফসল। কভিডের উদাহরণ কিছুদিন দেয়া হয়েছে। তারপর রাশিয়ার যুদ্ধ, এখন ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণ দেখানো হচ্ছে। এ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হয়তো মিয়ানমার আরেকটা যুদ্ধ বাধিয়ে দেবে। এসব পৃথিবীতে থাকবে। তাই এসবের অজুহাত দিয়ে লাভ নেই। একজন গভর্নরকে নীতিমালার ক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে তিনি সঠিক নীতিমালা করছেন কিনা, অর্থনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা। এজন্য জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব দরকার। অনেক সময় আমাদের নেতৃত্ব রাজনৈতিকভাবে বাছাই করে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব গ্রহণ করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়টি নিশ্চিত করলে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৭২ সালের আদেশ ও ২০০৩ সালের অ্যামেন্ডমেন্ট অনুযায়ী সব শক্তি প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট। এরপর নীতিগত একটি পরিবর্তন এনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সব জবাবদিহিতা বন্ধ করতে হবে। যেমন কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ডাকতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্ট নয়, বরং বাংলাদেশ ব্যাংক একটি অথরিটি হিসেবে থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের জবাবদিহি থাকবে সংসদীয় কমিটির কাছে। এটাই কিন্তু সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা। কিন্তু এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো গভর্নরকে সংসদীয় কমিটির কাছে হাজির করার পর তাকে জেরা করে কোনো বিষয়ের জন্য চাপ দেয়া হয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে গভর্নর পদ থেকে সরে গেলেও তাকে সংসদে এনে অতীতের ভুলের জন্য জেরা করা হয়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে যেসব কথাবার্তা রয়েছে তার কিছুটা মিথ এবং এর পুরোটাই নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ ব্যাংককে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানকে সে রকম একজন জ্ঞানভিত্তিক নেতা নিয়োগ করা উচিত যিনি স্বাধীনভাবে দেশের স্বার্থে অর্থনীতির বিদ্যাবুদ্ধি ও গবেষণা প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ করবেন। যেটা ভারত, শ্রীলংকাসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় হয়। এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় অন্যান্য দেশ থেকে নেতৃত্ব নিয়ে আসার উদাহরণ রয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্যে এটি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা সম্মানিত অবস্থানে রয়েছেন। এক্ষেত্রে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য একটি মডেল রয়েছে। যেটিকে বলা হয় ডেভিড গর্ডনের রেপুটেশন মডেল। যে ব্যক্তির রেপুটেশন রয়েছে, যার দীর্ঘদিনের কাজ করার ইতিহাস রয়েছে, যিনি মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, যিনি জ্ঞানী, অর্থনীতি বুঝতে পারেন। এ রকম নেতাকে দায়িত্ব দেয়াই তো স্বাভাবিক। আর এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিত করতে হবে।
শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে এসব ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকগুলো কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে নাকি বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো ব্যাংককেই তারল্য সহায়তা দিতে পারে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হচ্ছে অর্থায়নের সর্বশেষ উৎস। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের যখন পতন হয়েছে, কোনো খেলাপি ঋণ বা মন্দ কর্মের কারণে পতন হয়নি। প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক কারণে পতন হয়েছে। তাদের সদিচ্ছা রয়েছে। সুতরাং, সরকার সহায়তা করেছে। অর্থাৎ উদ্দেশ্য যাচাই করলে যেকোনো পদক্ষেপই গ্রহণযোগ্যতা রাখে।
পর্যবেক্ষেক নিয়োগ করার পরও সরিয়ে নেয়া হয়েছে, এ রকম ঘটনা দেখা গেছে। তাহলে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে মনিটরিং করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কী করতে পারে?
এক্ষেত্রে নেতৃত্বের সততা ও সক্ষমতা প্রয়োজন। দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য এ দুটো বিষয় দরকার।
বাংলাদেশের জন্য ‘ভাইব্রেন্ট বাংলাদেশ’ স্লোগানের কথা বলেছিলেন।
ভাইব্রেন্ট মানে কী? একজন মানুষ উদ্যমী, পরিশ্রমী। যারা কৃষিতে রয়েছেন, তারা জীবনে অনেক পরিশ্রম করেন। আমাদের সার্ভিস সেক্টরের মানুষ সারা দিন খাটেন। মোবাইল ফোনে রিচার্জ করে সংসার চালান। বাস, ট্রাক, সার্ভিস সেক্টর, কৃষি, শিল্প খাতসহ নানা পেশায় কাজ করেন। এছাড়া দেখা যাচ্ছে, সমাজে বসবাসরত ৬৫.৩ শতাংশ মানুষ ১৫-৬৪ বছর বয়সী। এ বিষয়গুলো তো ফ্যাক্ট, এর ভিত্তিতে দেশটা ‘ভাইব্রেন্ট’। মানুষের ভেতর প্রচুর উদ্দীপনা, যেটার বাংলা অর্থ আমি করেছিলাম, প্রাণোদ্দীপ্ত। এটি অবশ্যই বিশ্বাস করি। আমি বিআইডিএসের সহায়তায় ‘পটেনশিয়াল আউটপুট’ নিয়ে গবেষণা করেছিলাম, যা পরে একটি জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। আমাদের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কিছু নীতিগত কারণে আমাদের আর্থিক খাত সংকটাপন্ন। এখানে নীতি ও দুর্নীতির দ্বন্দ্ব রয়েছে। আর্থিক খাতে এখন পর্যন্ত আমরা প্রতিকারযোগ্য অবস্থায় আছি। এটি সব ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব ও শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিকার করা যাবে। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকতে যখন ‘ভাইব্রেন্ট বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং করেছি, তখন আর্থিক খাতের দুর্বলতার ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের কথা বলেছি। সঞ্চয়পত্রের সুদের হারে অনিয়ম আছে, এক্ষেত্রে সরকারের নীতি সঠিক নয়, সেটি তুলে ধরেছি। আমি জ্বালানি তেলের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখার পক্ষপাতী ছিলাম না। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে কমাতে হবে। এতে উৎপাদন ও জিডিপি বাড়বে, প্রবৃদ্ধি হবে। কর্মসংস্থান হবে। এসব ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রসঙ্গে বলেছি। সে বিষয়গুলো আরো প্রকট হয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়েছে খেলাপি ঋণের কালো টাকা সাদা করা। মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিদেশ থেকে অর্থ আনলে ক্ষমা করে দেবেন। অর্থনীতিতে এসব মোরাল হ্যাজার্ড তৈরি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্ব দুর্বল ছিল। কি রকম দুর্বলতা, তা হোটেলে বসে মুদ্রানীতি ঠিক করার ক্ষেত্রেই বোঝা যায়। এতে খেলাপি ঋণ দিনে দিনে বেড়ে গেছে এবং শেষ দিকে এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রভাবে হয়েছে। দোকান ও পরিবারভিত্তিক ডিরেক্টরশিপ করা হয়েছে।
এখনো কি একই মত পোষণ করেন?
নীতিমালা না বদলানোয় আর্থিক খাতের ক্ষতি বাড়ছে এবং এটি বাড়তে বাড়তে প্রাণদীপ্তকে অনেকটাই প্রাণহীন বা দুর্বল করে দিতে পারে। আমরা এখন রিজার্ভ নিয়ে সংকটে আছি। কিন্তু রিজার্ভ সংকটের কারণে তো ধানের উৎপাদন বন্ধ হয় না। কৃষিতে অনেক বড় একটা অংশ খাদ্যনিরাপত্তার জোগান দিচ্ছে। আমি কিছুদিন আগে প্রতিবাদ করেছি অর্থনীতি তলানিতে এটি বলার মানে কী? মূলত আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা তলানিতে। এ খাতে সুশাসনের অবনতির বিষয়টি থাকতে পারে, কিন্তু সমগ্র অর্থনীতি তলানিতে এটি বলার কোনো অধিকার গভর্নরের নেই। নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই, পূর্বাভাস নেই। কোনো গবেষণা বা বিশ্লেষণ নেই। এ রকম জ্ঞানশূন্যতা তৈরি হয়েছে। স্বল্প মেধার মানুষ স্বীকৃতি পাচ্ছে। আনুগত্যকে যখন মেধার আগে স্থান দেয়া হয়, তখন পৃথিবীর সব দেশের আর্থিক খাতের অবস্থাই খারাপ হয়ে যায়। যেমন রবার্ট মুগাবে প্রতিশ্রুতিশীল দেশ জিম্বাবুয়েকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশ হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে অনুগত লোকদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারা আনুগত্যকে প্রশ্রয় করেই নিজের আসনগুলো ঠিক করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির যে খবরগুলো পাওয়া যায়, দেখা যায় প্রতিষ্ঠানপ্রধান বহাল তবিয়তে থাকেন। এদের পদত্যাগের কোনো ইতিহাস নেই। কারণ আমাদের রাজনৈতিক নেতারাই পদত্যাগ করেন না। এখানে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত মানুষ নমিনেশন জমা দেয়। এটি পৃথিবীতে দেখা যায় না। যেমন নানাভাবে আলোচিত, সমালোচিত হেনরি কিসিঞ্জার ৫০ বছর আগে রাজনীতি ছেড়ে বই লিখেছেন, গবেষণা করেছেন। জিমি কার্টারও এ রকমভাবে রাজনীতি ছেড়ে এখন পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু সবকিছু আঁকড়ে থাকার প্রবৃত্তি বাঙালিদের খুব বেশি। তা না হলে বাংলাদেশের সংসদ পৃথিবীর মধ্যে বৃদ্ধতম সংসদ হতো না। যে লোকটা হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন, তারও ইচ্ছা তিনি আরেকবার এমপি হবেন। আর যে মানুষটাকে গাড়ি থেকে নামাতে চারজন লাগে, গাড়িতে তুলতে পাঁচজন লাগে, তারও শখ এমপি হওয়ার। কারণ তারা সৃষ্টিশীল কিছু করতে চান না। আনুগত্য দিয়ে সুবিধা ভোগ করার সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করেন। এটিই যদি মূল স্পিরিট হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকবে। একটি দেশের প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকলে তার যত বড় সম্ভাবনা থাকুক না কেন, তা ধীরে ধীরে সব প্রাণকে নিষ্প্রাণ করে দেয়। আমি এখনো প্রাণোদ্দীপ্ত বাংলাদেশ ধারণায় বিশ্বাস করি। এজন্য নেতৃত্বে পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব আনা দরকার। আমরা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে অনেক তলানিতে রয়েছি। এ জায়গাগুলোয় সংস্কার আনা প্রয়োজন। আমরা যেন প্রতিষ্ঠানগুলোয় জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব দিতে পারি। শুধু প্রতিষ্ঠান আর আনুগত্যের দিকে তাকিয়ে না থাকি। এ রকম অনিয়ম যেন সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়।










