শিক্ষার ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রতিটি মানুষের শিক্ষার হাতেখড়ি হয় প্রাথমিক শিক্ষায়। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে বাদ দিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার বিকাশ কল্পনা করাই কঠিন। আর এ প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রধান শিক্ষক। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি প্রধান শিক্ষকই না থাকেন তাহলে বিদ্যালয় পরিচালনাসহ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা বেশ কষ্টসাধ্য। বাগেরহাটের প্রায় ৩৩ ভাগ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। তাই শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষক নিয়োগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
বাগেরহাটের নয়টি উপজেলায় ১ হাজার ১৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, যদিও ২১৫টি বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। বাকি ১৬০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পুরোপুরি খালি, যা বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
একটি সভ্য, সুশিক্ষিত, সুনাগরিক ও শিক্ষিত জাতি গঠনে প্রাথমিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকারের উচিত তাতে অধিক নজর দেয়া। শিক্ষা মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা ও শিক্ষকের মান নিয়ে বরাবরই থাকছে প্রশ্ন। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন। এছাড়া পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া বারবার কারিকুলাম পরিবর্তনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই কারিকুলাম প্রণয়ন জরুরি, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করেছে। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যহীন সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকায় শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের অপ্রতুলতা, শিক্ষার মান ও পরিবেশ না থাকায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে অভিভাবকদের। অথচ রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে জনগণের আস্থা আরো বেশি থাকার কথা। আমরা এ আস্থা অর্জনে বরাবরই পিছিয়ে পড়ছি। সরকারি বিদ্যালয়গুলোয় নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়তে আসেন। কিন্তু সেখানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও দক্ষ শিক্ষক না থাকায় আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করতে শিক্ষকের সংখ্যা ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাই শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। বিদ্যালয়গুলোয় তদারকি বাড়াতে হবে। কারিকুলাম পরিবর্তনের আগে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পূর্বপ্রস্তুতি নেয়ারও সুযোগ দিতে হবে। এ সুযোগ না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন কারিকুলামের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।
এদিকে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী করতে সরকার উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ ও মিড ডে মিল চালুসহ নানা কর্মসূচি নিয়েছে। তার পরও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরে আসেনি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সঠিক কারিকুলাম এবং শিক্ষার গুণগত মানের দিকে নজর দিতে হবে। তবে সঠিক ও টেকসই প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম তৈরিতে দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদদের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
এদিকে শিক্ষা খাতে আমাদের বরাদ্দও কম। মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয় করা উচিত বলে মনে করে ইউনেস্কো। কিন্তু আমরা শিক্ষা খাতে খুবই কম ব্যয় করি। ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মোট জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যদি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আমরা মোট জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করতে না পারি তাহলে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করেন দেশের অর্থনীতিবিদরা। তাই সরকারকে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। আর শিক্ষা খাতের ব্যয়ে বাংলাদেশের চেয়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা এগিয়ে রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে নেয়া তথ্যানুসারে, দেশের মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯৯। এর মধ্যে বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় স্থাপিত বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ২০৭। বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও আমরা শিক্ষার গণগত মান বাড়াতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ সুযোগে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের সংখ্যার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক সংখ্যা বাড়াতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ও গুণগত মান বাড়াতে শিক্ষকের বেতন কাঠামো বাড়াতে হবে। দেশের শিক্ষার বুনিয়াদ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। অথচ এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় সমাজে অবহেলিত। এছাড়া প্রশিক্ষণ না থাকায় শিক্ষকরাও পেশাদারি মনোভাব দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যাকে চিহ্নিত করে আধুনিক ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে আমাদের কাজ করতে হবে। শিক্ষকের বেতন কাঠামো ও অন্য সুযোগ-সুবিধা দেশের বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করতে হবে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানে তা দ্রুত পূরণ করে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এখনই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ না নেয়া হলে শিক্ষার মান ভবিষ্যতে আরো অবনতি হবে বলে আশঙ্কা শিক্ষাবিদদের।
এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্য কোনো বিকল্প নেই। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও শিক্ষকের সংখ্যা না বাড়ানো গেলে আমাদের শিশুরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বজায় রাখতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার টেকসই উন্নয়ন ব্যতীত টেকসই বাংলাদেশ গঠন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।










