জনবহুল এ দেশে খাদ্যনিরাপত্তা খুবই জরুরি। এজন্য কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন আবশ্যক। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেও তা বাজার চাহিদার সঙ্গে যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য আমদানিতে প্রতি বছর ব্যয় করতে হয় বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা। এছাড়া আমদানি কেন্দ্র করে মৌসুমি ‘সিন্ডিকেট’ বাড়িয়ে দেয় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দাম। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি গবেষণা বাড়ানো দরকার। কিন্তু পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কৃষি গবেষণায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, কৃষি খাতে ২০২১-২২ অর্থবছরে গবেষণা ও উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা বিনিময় হারের ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে রূপান্তর করলে তা ১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার দাঁড়ায়। আগের অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা বা ১২ কোটি ৩২ লাখ ডলার। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা বা ১২ কোটি ২৪ লাখ ডলার বরাদ্দ ছিল এ খাতে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) ‘ন্যাশনাল ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটি পলিসি প্ল্যান অব অ্যাকশন অ্যান্ড বাংলাদেশ থার্ড কান্ট্রি ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান মনিটরিং রিপোর্ট’-এ এমন তথ্য উঠে এসেছে।
দুই দশক আগেও প্রায় একই পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল কৃষির গবেষণা ও উন্নয়নে, যা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন ঘেঁটে জানা যায়। ‘এগ্রিকালচারাল আরঅ্যান্ডডি ক্যাপাসিটি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইন দ্য এশিয়া-প্যাসিফিক রিজিয়ন’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০২ সালে বাংলাদেশের কৃষি খাতে গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অথচ তারও চার বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি ২০ লাখ ও ১৯৯১ সালে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।
কৃষি গবেষকরা বলছেন, কৃষি খাতের গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে খুবই সামান্য। তবে টাকার মান কমেছে; বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। সে হিসেবে গবেষণায় বরাদ্দ তেমন বাড়েনি। ২০০২ সালে এ খাতে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার বরাদ্দ দিলেও তারও দুই দশক পর ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল এ খাতে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমি হ্রাসসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বাংলাদেশের কৃষি খাত। স্বল্প জমিতে তাই অধিক ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। জলবায়ুসহিষ্ণু, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে বেড়েছে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের উৎপাদন। যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সে হার অনেকটাই কম। এর জন্য অপ্রতুল আর্থিক বরাদ্দকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করছেন কৃষি গবেষকরা। তাদের দাবি, সার্বিকভাবে বরাদ্দ বাড়লেও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে তা প্রায় একই বৃত্তে আটকে আছে।
গবেষকরা বলছেন, দেশে কৃষিজমি কমলেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনসংখ্যা। স্বল্প জমিতে অধিক হারে খাদ্য উৎপাদন করতে গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। যদিও দেশের বিভিন্ন খাতে হওয়া গবেষণার মধ্যে গর্ব করার মতো একমাত্র খাত কৃষি। এ খাতের সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞানীরা বছরে গড়ে প্রায় অর্ধশত ফসলের জাত উদ্ভাবন করছেন। বিভিন্ন শস্যে জিনগত উৎপাদনশীলতা বাড়াতেই এখন জোর দিচ্ছেন কৃষি গবেষকরা। এর জন্য অবশ্য উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থা উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল, তেল ফসল, কন্দাল ফসল ও ডাল ফসলসহ বিভিন্ন খাদশস্যের জাত উদ্ভাবন করে আসছে। তাদের উদ্ভাবিত সবজির জাত রয়েছে ১৩৫টি, যার মধ্যে ২৪টি হাইব্রিড। এর মধ্যে বারি হাইব্রিড সামার টমেটো-৮, বারি বেগুন-১২ ও বারি লাউ-৪ খুব জনপ্রিয়। প্রতিষ্ঠানটির আমের জাত রয়েছে ১৮টি, যার পাঁচটি বাণিজ্যিক ও চারটি হাইব্রিড। এর মধ্যে বারি আম-৪, বারি আম-১১, বারি আম-১২ বা গৌরমতি ও বারি আম-৩ বা আম্রপালি উল্লেখযোগ্য। কাঁঠালের জাত উদ্ভাবন হয়েছে ছয়টি। এছাড়া পেয়ারা, বাতাবি লেবু, আলু, চীনাবাদাম, সরিষাসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বারির বিজ্ঞানীরা।
বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। দেশের মোট কৃষিজমির প্রায় ৭৫ শতাংশ জমিতে ধান চাষ করেন কৃষক। ধানের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীরা। এ পর্যন্ত ১১৩টি জাত উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি; যার মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততাসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু, বন্যাসহিষ্ণু, পোকামাকড়সহিষ্ণু ও ঠাণ্ডাসহিষ্ণু ধানের বিভিন্ন জাত। এর বাইরেও বর্তমানে তাপসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। তারা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত ব্রিধান-২৮ ও ২৯। ফলন কমে যাওয়া ও পোকামাকড় আক্রমণ করায় এখন ব্রিধান-৮৯, ৯২ ও ১০২ জাত দিয়ে সেগুলো প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এসব জাতের ফলন ব্রিধান-২৮ ও ২৯-এর চেয়ে হেক্টরপ্রতি প্রায় দুই টন বেশি। আমন মৌসুমে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ব্রিধান-১১। এর পরিবর্তে ব্রিধান ৭৫, ৮৭, ৯৩, ৯৪ ও ৯৫ প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। আউশ মৌসুমে ব্রিধান-৪৮ জনপ্রিয় ছিল। তার পরিবর্তে এখন ব্রিধান-৮৩, ৮৫ ও ৯৮ প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে, যেগুলোর ফলন আগের জাতগুলোর চেয়ে বেশি।
ব্রির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধানের জিনগত উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। প্রতি বছর দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২২ শতাংশ। সে হিসেবে ২০৫০ সাল নাগাদ জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২১ কোটি ৫৪ লাখে। তখন দেশের মানুষের চাহিদা পূরণে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন চালের প্রয়োজন হবে। সে হিসাবে নতুন জাত উদ্ভাবন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে হেক্টরপ্রতি ৪৪ কেজি হারে চাল উৎপাদন বাড়াতে হবে। বর্তমানে জাত উদ্ভাবন ও জিনগত কারণে বছরে প্রতি হেক্টর জমিতে ১০ কেজি হারে চাল উৎপাদন বাড়ছে।
বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার চাহিদা আমলে নিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। করোনা মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে জরুরি খাদ্যপণ্যের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাধীনতা-পরবর্তী আমাদের শিক্ষা খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বেশ কয়েকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চালু। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে পুরোপুরি কাজে আসে এবং আমাদের খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বারি, বিনা, বিএআরসির মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠান যাতে গবেষণা এগিয়ে নিতে পারে তাতে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও তার সুষম বণ্টনের বিকল্প নেই।










